দোনিয়া একটা গাড়িভাড়া করল। দু’মুখো আসনে ফ্রান্সিসরা মুখোমুখি বসল। গাড়ি চলল। পাথর বাঁধানো রাস্তায় ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ উঠল-টক-টক-টক্স—
কতদিন পরে এতবড়নগর দেখে সুন্দর পোশাক পরা পুরুষ-মহিলাদের দেখে মারিয়ার খুব ভালো লাগল। আবার মনটা খারাপও হলো নিজের দামি পোশাকটার ছেঁড়াখোরা সেলাই করা চেহারা দেখে। ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে দেখল ফ্রান্সিস নগরের লোকজন বাড়িঘর কিছুই দেখছেনা। সামনের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে। নিজের চিন্তায় বিভোর। ফ্রান্সিস, হ্যারির গায়ের পোশাকের অবস্থাও বেশ খারাপ। লিও দেখা যাচ্ছে। মারিয়ার কেমন অস্বস্তি হতে লাগল কিন্তু কথাটা ও ফ্রান্সিসকে বলতে সাহস পেল না।
গাড়ি চলল। একসময় একটা সাদারঙের গির্জার পাশ দিয়ে একটা ছোট রাস্তায় ঢুকল। কিছুটা যেতে দোনিয়ার নির্দেশে একটা বাড়ির পাথরের দেউড়ির সামনে থামল। ফ্রান্সিসরা নামল। দেউড়ির দরজা দামি কাঠের। কতরকম বিচিত্র রঙিন নকশা দরজায়। আধ ভেজানো দরজা ঠেলে দোনিয়া প্রথম ঢুকল। পেছনে ফ্রান্সিসরা ছোট ছোট রঙিন বাঁধানো পথটা একটা দরজার সামনে গিয়ে শেষ হয়েছে। দুপাশে বেশ সযত্নে তৈরি বাগান। নানা গাছে, বাগানে নানারঙের ফুল ফুটে আছে। ফুলের গন্ধ আসছে বাগান থেকে।
দোনিয়া এগিয়ে গিয়ে দরজায় মৃদু টোকা দিতে দরজা খুলে গেল। দেখা গেল একজন। কাফ্রি যুবক দাঁড়িয়ে আছে। দোনিয়াকে দেখে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাল। দোনিয়া জিজ্ঞেস করল, নোবাইল আছেন কি না? কাফ্রি যুবকটি মাথা একটু কাত করে আসতে ইঙ্গিত করল। কাফ্রি যুবকটি ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল। মারিয়া অবাক হয়েই চারিদিকে তাকাতে তাকাতে চলল। মারিয়া তো রাজপ্রাসাদেই মানুষ। কিন্তু এ বাড়ির দেয়ালচিত্র, মেঝেয় বিচিত্র রঙের নকশা করা গালিচা পাতা কারুকাজ করা দরজা-জানালা দেখে বুঝল-এত রঙ এত সাজসজ্জা ওদের প্রাসাদেও নেই।
ডানদিকের একটা খোলা দরজার সামনে যুবকটি দাঁড়িয়ে পড়ল। দোনিয়া ফ্রান্সিসদের ঢুকতে ইঙ্গিত করে নিজেও ঢুকল।
ফ্রান্সিসরা একটি সুসজ্জিত ঘরে ঢুকল। একটা লম্বাটে কাঠের আসনে একজন সাদা দাড়ি-গোঁফওয়ালা ভদ্রলোক বসেছিলেন। আসনে পাখির পালক তৈরি ঝালোরওয়ালা গদিমত। হাতে ধরা একটা লম্বাটে কাগজ পড়ছিলেন। ফ্রান্সিসরা ঢুকতেই ভদ্রলোক কাগজটা পাকিয়ে রেখে একটু দ্রুতই এগিয়ে এলেন দোনিয়ার দিকে। হেসে দোনিয়াকে জড়িয়ে ধরলেন। দোনিয়া ফ্রান্সিসকে বলল—ইনি নোবাইল শুধু ধনী বা অভিজাত নন বিদ্বানও ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে বলল—এঁরা আমার পরম বন্ধু। জাতিতে ভাইকিং।
নোবাইল হেসে এগিয়ে এলেন। ফ্রান্সিস হ্যারিকে জড়িয়ে ধরলেন। মারিয়াকে দেখিয়ে দোনিয়া বলল—ইনি ওঁদের দেশের রাজকুমরী।
নোবাইল সঙ্গে সঙ্গে মাথা বেশ কিছুটা নামিয়ে ডান হাত বাড়ালেন। মারিয়া অভিজাত রীতি অনুযায়ী তার হাতে হাত রাখল। নোবাইল মারিয়ার হাতে আলতো চুমু খেলেন। স্পেনীয় ভাষায় বললেন—আপনাদের শৌর্যবীর্যের কাহিনী আমরা শুনেছি। তবে এই প্রথম পরিচিত হবার সৌভাগ্য হলো।
-–কি যে বলেন—মারিয়া হেসে বলল—আপনারা সম্পদে, জ্ঞানে, গরিমায় আমাদের চেয়ে অনেক ওপরে।
নোবাইল একটু মাথা ঝুঁকিয়ে হাসল। কোনো কথা বলল না। দোনিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন—দোনিয়া, আপনি তো জেলে, চাষীদের মধ্যে থাকতেভালোবাসেন, আমাদের এড়িয়ে চলেন। হঠাৎ আমাদের কথা মনে পড়ল।
—কারণ আছে। আপনার গ্রন্থাগারে একটু পড়াশুনো করবো।
—বেশ তো, চলুন-নোবাইল ঘর থেকে বেরিয়ে ডানদিকে চললেন। ফ্রান্সিসরাও পেছনে পেছনে চলল। কাফ্রি যুবকটি তখন আসছিল। নোবাইল মৃদুস্বরে তাকে কি বললেন। তারপর দোনিয়াকে মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন—আপনি অন্দরে আমার স্ত্রীর কাছে চলুন।
মারিয়া একবার নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে। অস্বস্তিবোধ করল। কিন্তু ভদ্রলোক যেভাবে বলছেন, না যাওয়াটা অভিজাতমহলের রীতিতে ভালো দেখায় না। মারিয়া নোবাইলের সঙ্গে অন্দরমহলের দিকে চলল।
দোনিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সিসরা গ্রন্থাগারে ঢুকল। দেখল, মোটা কাঠের পাটাতনের ওপর চামড়া বাঁধানো বেশ কিছু বড় বড় গ্রন্থ। একপাশে কাঠের আসনের সামনের চৌকোনো কাঠের ওপর রূপোর দোয়াতদানি, পালকের কলম। কিছু পার্চমেনট কাগজও রাখা আছে।
দোনিয়া এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে একটা তাকের কাছে গেল। একটা মোটা গ্রন্থ তুলে নিল। গ্রন্থটির মলাটে হাতে আঁকা গ্রহ-নক্ষত্রের ছবি। মলাট উল্টেপাতা বের করল। কালির। লেখা শুকিয়ে বেশ অস্পষ্ট হয়ে গেছে। দেখল গ্রন্থটি আরবী ভাষায় হাতে লেখা। গ্রন্থটির ভারী পাতা পেছন থেকে আস্তে আস্তে ওল্টাতে একটা পাতার কাছে এসে দোনিয়া বলল মুবারকের চিঠিটা এখানেই গোঁজা ছিল। জানি না কি করে সেই চিঠিটা এখানে এলো।
হ্যারি, ফ্রান্সিস দু’জনেই পাতাটা দেখতে লাগল। সবাই আরবী ভাষায় লেখা। হ্যারি বলল—দোনিয়া দেখুন তো এই পাতাগুলোয় কি বিষয়ে লেখা আছে।
দোনিয়া পাতাটা উল্টেপাল্টেবলল—জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়েই লেখা, অন্য কিছু নয়।
ফ্রান্সিস চুপ করে ঘরে কিছুক্ষণ পায়চারি করল। তারপর দোনিয়ার কাছে এসে বলল—আচ্ছা এখানকার সব গ্রন্থই কি আপনি পড়েছেন?
