—ওপরের ঘরটা হচ্ছে গির্জা। রাজা ফেডারক ঐ গির্জাটা তৈরি করিয়েছিলেন। ওখানে গেলে একটা ছোট্ট সৈন্যমূর্তি দেখতে পাবেন। ব্রোঞ্জে তৈরি। ওটা ফ্রেডারক নিজেই তৈরি করেছিলেন। তারপর পিসার এক কর্মকারকে নমুনা হিসেবে ওটা দিয়েছিলেন। ঐ মূর্তিটার মতোই সোনার সাতটি মূর্তি সেই কর্মকার গড়িয়ে দিয়েছিল। রাজা ফ্রেডারিক মূর্তিগুলো বাজিয়ে-বাজিয়ে সাতটা সুরধ্বনির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছিলেন। তার নির্দেশেই কর্মকার কাজ করেছিল। মূর্তি তৈরি শেষ হলে গির্জায় এনে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। ওপরে গির্জায় গেলে ব্রোঞ্জের মূর্তিগুলি আর সবই দেখতে পাবেন। দোনিয়া বলল ততক্ষণে ফ্রান্সিসের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। ও তাড়াতাড়ি কাঠের পাত্র থেকে জল খেয়ে হাত-মুখ ধুয়ে উঠে। বলল, চলুন।
আর সবাই অবাক। তখনো কারও খাওয়া হয় নি। মারিয়া বলল—আরে বাবা—আগে খেয়ে নাও তো।
ফ্রান্সিস সে কথায় কান দিল না। বলল—দোনিয়া চলুন। দোনিয়া খেতে খেতে হেসে বলল,—ঠিক আছে, আপনি সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে গির্জাটা দেখতে থাকুন আমরা যাচ্ছি।
ফ্রান্সিস আর কোনো কথা না বলে দ্রুতপায়ে ঘরের বাইরে এলো। দেখল এখানেও একটা বড় গোল ঘর। পাথরের মেঝের এখানে-ওখানে শুকনো ঘাসপাতা বিছানা। প্রায় পনেরো-কুড়িজন সৈন্য সাধারণ পোশাকে শুয়ে বসে আছে। এই ঘরেই বোধহয় সুলতান মুজাহিদের রাজসভা বসতো। ডানহাতে দেখল ওপরে ওঠার সিঁড়ি। ও সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। এই সিঁড়ির পাথরের ধাপগুলো অনেক মসৃণ। ওপরের ঘরে উঠে দেখল ঘরটা গোল। কিন্তু খুব বড় নয়। গরাদ বসানো কয়কটা জানালা দিয়ে আলো আসছে। সব কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দেখল সামনে একটা কাঠের বেদী। তার ওপর ক্রুশবিদ্ধ যীশুর কাঠের মূর্তি। চেস্টনাট কাঠ কুঁদে-কুঁদে তৈরি। বড় সুন্দর মূর্তিটি। বেদীতে সার দিয়ে মোমবাতি বসানো। কোনোটাই জ্বলছে না। সমুদ্রের হওয়ায় নিভে গেছে বোধহয়। শুধু একটা হলুদ রঙের মোটা বেশ বড় মোমবাতি জ্বলছে। বেদীটা থেকে কয়েক হাত সামনে দু’টো গোল কাঠের খুঁটিমতো পোঁতা। খুঁটিতে একটা রূপোর তার টানা দিয়ে বাঁধা। তাতে কয়েকটি রূপোর ছোট ছোট শেকল ঝুলছে। ফ্রান্সিস গুণে দেখল সাতটা শেকল। মাঝখানের শেকলটা বড় আর মোটা। ফ্রান্সিস এটার কারণ বুঝল না। গির্জা চারদিক বেশ পরিষ্কার।
—কি? দেখলেন সব? পেছনে দোনিয়ার কথা শুনে ফ্রান্সিস ঘুরে দাঁড়াল। দেখল, মারিয়া, হ্যারি, বিস্কোও এসেছে। ফ্রান্সিস সেই ঝোলা শোকলগুলো দেখিয়ে বলল—দোনিয়া, এখানে নিশ্চয়ই কিছু ঝোল্লানো থাকতো।
—ঠিক ধরেছেন। নিখোঁজ সৈন্যমূর্তিগুলো ঝোলানো থাকতো—দোনিয়া বলল। তারপর বাঁদিকে পাথরের একটা তাকের দিকে যেতে যেতে বলল —এখানে আসুন। সবাই পাথরের তাকটার কাছে এসে দাঁড়াল। তাকের ওপর একটা ইঞ্চি ছয়েক মূর্তি রাখা। ব্রোঞ্জের মূর্তি, কালচে রঙ এখন। দোনিয়া মূর্তিটা দেখিয়ে বলল—রাজা ফ্রেডারিক এই মূর্তিটা ব্রোঞ্জে ঢালাই করে নিজে গড়েছিলেন। বলা হয়—জমিতে চাষ করার সময় পাদ্রিয়া নামে জায়াগায় একজন কৃষক প্রাচীন একটা সৈন্যমূর্তি পেয়েছিল। তবে সেটা ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। রাজা ফ্রেডারিক নাকি সেই মূর্তিটির আদলে এইমূর্তিটি গড়েছিলেন। তারপরের কথা তো বলেছি।
ফ্রান্সিস খুব আগ্রহের সঙ্গে মূর্তিটা দেখতে লাগল। সৈন্যমূর্তিটা দেখতে একরকম মারিয়াই প্রথম বলল—সৈন্যটির মাথায় বাঁকমতো কি ওটা?
—শিরস্ত্রাণ।—সিং এর মতো দেখতে। হয়তো সেসময় যোদ্ধারা এরকম শিং-এর মতো শিরস্ত্রাণ পরতো দোনিয়া বলল।
হ্যারি বলল—এর আদলে যেসব সোনার মূর্তিগড়া হয়েছিল সেগুলো কিএর চেয়ে বড় ছিল?
—হ্যাঁ, প্রায় এক ফুট। পঞ্চম মূর্তিটা
ছিল উচ্চতায় চার ফুট, সবচেয়ে বড়।
দোনিয়া বলল। তারপর পাথরের তাকাটার বাঁপাশ থেকে দুটো রূপোর হাতমতো বের করে বলল এই দুটো দিয়ে ঘা দিয়ে দিয়ে বাদ্যকর সুরধ্বনি তুলতেন। হাতমতো জিনিসটা রেখে দিয়ে বলল—ফ্রান্সিস, মূর্তিটার সিং দুটো লক্ষ্য করুন। দেখুন সিং দুটো পরস্পর গায়ে-গায়ে লেগে আছে। যে রূপোর শেকলগুলো ঝুলছে দেখে এলেন সেগুলোর নীচের কড়ার সঙ্গে ঐ সিং-এর জোড়া জায়গাটা আটকে দেওয়া ছিল। একটু থেমে দোনিয়া বলল—এবার চলুন ঝুলন্ত শেকলগুলো দেখতে।
সেই খুঁটিতে ঝোলানো শেকলগুলোর কাছে এসে দোনিয়া বলল—দেখুন সাতটা শেকলে সাতটা যোদ্ধামূর্তি ঝুলতো। লক্ষ্য করুন—পঞ্চম শেকলটা মোটা আর বড়। ওটাতেই ঝুলতো সবচেয়ে বড় মূর্তিটা। ফ্রান্সিসরা বেশ আগ্রহ নিয়েই দেখতে লাগল ঐ খুঁটি দুটো, ঝুলন্ত শেকলগুলো। মারিয়া ছোট থেকেই রাজপ্রাসাদের নৃত্য-গীতিশালায় নানা ঐক্যবাদনের অনুষ্ঠান শুনেছে। ও সহজেই কল্পনা করে নিতে পারল দুশ বছর আগেকার সেই পরিবেশ –ঐ শেকলগুলোয় ঝুলছে সাতটি যযাদ্ধামূর্তি। ভোরের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে বাইরের ছোট ছোট পাহাড়ে-উপত্যকায়, সমতলে মাটিতে ঘাসে আর এখানে এক অন্ধ বাদ্যকর মূর্তিগুলোতে ঘা দিয়ে দিয়ে গড়ে তুলেছে সপ্তসুরের এক স্বর্গীয় পরিবেশ। ফ্রান্সিসরা আস্তে-আস্তে সিঁড়ির দিকে চলল। মারিয়া তখনও দাঁড়িয়ে আত্মমগ্ন। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ডাকল-মারিয়া, এসো।
