ফ্রান্সিস আবার বলতে শুরু করল–ভাইসব তোমরা অধৈর্য হয়ো না। পিসা থেকে ফিরে এসে যা বলার আমি বলবো।
ফ্রান্সিস থামলো। সভা ভেঙে গেল। ফ্রান্সিস নিজের কেবিনঘরের দিকে চলল। পেছনে মারিয়া, হ্যারি, দোনিয়াও চলল।
কেবিনঘরে এসেফ্রান্সিসরা বসল। ফ্রান্সিস বলল—পিসা যেতে হলে আমাদের আজকেই জাহজ ছাড়তে হবে। দেরি করা চলবেনা। তার আগে রাজা এনজিওকে খবর পাঠাতে হবে।
এবার ফ্রান্সিস দোনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল—আপনি রাজা এনজিওকে খবরটা জানাবার ব্যবস্থা করুন। জানাবেন, দিন কয়েকের জন্যে আমরা পিসায় যাচ্ছি, রাজা প্রথম ফ্রেডারিকের সময়কার কিছু খবরাখবর জোগাড় করতে। ব্যস, আর কিছু নয়। ফিরে এসে আবার সন্ধানকার্য চালাবো।
দোনিয়া বলল—বেশ—আমি যাচ্ছি।
—তাহলে ফ্রান্সিস-দোনিয়া ফিরে এলেই আমরা জাহাজ ছাড়বো? হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিসের মাথা ওঠানামা করল। মারিয়া আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। বলল—আচ্ছা দোনিয়া পিসা খুব সুন্দর নগর তাইনা?
দোনিয়া হেসে বলল—হ্যাঁ রাজকুমারী। এখন তো নানা চিন্তা মাথায়। পরে আপনাকে পিসা, জেনিয়া এসব জায়গা সম্বন্ধে বলবো। আপনার শুনতে ভালো লাগবে।
দোনিয়া কেবিন ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। একটু পরেই নৌকোয় উঠে দাঁড় টানতে টানতে দূরের নুরাঘিটার দিকে চলল। দোনিয়া চলে যেতেই মারিয়া জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। রেলিঙ ধরে তাকিয়ে রইল দূরের নুরাঘিটার দিকে, কখন দোনিয়া ফিরে আসবে। পিসা নগরের কথা ও শুনেছে। না জানি কত বড় নগর, কত লোকজন কেমন তাদের জীবনযাত্রা পোশাক-পরিচ্ছদ।
বিকেল হলো। কিছু পরেই পশ্চিমের আকাশ লালচে হয়ে উঠল। কিছুটা নিস্তেজ লাল সূর্য সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় নেমে এসে তারপর ডুবে গেল। আস্তে আস্তে অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে লাগল।
ঐ স্বল্প অন্ধকারে মারিয়া দেখল দোনিয়া নৌকো চালিয়ে আসছে। মারিয়া খবরটা দিতে নিজের কেবিনঘরের দিকে ছুটল। কেবিনঘরে ঢুকে দেখল—ফ্রান্সিস আধশোয়া হয়ে গভীরভাবে কিছু ভাবছে। হ্যারি নিপ বসে আছে। মারিয়া বলে উঠল—দোনিয়া আসছে।
ফ্রান্সিস উঠে বসল। কিছুক্ষণ পরে দোনিয়া ঢুকল। বলল—রাজা এনজিওকে বললাম। রাজা আপত্তি কিছু করল না। তবে বারবার বলল যে সে মাসারিতে বেশিদিন থাকতে পারবে না। পিসা থেকে ফিরেই আমরা যেন জোর তল্লাশী চালাই।
—ঠিক আছে—ফ্রান্সিস বলল।
তারপর দোনিয়াকে বলল—বলুন তো পিসা কীভাবে যাবো?
—আপনাদের জাহাজে চড়েই যেতে পারবেন। দোনিয়া বলল।
—কিন্তু আমি ভাবছি ফ্রান্সিস বলল—এতজন বন্ধুকে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। আমরা তো লড়াই করতে যাচ্ছিনা। আমরা চারজন হলেই হবে। মারিয়া ম্যারি, আপনি আরআমি।
—কিন্তু নৌকোয় চড়ে কি যাওয়া যাবে? হ্যারি বলল।
—দোনিয়া কি বলেন? ফ্রান্সিস দোনিয়ার দিকে তাকাল।
—তিনটে নৌকো তো আছে। নৌকোগুলোয় চড়ে যাওয়া অসম্ভব মনে করি না। তবে আপনাদের রাজকুমারীও তো যাবেন। ঝড়, বৃষ্টি, রোদ—এসব সহ্য করতে পারবেন না। সমুদ্রপথ তো কম দূর হয়। তা ছাড়া কিছু এলাকা আছে যেখানে ক্রীতদাস ব্যবসায়ীরা ওৎ পেতে থাকে। সেক্ষেত্রে দল বেঁধে জাহাজে চড়ে যাওয়াই নিরাপদ। ফ্রান্সিস হ্যারি দু’জনেই ভাবলো সোনিয়ার কথাগুলো।
হ্যারিই বলল—জাহাজেই চলো ফ্রান্সিস সময়ও কম লাগবে।
—বেশ তুমি সবাইকে বলো তৈরি হতে—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাত্রা শুরু করবো। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি চলে গেল সবাইকে খবর দিতে—জাহাজ ছাড়ার জন্যে তৈরি হতে।
একটু রাত হতেই ঘরঘর শব্দে নোঙর তোলা হল। চাঁদের আলো বেশ উজ্জ্বল। বাতাসও বেগবান। সব পাল খুলে দেওয়া হল। সমুদ্রে ছোট ছোট ঢেউয়ের গায়ে চাঁদের আলোর ঝিকিমিকি। ঢেউ ভেঙে জাহাজ চলল।
ফ্রান্সিস দোনিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ডেক-এ উঠে এলো। জাহাজ চালক ফ্লাইজারের কাছে এলো দু’জনে। চালক ফ্লাইজারকে ফ্রান্সিস বলল—দোনিয়ার নির্দেশ অনুযায়ী জাহাজ চালাও। উনি এই অঞ্চলের মানুষ এসব এলাকা ভালোভাবেই চেনেন। দোনিয়া এগিয়ে এসে ফ্লাইজারকে কিছু নির্দেশ দিল। তারপর বলল—ভাই তোমার কোনো অসুবিধে হলে আমাকে বলো।
ফ্লাইজার হেসে মাথা ঝাঁকাল। কয়েকদিনের মধ্যেই ফ্রান্সিসদের জাহাজ মূলভূখণ্ডের কাছে এলো। সমুদ্রপথে ঝড়বৃষ্টি বা ঘন কুয়াশার পাল্লায় পড়তে হলো না।
বিকেলের পড়ন্ত আলোয় পিসা নগরের বন্দর দূর থেকে দেখা গেল। অনেক জাহাজ ঘাটে নোঙর করা। কত দেশের পতাকা উড়ছে জাহাজগুলোর মাথায়। জাহাজী মানুষ মোটরবাইকদের ভীড়। নগরবাসী দু’চারজন শৌখিন লোকও দেখা গেল।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ বন্দরে ভিড়ল। কাঠের পাটাতন ফেলা হলো। ফ্রান্সিসের বন্ধুদের আর তর সইছিল না। ছোট ছোট দল বেঁধে দু’দল নেমে গেল পিসা নগর ঘুরে বেড়িয়ে দেখার জন্যে। ফ্রান্সিস আগেই বন্ধুদের বলে দিয়েছিল ইচ্ছে করলে ওরা নগরে ঘুরে আসতে পারে। কতদিন পরে এরকম চোখ ধাঁধানো নগরে এলো ওরা।
কিছু পরে দোনিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সিস, হ্যারি আর মারিয়া নেমে এলো। বন্দর এলাকায় লোকজনের বেশ ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সিসরা বড় রাস্তায় এল। বেশ চওড়া পাথর বাঁধানো রাস্তা সুবেশ পুরুষ, মহিলারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাথর, লোহা, কাঠ দিয়ে তৈরি সুন্দর বাড়িঘরদোর। কয়েকটা অট্টালিকা বড় ছোট দোকানপাট। ক্রেতাসাধারণের ভিড়। ঘোড়ায় টানা সুদৃশ্য গাড়ি রাস্তায় চলছে। তাতে অভিজাতশ্রেণীর স্ত্রী-পুরুষ বসে। স্ত্রীলোকদের পোশাকও জমকালো।
