মারিয়া একটু চমকে ফিরে তাকাল ফ্রান্সিসদের দিকে। তারপর স্বপ্নবিষ্টের মতো যেন এলো নামবার সিঁড়ির কাছে। সবাই নেমে এলো।
পরদিন সকাল থেকেইফ্রান্সিসরা কাজে নেমে পড়ল। দোনিয়ার সঙ্গে বসল ফ্রান্সিসরাজার নৌকোটায় বসল হ্যারি, মারিয়া আর বিস্কো।
দোনিয়া ওর বঁড়শি টেনে চলল। দোনিয়া ক্লান্ত হয়ে পড়লে ফ্রান্সিস বঁড়শি টেনে চলল। দুপুরে নুরাঘিতে এসে খাওয়াদাওয়া সেরে আবার নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়া, বঁড়শি টানা। কিন্তু যোদ্ধামূর্তিগুলোর কোনো হদিশই পাওয়া গেল না। বিকেলে বিস্কো রাজার নৌকোয়
মারিয়াকে নিয়ে জাহাজে রেখে আসে। সকালে আবার গিয়ে মারিয়াকে নিয়ে আসে।
দু’দিন কাটল। কিন্তু একটা যোদ্ধামূর্তি উদ্ধার করা গেল না। দোনিয়ার তৈরি বঁড়শিতে উঠল জাহাজের কাদা ল্যাপটানো ভাঙা-নোঙর, জলেপচা হাতল, জংধরা ঢাল। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল একটা জেলে নৌকো হঠাৎ ঝুঁকেপড়া পাথরে চাঁইয়ের আড়ালে ঘুরছে। নৌকোটায় একজন জেলে। ফ্রান্সিস বুঝল স্পিনোলার ব্যবস্থা এটা। ওদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
সেদিন দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়া সেরে নৌকোয় এলো ওরা। চলল বঁড়শি টেনে টেনে খোঁজা। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকিয়ে দেখছিল। এতবিস্তৃত খড়ি। গভীরতা কম হলেও এভাবে খুঁজে বের করা কি সম্ভব? হঠাৎ ফ্রান্সিস দেখল উত্তর দিকের ধসেপড়া নুরাঘিটার নীচে অনেকটা চৌকোণো একটা গহ্বরমতো। ফ্রান্সিস দোনিয়াকে ঐ জায়গাটা দেখিয়ে বলল—ওটা কি?
দোনিয়া বলল—ওটা বোধহয় নুরাঘিটায় ওঠার কোনো গোপন পথ ছিল। এখন তোনুরাঘিটার এপাশ ধসে পড়েছে। পথটাও পাথরে আটকে গেছে বোধহয়। ঐ গহ্বরমতো জায়গাটায় আমরা আমাদের নৌকোটা ভোর হবার আগেই লুকিয়ে রাখতাম।
ফ্রান্সিস বলল—চলুন না ঐ গোপনপথটার অবস্থা দেখে আসি।
—জায়গাটা অন্ধকার আর ভীষণ পেছল পাথরের ধাপগুলো। দোনিয়া বলল।
–ঠিক আছে। দেখা যাক একবার-ফ্রান্সিস বলল। তারপর নৌকোয় উঠে দাঁড়িয়ে গলা চড়িয়ে বিস্কোকে ডাকল—বিস্কো—
বিস্কো ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস আঙুল তুলে ঐ গহ্বরমতো জায়গাটা দেখিয়ে বলল—ঐখানে যাবো আমরা। তোমরা আমাদের পেছনে এসো।
গহ্বরমতো জায়গাটায় পৌঁছল ওরা। ওটার ছাদমতো ওপরটা বেশ উঁচুতে। নৌকো দুটো ঢুকে গেল। বেশ অন্ধকার ভেতরটা, অন্ধকারটা একটু সয়ে আসতে ফ্রান্সিস দেখল জলের ধারেই পাথরের সিঁড়ি উঠে গেছে। ফ্রান্সিস প্রায় অন্ধকারে নৌকো থেকে পাথরের সিঁড়িতে পা রাখল। শরীরে একটু ঝাঁকুনি, সাবধানে সিঁড়িতে উঠে দাঁড়াল। সত্যি—কাদা ল্যাপটানো সিঁড়িটা ভীষণ দূরে পেছল। পেছনে নৌকো থেকে মারিয়া অস্ফুটস্বরে বলল—সাবধান।
ফ্রান্সিস মৃদু হাসল। শুধু ডানহাতটা তুলে নাড়ল। তারপর পা টিপে টিপে একটা একটা করে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। কয়েকটা সিঁড়ি উঠতেই বুঝল জলকাদা আর নেই। কিন্তু ভেজাভেজা সিঁড়িগুলো। বুঝল, জোয়ারের সময় এর বেশি সমুদ্রের জল ওঠে না। আরো ক’টা সিঁড়ি উঠল। আর ওঠা যাবে না। চৌকোনো পাথর গড়িয়ে পড়ে সিঁড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল শাঁদিকে ভেঙে পড়া পাথরের দেয়ালের বড় ফাঁক দিয়ে বাইরের আলো পড়েছে। ওখানে অন্ধকারে নেই। কিন্তু ওখানে পৌঁছতে হলে এই চৌকোনো পাথরের স্তূপ পার হতে হবে। নীচে থেকে হ্যারির ডাক শোনা গেল—ফ্রান্সিস ?
গহ্বরমতো জায়গাটায় পাথুরে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ডাকটা জোরালো শোনালো। ফ্রান্সিস ও চেঁচিয়ে বলল—ভয় নেই—আমি নিরাপদ।
তারপর ফ্রান্সিস গড়িয়ে পড়া চৌকোনো পাথরগুলো ভালো করে দেখে হিসেব করতে লাগল। পাঁচ-ছ’টা পাথর সরাতে পারলেই সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যাবে।
এবার ফ্রান্সিস সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। পেছল সিঁড়ি পর্যন্ত নামল না। ওখান থেকেই বলল হ্যারি, বিস্কোকে উঠে আসতে বলল, তোমরা নেমো না। প্রথম তিন চারটে সিঁড়ি ভীষণ পেছল।
একটু পরেই বিস্কো উঠে এলো। ও বেশ হাঁপাচ্ছে। কাছে এসে বলল, কি ব্যাপার?
-এসো আমার সঙ্গে ফ্রান্সিস সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। কয়েকটা সিঁড়ি উঠে ফ্রান্সিস পাথরের স্তূপ দেখাল। বলল—ঐ পাথরগুলো সরাতে হবে। বেশি না, পাঁচ ছটা সরাতে পারলেই সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যাবে। এবার দুজনে মিলে প্রথম চৌকোনা পাথরটা ধরে ঠেলতে লাগল। নুরাঘির ভাঙা দেয়ালের পাথর, খুব ভারী নয়। আস্তে আস্তে ধরে ধরে পাথরগুলো সরিয়ে সিঁড়ির ধাপে ধাপে পেতে দিল। ফ্রান্সিস পা ফেলে দেখল সমান পাথরগুলো নড়ছে না। শুকনো পাথর। উঠতে সুবিধেই হলো। ফ্রান্সিস ডাকল—বিস্কো উঠে এসো।
বিস্কো উঠে এলো। আবার দেখল এখানে বাঁ পাশের দেয়াল ভেঙে বিরাট হাঁ হয়ে গেছে। রোদ পড়ে জায়গাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ওখানে পৌঁছে ফ্রান্সিস দেখল ওপরের দিকেও সিঁড়ির কয়েকটা ধাপ দেখা যাচ্ছে। তারপর পাথরের স্তূপ। ঐ জায়গাটা ধস নেমে সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। আর ওঠা সম্ভব নয়।
ফ্রান্সিস বাঁ দিকের ভাঙা খোঁদলটা দিয়ে দেখল সম্পূর্ণ খাঁড়িটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বাঁদিকে অটুট নুরাঘিটা। খাঁড়ির মুখে রাজার জাহাজ। দূরে দূরে জেলেদের নৌকো। আরো দূরে ওদের জাহাজটা। সমুদ্রে আজ অনেক শান্ত। সাদারঙের সামুদ্রিক পাখিগুলো মাথার ওপর পাক খেয়ে উড়ছে। পাখির তীক্ষ্ণ ডাক মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে। বিস্কো এসে ওর পাশে দাঁড়াল। বিস্কোও বাইরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে। তারপর বলল—কি করবে এখন?
