শাঙ্কো একটুক্ষণ মাথা গোঁজ করে থেকে বলল—ফ্রান্সিস তোমার মত তো মানতেই হবে। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে ছিল তোমাদের সঙ্গে যাওয়ার।
—না শাঙ্কো।
—আমি সবদিক ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি দুঃখ করো না।
ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কো আর কোনো কথা বলল না।
খাওয়া শেষ করে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। ও আরমারিয়া আগে থেকেই পোশাকটোশাক পরে তৈরি হয়ে ছিল। সবাই সিঁড়ি বেয়ে ডেক-এ উঠে এলো। বিস্কোও তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছিল। ওর কোমরে তলোয়ার গোঁজা দেখে ফ্রান্সিস বলল—বিস্কো, তলোয়ার রেখে যাও। আমরা তো এখন লড়াই করতে যাচ্ছি না। বিস্কো কোমর থেকে তোয়ার খুলে একজন বন্ধুর হাতে দিল।
হালের কাছ থেকে দড়ির মই নামিয়ে দেওয়া হলো। ফ্রান্সিসরা একে একে নেমে এলো। দোনিয়ার নৌকোয় ফ্রান্সিস আর দোনিয়া বসল। রাজার নৌকোটায় বসল হ্যারি, মারিয়া আর বিস্কো। নৌকোর বাঁধন খুলে ফ্রান্সিসরা নৌকো বেয়ে চলল খাড়ির দিকে। এ সমুদ্র আজ খুব শান্ত নয়। এলোমেলো জোর হাওয়া ছুটছে, ঢেউ উঠছে। ঢেউয়ের দোলায়—দোল খেতে খেতে নৌকো দু’টো চলল খাড়ির দিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজার জাহাজের কাছে এলো ওরা। মারিয়া বলে উঠলো, দেখেছো
—কি সুন্দর জাহাজ! হ্যারি বলল—রাজকুমারী ওটা সার্দিনিয়ার রাজা এনজিওর জাহাজ। জাহাজের রেলিং-এর কাছে তখন সৈন্যরা ভীড় করে দাঁড়িয়ে দেখছে ফ্রান্সিসদের, বিশেষ করে মারিয়াকে। ওরা বুঝে উঠতে পারল না এরকম পোশাক পরা লোকগুলো আর মেয়েটি কোন্ দেশের?
রাজার জাহাজ ছাড়িয়ে নৌকো দু’টো খাঁড়িতে ঢুকল। ফ্রান্সিস ডাকল—দোনিয়া?
দোনিয়া নৌকোর মাঝখানে চুপ করে বসেছিল। দাঁড় বাইছিল ফ্রান্সিস দোনিয়া ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস বলল—আপনি কিভাবে এই অদ্ভুত বঁড়শিগুলো দিয়ে মূর্তিগুলো খুঁজতেন?
দোনিয়া নৌকোর মাঝখানে গোল করে রাখা দড়িরমুখটা বের করল। বড়বড় বঁড়শিগুলো ঐ মুখে বাঁধা। দোনিয়া বঁড়শিটা জলে নামাল। দড়ি ছাড়তে লাগল। একটু পরেই দড়ি ছাড়া বন্ধ করল। তার মানে বঁড়শিগুলো মাটি ছুঁয়েছে। ফ্রান্সিস দড়ি ছাড়ার সময় হিসেব করে বুঝল—খাঁড়িটার জল খুব গভীর নয়। ফ্রান্সিস নৌকো বেয়ে চলল। দোনিয়াও বঁড়শির দড়ি টেনে নিয়ে চলল। তার মানে জলের নীচের মাটির ওপর দিয়ে বঁড়শিগুলো চলেছে। ফ্রান্সিস বুঝল—ব্যাপারটা। ও বলল—দোনিয়া, আপনি দাঁড়ে বসুন, আমি বঁড়শি টানছি। ওরা জায়গা বদল করল। ফ্রান্সিস বঁড়শি টেনে টেনে চলল। হঠাৎ কিসে লেগে বঁড়শিট আটকে গেল। ফ্রান্সিস দড়িতে জোর ঝুঁকুনি দিল তিন চারবার। বঁড়শি আটকে রইল। ফ্রান্সিস দড়িটা ধরে টানতে লাগল। বঁড়শিতে আটকে কি যেন উঠে আসছে। টেনে টেনে ফ্রান্সিস বঁড়শিগুলো জলের ওপরে তুলল। দেখল একটা বঁড়শিতে লম্বা জাহাজবাঁধা কাছি আটকে আছে। কালো কাদায় কাছিটা মাখামাখি হয়ে আছে। ফ্রান্সিস একটু হেসে জোরে একটা হ্যাঁচ কা টান দিতেই জলেপচা কাছিটা ছিঁড়ে গিয়ে জলে ডুবে গেল। ফ্রান্সিস বঁড়শিগুলো জলে ফেলে আবার টেনে নিয়ে চলল। কিছুটা আসতেই আবার বঁড়শিগুলো কিসে আটকাল। আবার ফ্রান্সিস দড়ি টেনে তুলতে লাগল। জলের ওপর উঠলে দেখা গেল বঁড়শিতে সমুদ্রের শ্যাওলা জড়ানো ঝুপড়ি ছোট গাছমতো। আশ্চর্য! তাতে কয়েকটা লাল হলুদ ফুল। রঙটা অবশ্য মরা মরা। তবু সমুদ্রের নীচে এরকম ক্ষুদে ফুলের গাছ! আশ্চর্য বৈকি! দোনিয়া হেসে বলল-সমুদ্রের নীচেমাটিতে কাদায় নাকি এরকম ফুল-ফোঁটানো ক্ষুদে গুল্ম আছে। মনে হয় কে যেন ফুলের বাগান করে রেখেছে।
—আপনি দেখেছেন? ফ্রান্সিস বলল। দোনিয়া একইভাবে হেসে মাথা নেড়ে বলল—না। আমার সব বই পাঠ করে পাওয়া বিদ্যে।
নৌকো দু’টো নুরাঘির কাছে এলো। ফ্রান্সিস আরো কয়েকবার বঁড়শি ফেলল। কিন্তু কোনোকিছুতে আটকালো না। ফ্রান্সিস বলল—দোনিয়া। এই বঁড়শিগুলো দিয়ে কি মূর্তিগুলোর হদিশ করা যাবে এত বড় খাঁড়ির জলে?
—এছাড়া আর কোনো উপায় তো এখনও ভাবতে পারিনি। তবে একটা ব্যাপার কি জানেন—সাত-সাতটা মূর্তি। নিশ্চয়ই একসঙ্গে জড়িয়ে নীচের মাটিতে পড়ে নেই। বরং নৌকাডুবির সময় ছড়িয়ে পড়েছে। অন্তত একটা মূর্তিরও হদিশ পাই যদি বাকি ক’টাও কাছাকাছিই পাবো।
ফ্রান্সিস একটু ভেবে বলল-আপনার কথাটায় যুক্তি আছে। তবে এভাবে দীর্ঘদিন ধরে তল্লাসি চালাতে হবে। সেটা কি শরীরে সইবে? দোনিয়া কোনো কথা না বলে মথা ওঠা-নামা করল।
খাঁড়ি পার হয়ে নৌকো দু’টো নুরঘির সামনের ঘাটে এসে লাগল। ফ্রান্সিসরা নামল সবাই। ঘাটে নৌকো বেঁধে সবাই নুরাঘিটায় ঢুকল। মারিয়া তো আগে এখানে আসে নি। ও অবাক হয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল।
পাথরের সিঁড়ি দিয়ে ওরা ওপরে উঠল। নিজেদের ঘরটায় ঢুকল। মারিয়া জানালা দিয়ে বাইরের খাড়ি সমুদ্র দেখতে লাগল। বিস্কো বসল না, ও মারিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরেটা দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। হ্যারি, দোনিয়া বসে রইল। ফ্রান্সিস দু’হাতে মাথা রেখে শুয়ে রইল। অনেক চিন্তা। কিভাবে মূর্তি উদ্ধারের কাজ শুরু করবে, তাও ভাবতে লাগল।
দুপুরে খাবারদাবার নিয়ে সাধারণ পোশাক পরা দু’জন সৈন্য ঘরে ঢুকল। চীনে মাটির থালায় গোল করে কাটা রুটি, মাংসের ঝোল তরিতরকারির, স্যুপ। ফ্রান্সিসরা খেতে লাগল। খেতে-খেতে ফ্রান্সিসের হঠাৎ মনে হলো—সৈন্যমূর্তিগুলো দেখতে কেমন, তা-তো জানা হয়নি। ভাবল, দুশো বছর আগেকার কথা। কাজেই নিজের চোখে দেখেছে এমন লোক পাওয়া অসম্ভব। তবু খেতে-খেতে দোনিয়াকে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা আপনি কি জানেন ঐ সৈন্যমূর্তিগুলো দেখতে কেমন ছিল?
