—না-না, ইচ্ছে ছিল পড়বার। কারণ গ্রীক আর আরবী ভাষায় হাতে লেখা গ্রন্থগুলি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আগ্রহ ছিল। কিন্তু ঐ চিঠিটা পাওয়ার পর আমি মূর্তি উদ্ধারের কথাটাই ভাবলাম। নিজের জন্যে নয়, গরিব জেলে চাষীদের ভালোর জন্যই ঐ মূর্তিগুলোর বিনিময়ে অর্থসংগ্রহ করবো বলে। আসলে এই চিন্তাটাই এত পেয়ে বসল যে আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না-দোনিয়া হেসে বলল।
ফ্রান্সিস বলল—সন্দেহ নেই আপনার উদ্দেশ্য মহৎ ছিল। অবশ্য সিপনোলার মতো মানুষেরা সেটা বুঝবে না।
একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল—আমার কিন্তু কেমন মনে হচ্ছে—চিঠিটা অসম্পূর্ণ। একটা কিছু বর্ণনা এর মধ্যে বাদ গেছে।
—তাহলে কি বলতে চাও চিঠিটার অন্য একটা নকল আছে? হ্যারি বলল।
-হ্যাঁ, মুবারক নিশ্চয়ই কোনো খসড়া মতো করেছিল। সেখান থেকে দেখে দেখে ভালোভাবে লিখতে গিয়ে কোনো অংশ বাদ পড়ে গেছে। মুবারক আর মিলিয়ে দেখে নি—ফ্রান্সিস বলল।
সোনিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—প্রায় দুশো বছর আগের কথা। এখন কি ওসবের কোনো হদিশ করা যাবে?
ফ্রান্সিস চিন্তা করে বলল—তা ঠিক, তবে—
হঠাৎ থেমে ফ্রান্সিস বলে উঠল—আচ্ছা আপনি কি সমস্ত গ্রন্থটাই পড়েছিলেন?
দোনিয়া মাথা নেড়ে বলল না—।
চিঠিটা পাওয়ার পর আর পড়তে পারি না। ফ্রান্সিস বলল—তাহলে এবার পড়ুন তো। খুব সয় লাগবে কি?
—না-না, আরবী আমি আমার মাতৃভাষার মতোই পড়তে পারি—দোনিয়া বলল।
তখনই নোবাইল ঘরে ঢুকে বললেন—আপনাদের অসুবিধে ঘটালাম না তো?
দোনিয়া হেসে বলল-না-না-।
—ঠিক আছে, আপনারা কিন্তু আমার অতিথি। দুপুরের খাওয়াটা এখানেই খেয়ে যাবেন। নোবাইল বললেন।
ফ্রান্সিস, হ্যারি এখানকার রীতি অনুযায়ী একটু মাথা ঝুঁকিয়ে বলল—এতে আমরা সম্মানিত বোধ করবো।
নোবাইল হেসে বললেন—আপনাদের রাজকুমারী আবার লো ল্যাতিন জানেন না। আমাকে গিয়ে তাকে আবার সাহায্য করতে হবে। নইলে অন্দরমহলের মহিলাদের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যাবে। আমি যাচ্ছি—
নোবাইল চলে গেলেন। দোনিয়া আসনে বসে গ্রন্থটি পড়তে লাগলেন। হ্যারি পাশে বসল। ফ্রান্সিস ঘুরে-ঘুরে পায়চারি করতে লাগল। আবার দাঁড়িয়ে পড়তে লাগল। দোনিয়া ডান থেকে বাঁদিকে পাতা উল্টিয়ে পড়তে লাগল।
হঠাৎ দোনিয়া বলে উঠল—এটা কি? বলে ঝুঁকে পড়ল গ্রন্থটির ওপর। পাশে বসা হ্যারি ও ঝুঁকল। একটা মোটা পাতা দেখিয়ে দোনিয়া বলল—এটাতে এত কাটাকুটি—জড়ানো লেখা, গায়ে গায়ে লেখা—মানে খুব দ্রুত কিছু লেখা। সেইজন্যেই এত কাটাকুটি।
—জ্যোতিষশাস্ত্রের বিষয়ে কিছু লেখা?
—উঁহু, অন্য হাতের লেখা, ভালো করে পড়তেই পারছি না, দোনিয়া বলল।
—কষ্ট করে হলেও পড়তে থাকুন, হ্যারি বলল।
দোনিয়া এতক্ষণ খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে পড়তে বলল—ফ্রান্সিস মবারকের লেখা সেই চিঠির দু’একটা পুংক্তি পড়তে পারছি। কোনো সম্বোধন নেই—নীচে লেখকের নামও নেই।
—তার মানে আপনার কাছে মুবারকের যে চিঠিটা আছে এটা তারই খসড়া। ফ্রান্সিস বলে উঠল।
—বোঝা যাচ্ছে, ভুলেই হোক বা যেভাবেই হোক, খসড়াটা গ্রন্থটার সঙ্গে সেলাই করে বাঁধিয়ে ফেলা হয়েছে, হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস মাথার চুলে আঙ্গুল চালাল। বেশ উত্তেজিত গলায় বলল—এবার খসড়াটা সম্পূর্ণ ভালো করে পড়ুন।
দোনিয়া বলল—উঁহু, পড়তে হবে না। শব্দগুলো ধরে ধরে যে জায়গাগুলো পড়া যাচ্ছে না সেগুলো বুঝে নিয়ে লিখতে হবে।
দোনিয়া গ্রন্থটি নিয়ে বসার জায়গায় গেল। সাজিয়ে রাখা একটা পার্চমেন্ট কাগজ টেনে নিল। রূপোর দোয়াতে কলম চুবিয়ে নিয়ে খসড়াটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে থেমে থেমে লিখতে লাগল।
ফ্রান্সিস অনড় দাঁড়িয়ে রইল। হ্যারি ও আর বসে না থেকে উঠে দাঁড়াল।
এসময় মারিয়া ঘরে ঢুকল, পেছনে সেই কাফ্রি যুবকটি। মারিয়া হেসে বলল, এই যে পড়ুয়ারা—গৃহকত্রী তোমাদের খেতে ডাকছেন।
ফ্রান্সিস অনড়। কোনো কথা বলল না। হ্যারি বলল—একটু পরে যাচ্ছি।
দোনিয়া মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল—অনেক সময় লাগবে, চলুন খেয়ে আসা যাক।
দোনিয়া দরজার দিকে চলল। অগত্যা হারি আর ফ্রান্সিসকেও এগোতে হলো। মারিয়াও চলল। ফ্রান্সিসের গম্ভীর মুখ দেখে এতক্ষণে বুঝল ফ্রান্সিসরা সেই চিঠির ব্যাপারে নিশ্চই নতুন কোনো সূত্র পেয়েছে। কিন্তু এই নিয়ে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করল না। ও জানে ফ্রান্সিস সময়মতে সব বলবে।
সবাই খাবার ঘরে ঢুকল। লম্বাটে ঘর পাথরের দেয়ালে এখানে-ওখানে নানা রঙের ছবি আঁকা। কোথাও নানা রঙের নকশা আঁকা। মারিয়া, দোনিয়া আগে দেখেছে। কিন্তু হ্যারি, ফ্রান্সিস দেখে নি। হ্যারি বেশ বোকার মতোই চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। ছবিগুলো যীশুর জীবনের কয়েকটা ঘটনা নিয়ে আঁকা। ফ্রান্সিস কিন্তু কোনোদিকে তাকিয়ে না দেখে ও সোজা খাবার টেবিলের দিকে চলল।
নোবাইল তার স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে খাবার টেবিলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেন। ফ্রান্সিসরা এলে তারা বসলেন ওক কাঠের গদিওয়ালা চেয়ারে। ফ্রান্সিসরাও বসল। একটুক্ষণ পরস্পরকে পরিচিত করবার নিয়ম মানা হল। টেবিল ছাড়া ছাড়া রঙিন ফুলতোলা সাদা ধপধপে ঢাকনা। খাওয়ার বাসনপত্র ছুরি, কাঁটা চামচ রূপোর। পরিষ্কার ঝকঝকে। রাঁধুনি বুড়ি খাবার নিয়ে ঢুকল। পেছনে একটি অল্পবয়সী মেয়ে। নোবাইল নিজের মেয়ে বলে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
