—নেমে যাবো, চলো। দোনিয়ার সঙ্গে একটু কথা বলবো—ফ্রান্সিস বলল।
দু’জনে আবার নামতে লাগল। শুকনো আর ভেজা সিঁড়ির ধাপ দিয়ে নামতে অসুবিধে হলো না। কিন্তু একেবারে নীচের ভীষণ পেছল সিঁড়িগুলো দিয়ে সাবধানে নামলো।
দু’জনে নৌকোয় উঠল। হ্যারি জিজ্ঞেস করল—কি দেখলে ওপরে?
—ধস নেমে ভেঙেপড়া নুরাঘিটা দেখলাম। ভাঙা পাথরটাথর সিঁড়ি এসব ফ্রান্সিস বলল।
বেশ অন্ধকার সুড়ঙ্গটা থেকে ওরা নৌকো চালিয়ে বেরিয়ে এলো। নৌকোর দাঁড় টানতে টানতে ফ্রান্সিস বলল—দোনিয়া, আমার কেমন মনে হচ্ছে মুবারক এখানে পরে এসেছিল আর একাই চেষ্টা করেছিল যোদ্ধামূর্তিগুলো উদ্ধার করতে
—একা কেন? কয়েকজন সঙ্গী নিয়েও তো আসতে পারতো—দোনিয়া বলল।
ফ্রান্সিস বলল—না, আপনার মতো মুবারককেও একাই এই খাঁড়ির নীচে খুঁজতে হয়েছে। কিভাবেমুবারক খুঁজেছিল বলতে পারবো না। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস নৌকোটা কোথায় ডুবে গিয়েছিল, মুবারক সেটা জানতো।
—সেই চিঠিটায় কিন্তু সেই ইঙ্গিতটা নেই। দোনিয়া বলল।
ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ ভেবে। তারপর বলল—আচ্ছা যেখানে নৌকো থেকে মুবারক জলে ঝাঁপ দিচ্ছে সেই জায়গাটা একবার বলুন তো। আপনার তো মুখস্থ।
দোনিয়া একটু ভেবে নিয়ে বলল—“জাহাজর সঙ্গে বাঁধা দড়ি ছিঁড়িয়া গেল। সেই সঙ্গে ঝড়ের প্রবল ধাক্কায় আমাদের নৌকা কাত হইয়া ডুবতে লাগিল। নৌকায় আমার একমাত্র সঙ্গীটিকে বার বার ডাকিয়াও কোনো সাড়া পইলাম না। আমি আর কালবিলম্ব না করিয়া অন্ধকারে ঝড়বিক্ষুদ্ধ খাঁড়ির জলে ঝাপাইয়া পড়িলাম। আজ আর জানি না কিভাবে আমি তীরে আসিয়া পৌঁছইয়াছিলাম।
দোনিয়া থামতেই ফ্রান্সিস বলল—দেখুন, আমার কেমন বিশ্বাস জলে ঝাপিয়া পড়বার সময় মুবারক নিশ্চয়ই কিছু দেখেছিল।
—কিন্তু ঐ ঝড়জলের মধ্যে ঐ অন্ধকারে মুবারক কি কিছু দেখতে পেয়েছিল? দোনিয়া বলল।
—মনে রাখবেন,ঝড় এলে মেঘে বিদ্যুৎ চমকাবেই। ঝড় থামার যাবার পর কিছুক্ষণ হলেও বিদ্যুৎ চমকায়। আমার জাহাজী জীবনের অভিজ্ঞতা এ কথাই বলে-ফ্রান্সিস বলল। দোনিয়া বলল—হ্যাঁ? জাহাজে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ান আপনারা। কাজেই আপনার অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে অনেক বেশি। তবুবলি-মুবারক কিন্তু বিদ্যুৎ চমকানোর কথা কোথাও লেখে নি।
—এটাই আমার কাছে একটু অস্বাভাবিক লাগছে। মুবারক ঝড়ের বর্ণনা করেছেন সুন্দর। সব ঘটনার বর্ণনাই বাস্তব। কিন্তু বিদ্যুৎ চমকানো আর বাজ পড়ার কথাটা বাদ দিয়েছে কেন, বুঝলাম না।
ফ্রান্সিস বলল। দোনিয়া একটু ভেবে নিয়ে মাথা উঠানামা করে বলল—কথাটা ভাববার মতো।
—আচ্ছা, আরবিতে লেখা ঐ চিঠিটা কি আপনার কাছে? ফ্রান্সিস বলল।
—হ্যাঁ আছে—দোনিয়া বলল।
—কোথায় আছে? পিসায়? ফ্রান্সিস সাগ্রহে বলল।
—না, এখানেই আছে, দোনিয়া বলল।
—আমাকে একটু দেখাবেন? অবশ্য আমি আরবি ভাষার আ-ও জানি না। ওটা আপনিই আমার সামনে ভালো করে পড়বেন। লক্ষ্য রাখবেন শুধু ঝড়ের বর্ণনায় জায়গাটা এবং ঝাঁপিয়ে পড়ার বর্ণনাটা—ফ্রান্সিস বলল।
—এ চিঠিটা এতবার পড়েছি-নাঃ আমি হুবহু চিঠিটাই আপনাকে বলেছি। দোনিয়া বলল।—তবু একবার চিঠিটা আমাকে দেখান দিন আমার অনুরোধ, ফ্রান্সিস—বলল।
দোনিয়া মাথা নিচু করে ভাবলো একটুক্ষণ। তারপর মাথা তুলে বলল,—বেশ চলুন, দেখুন চেষ্টা করে চিঠিটা থেকে কোনো সূত্র পান কিনা।
—তাহলে কোথায় নামতে হবে আমাদের? ফ্রান্সিস জানতে চাইল। দোনিয়া খাঁড়ির ডানদিকের একটা ঢালু পাড় আঙুল তুলে দেখিয়ে। বলল ওখানে নেমে আমাদের যেতে হবে।
ফ্রান্সিস দাঁড় বাওয়া থামিয়ে পেছনে নৌকায় হ্যারি দের দিকে চেঁচিয়ে বলল—হ্যারি, নৌকো নিয়ে আমাদের পেছনে-পেছনে এসো।
ঘাটের মতো ঢালু জায়গাটায় ফ্রান্সিসদের নৌকো দুটো লাগল। এখানে ঢালু পাড়টায় পাথর বেশি নেই। সবাই নামল নৌকা থেকে। ঢালু পাড় দিয়ে উঠছে ওরা তখন দেখল দু’টো জেলেদের নৌকো উপুড় করে রাখা। বোধ হয় মেরামতি রঙ করার জন্যে। পাড় ছাড়াতেই একটু দূরে কয়েকটা চেস্টনাট গাছের নীচে জেলেদের পাথর সাজিয়ে তৈরি বাড়ি দেখা গেল। ওপরের ছাউনি শুকনো ঘাসের।
সবাই বাড়িগুলোর সামনে এলো। বাড়িগুলো থেকে জেলেবৌ, বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ওদের দেখতে লাগল। সমর্থ পুরুষরা তো মাছ ধরতে চলে গেছে। দুটো ঘরের সামনে এসে দোনিয়া দাঁড়াল। বাঁদিকের ঘরটা থেকে একজন বুড়ি বেরিয়ে এলো। চোখ কুঁচকে। দোনিয়াকে দেখে দাঁত ফোলা মুখে হাসল। দোনিয়াও হাসল। কি বলল যেন। তারপর পাশের চ্যালাকাঠের দরজা বসানো ঘরটা খুলে ঢুকল। ফ্রান্সিস ঢুকল শুধু। ছোটঘর। হ্যারি রা বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস দেখল একটা ঘাসের বিছানামতো পাতা। বিছানায় কম্বলের মতো মোটা কাপড় পাতা। ঘাস পাকিয়ে একটা বালিশমতোও করা হয়েছে। বিছানার ওপাশে একটা ওক কাঠের লম্বা বাক্স। তাতে লতাপাতা আঁকা রূপোর গিল্টি। বাক্সটার দিকে যেতে যেতে দোনিয়া বলল—এটাই আমার আস্তানা।
বাক্সের ডালা খুলে দোনিয়া কিছু শৌখিন পোশাকপত্র আরো কিসব সরিয়ে কয়েকটা পার্চমেন্ট কাগজ তুলে নিল। সেগুলো দেখে নিয়ে একটা কাগজ হাতে নিয়ে। বাকিগুলো রেখে দিল। বাক্স বন্ধ করে বলল—এখানে আলো কম, পড়া যাবে না, বাইরে চলুন।
