বাইরে একটা চেস্টনাট গাছের নীচে একটা লম্বাটে পাথরে এসে বসল দোনিয়া। মারিয়া,হারি বসল। বিস্কোদাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস দোনিয়ার সমানে দাঁড়িয়ে রইল। হ্যারি আস্তে বলল, ফ্রান্সিস ঐ কাগজটা কি?
ফ্রান্সিস বলল—মুবারকের চিঠি।
—বলো কি? হ্যারি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কাগজটার দিকে। মারিয়া আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারলো না। গলা নামিয়ে হ্যারিকে বলল-কি ব্যাপার বলো তো? হ্যারি বিস্কোকেও ইঙ্গিতে ডাকল। তারপর নীচু স্বরে সমস্ত ঘটনা বলতে লাগল।
দোনিয়া কাগজটা ফ্রান্সিসকে তুলে। দেখিয়ে বলল—এটাই হলো মুবারকের, ফ্রান্সিস ভালো করে দেখল কাগজটা। হরফ দেখে বুঝল আরবি ভাষা। এত পুরোনো কাগজ। হলুদ হয়ে গেছে। কাগজগুলো এত অস্পষ্ট হয়ে গেছে যে ভালো করে বোঝাই যায় না।
এবার আপনি চিঠিটা ভালো করে পড়ুন তো। দেখুন তো কোনো কথা বা পংক্তি কি আপনি বাদ দিয়ে বলেছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
দোনিয়া চিঠিটা মনে মনে পড়তে লাগল। পড়া শেষ করে মাথা নাড়ল। বলল—নাঃ, চিঠিটা হুবহু বলেছি আমি।
ফ্রান্সিস ভাবল কিছুক্ষণ, কিছু বলল না। হ্যারির ততক্ষণে নিখোঁজ যোদ্ধামূর্তির গল্পটা বলা শেষ হয়ে গেছে। হ্যারি বলল—ফ্রান্সিস কি ভাবছো?
—জানো হ্যারি, আমার কেমন মনে হচ্ছে চিঠিটায় নিশ্চয়ই কিছু লেখা বাদ গেছে, ফ্রান্সিস বলল। এবার ফ্রান্সিস দোনিয়াকে বলল—দোনিয়া—আপনি এই চিঠিটা ছাড়া আর কিছু কি ঐ গ্রন্থটাতে পান নি?
—দোনিয়া একটু ভেবে নিয়ে বলল—না—জ্যোতিষ বিদ্যার মোটা বই। তখন তো গ্রন্থটা পড়ার দিকেই সমস্ত মনপ্রাণ। হঠাৎ এই চিঠিটা পেয়েছিলাম। তখন আর বইপড়ার দিকেমন থাকেনি। চিঠিটা বেশ কষ্ট করে পড়েই বুঝতে পারলাম সোনার যোদ্ধামূর্তিগুলো মুজাহিদ দেশে নিয়ে যেতে পারে নি। মূর্তিগুলো আছে আসারির এই ক্যালে মানে খাঁড়ির জলের নীচে। একটু থেমে দোনিয়া বলল—
—বেশ কিছুদিন এই চিন্তাটাই আমাকে পেয়ে বসল। পরে আর এ অভিজাত—ভদ্রলোকের বাড়ি যাইনি। বইটাও অর পড়া হয়নি—ফ্রান্সিস একটু ভেবে নিয়ে বলল। আমার মনে হয় ঐ বইয়ে আরো কিছু সূত্র পাওয়া যাবে।
—এটা তখন ভাবি নি, ধরেই নিয়েছিলাম এই চিঠির ভিত্তিতেই নিখোঁজ মূর্তিগুলো উদ্ধার করতে পারবো। কিন্তু এখন বুঝছি—এতবড় খাঁড়িতে ওসব আদৌ খুঁজে পাবো কিনা—দোনিয়া বলল।
—আমি তো সেকথা আপনাকে আগেই বলেছি—ফ্রান্সিস বলল।
—আচ্ছা—হ্যারি বলল—আপনি তো চিঠিটা পিসা নগরের একজন অভিজাত ভদ্রলোকের বাড়িতে পেয়েছিলেন?
—হ্যাঁ, দোনিয়ার মাথা ওঠানামা করে বলল।
—ওখানে আমাদের নিয়ে যেতে পারবেন? হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস বলল—আমিও তাই বলছিলাম। ওখানে খোঁজখুঁজি করতে পারলে হয়তো অন্য আরও সূত্রও পেতে পারি।
—এটা আপনাদের অনুমান—তাই কিনা—দোনিয়া বলল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল—তা ঠিক। তবে এখন পর্যন্ত আমরা মুবারকের চিঠি থেকে শুধু এইটুকু জানলাম যে সোনারমূর্তিগুলো এইখাড়ির জলের নীচেই কোথাও আছে। এই একটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এখন প্রশ্ন—এতবড় খাঁড়ির কোথায় সেই নৌকোটা ডুবে গিয়েছিল। খাঁড়িটার জলের গভীরতা বেশি নয়। আপনার ঐ বড়শিগুলো ফেলে ফেলে টেনেটেনে খোঁজা যায় ঠিকই কিন্তু সেটা কতটা সম্ভব? দিনের পর দিন এত কষ্ট করে খুঁজেও যে নিখোঁজ মূর্তি গুলো পাবো, সেটা অনিশ্চিত। কাজেই মুবারকের চিঠিটা যেখানে পাওয়া গিয়েছিল সেখানে একটু খোঁজাখুঁজি করতেইহবে। যদি কিছু পাওয়া যায় বা হদিশ করা যায়। দোনিয়া একটু ভাবল, তারপর বলল—বেশ, তবে তো আপনাদের পিসায় যেতে হবে।
—তা তো যেতেই হবে—হ্যারি বলল।
–ঠিক আছে। আপনারা কবে কিভাবে যাবেন ভেবে দেখুন—দোনিয়া বলল।
—সেটা আমরা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করবো। ফ্রান্সিস বলল।
নৌকোয় উঠে ফ্রান্সিস বলল—মারিয়া—আমরা আমাদের জাহাজে যাবো। মারিয়া একটু আশ্চর্য হয়েই বলল
—আজকে খোঁজাখুঁজি করবে না? ফ্রান্সিস বলল—না, আমাদের পিসা যেতে হবে।
—সে তো মূল ভূখন্ডে, মারিয়া বলল।
—হ্যাঁ সেখানেই যেতে হবে—হ্যারি বলল।
—কিন্তু তাতে তো আরো সময় নষ্ট হবে—বিস্কো বলল।
—না হয়তো এই সময়টা খুবই কাজে লাগবে—ফ্রান্সিস বলল।
—সেটা তাহলে বন্ধুদের বুঝিয়ে বললা—বিস্কো বলল।
—সেইজন্যেই আমাদের জাহাজে যাচ্ছি, দেখি সব বলে—ফ্রান্সিস বলল।
এবার ফ্রান্সিসদের নিয়ে নৌকোগুলো চলল ওদের জাহাজের দিকে। নৌকোর দাঁড় টেনে বিস্কো বলল-রাজকুমারী, এসব জায়গায় দেখছি গরম খুব বেশি না।
মারিয়া বলল—এটা ভূমধ্যসাগর অঞ্চল, ঠান্ডা গরম কোনোটাই বেশি নয়।
জাহাজে উঠে ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল—সবাইকে ডেক-এ আসতে বলো।
ভাইকিং বন্ধুদের সবাইকে খবর দিল হ্যারি কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাইকিং বন্ধুরা জাহাজের ডেক-এ এসে জড়ো হল। ওরা ভেবে পাচ্ছিল না ফ্রান্সিস হঠাৎ এভাবে ওদের ডাকলো কেন ফ্রান্সিস বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল—ভাইসব, আমরা নিখোঁজ মূর্তিগুলো উদ্ধারের জন্যে চেষ্টা চালাচ্ছি। এখন একটা বিশেষ প্রয়োজনে আমাদের পিসায় যেতে হবে। যে কাজে যাচ্ছি তা হোক বা না হোক কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা ফিরে আসব। আমাদের সঙ্গে বন্ধু দোনিয়াও থাকবেন।
ফ্রান্সিস থামলো। ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। ওরা অনেকেই ভেবেছিল ফ্রান্সিস দেশের দিকে যাত্রার কথা বলবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে আরো কয়েকদিন দেরি হবে। শুধু তাই নয়, ফ্রান্সিস তো এখনও যোদ্ধামূর্তিগুলোর হদিশই করতে পারে নি।
