মারিয়া একটু হেসে বলল—এই জাহাজের জীবন শুধু দুঃখ-কষ্টেরই নয়। কত নাম জানা দেশের কতরকম মানুষের সংস্পর্শে এসে যে অভিজ্ঞতা লাভ তা যেমন আনন্দের। তেমনি রোমাঞ্চকরও। ফ্রান্সিস এইজীবন ভালোবাসে। তাই আমিও এই জীবন ভালোবাসি।
দোনিয়া খুশির হাসি হেসে মাথা নাড়ল। ফ্রান্সিস মারিয়া আর দোনিয়াকে নিয়ে নীচে নামবার সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে তখনই হ্যারি ছুটে এলো। বলল ফ্রান্সিস,আমাদের কি হয়েছিল মোটামুটি বন্ধুদের এ বলেছি। কিন্তু ওরা বারবারই জানতে চাইছে জাহাজ এখন দেশের দিকে চালানো হবে কিনা।
ফ্রান্সিস একটু ভেবে বলল, এই আনন্দের মুহূর্তে কিছু বলবো না। তুমি সবাইকে রাতে? খাওয়াদাওয়ার পর ডেক-এ আসতে বলল।
ফ্রান্সিস মারিয়া আর দোনিয়াকে নিয়ে কেবিনঘরের দিকে চলল। ওদিকে বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। প্রায় সবারই এক কথা আর নয়। এবার দেশের দিকে জাহাজ চালাতে হবে। আমরা অনেকদিন দেশছাড়া। শুধু বিস্কো, শাঙ্কো কোনো কথা বলল না। ওদের এক চিন্তা—ফ্রান্সিস এখন কি করবো? দেশে ফেরার জন্যে পাগল এই বন্ধুদের কি ফ্রান্সিস শান্ত করতে পারবে?
রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর ভাইকিং বন্ধুরা জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। পরস্পর ওরা মুদৃস্বরে কথাবার্তা বলছে, তখনই মারিয়া আর হ্যারিকে নিয়ে ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এলো। বন্ধুদের কথাবার্তা থেমে গেল। নিস্তব্ধ চারদিক। শুধু সমুদ্রের হাওয়ার শ-শ শব্দ। ঢেউ জাহাজের গায়ে ভেঙে পড়ার মৃদু ছলাৎ ছলাৎ শব্দ।
আজকে চাঁদের আলো অনেকটা উজ্জ্বল। আলো পড়েছে সমুদ্রে জাহাজে ভাইকিংদের মাথায় গায়ে। ফ্রান্সিস তাকিয়ে দেখল এসব। তারপর গলা চড়িয়ে বলল, ভাইসব—আমি ভালো করেই জানি মাতৃভূমির টান নাড়ির টান। তবু বলবো মাতৃভূমির নিশ্চিন্ত সুখী অলসের জীবন আমাকে কোনোদিন টানে নি। ঐ জীবনকে আমি বেঁচে থাকা বলে মানি না—ফ্রান্সিস থামল।
তারপর আস্তে-আস্তে সব ঘটনা বলল। সার্দিনিয়ার অতীত ইতিহাস, সোনিয়া, রাজা এনজিও, স্পিনোলা, সাত মূল্যবান সৈন্যমূর্তি আর সেসব উদ্ধারের সঙ্কল্প সবই বলল। তারপর বলল—কাজেই আমাদের এখানে অপেক্ষা করতেই হবে।
ফ্রান্সিস থামল। একজন ভাইকিং বন্ধু বলল ফ্রান্সিস। আমাদের এখানে কতদিন থাকতে হবে?
ফ্রান্সিস বলল—তা তো এখনই বলতে পারবো না। সব দেখেশুনে যদি মনে করি খাঁড়ির জলে তলিয়ে যাওয়া মূর্তিগুলো উদ্ধার করতে পারবে, তাহলেই আমরা এখানে থাকবো। আমাদের দিন পাঁচ-সাতেক সময় দাও। এর মধ্যে যদি বুঝি মূর্তি উদ্ধার করা অসম্ভব, তাহলে সেইদিনই জাহাজ দেশের দিকে চালাবো।
ফ্রান্সিস থামতেই ভাইকিংদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। মারিয়া ফ্রান্সিসকে মৃদুস্বরে বলল মূর্তি উদ্ধার হোক বা না হোক আমি তোমার সঙ্গেই থাকবো।
ফ্রান্সিস অল্প হেসে বলল, মারিয়া ঠিক এই কথাটাই আমি এতদিন তোমার কাছ। থেকে আশা করছি।
তখনও ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন চলছে। হঠাৎ হ্যারি গলা চড়িয়ে বলে উঠল –ভাইসব।
আস্তে আস্তে গুঞ্জন থামল। হ্যারি বলল-ফ্রান্সিসের সঙ্কল্পের কথা তোমরা শুনেছো। যদি এর পরেও তোমরা দেশে ফিরে যেতে চাও—যেতে পারো।
আমি ফ্রান্সিস আর মারিয়া এখুনি নৌকোয় চড়ে সাসারিতে চলে যাবো। বললো, তোমরা থাকবে কি চলে যাবে?
শাঙ্কো আর বিস্কো একসঙ্গে বলে উঠল—আমরা ফ্রান্সিসের সঙ্গে থাকবো। একটুক্ষণের নীরবতা। পরক্ষণই চিৎকার করে বন্ধু বলে উঠল—আমরা ফ্রান্সিসকে ফেলে যাবো না। এবার সবাই একসঙ্গে বলে উঠল—ও হো-হো-হো। মারিয়া বুঝতে পারল—ফ্রান্সিসকে ওর বন্ধুরা কত ভালোবাসে। ও হেসে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস ও ওর দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর বন্ধুদের সংকল্পের ধ্বনি স্তিমিত হলে ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল—আমরা কাল সকালে সাসারিতে যাবো। থাকবো ঐ নুরাঘিটায়। দিনের বেলা খাঁড়ির জলে খোঁজ করবো জলের তলায় ডুবে যাওয়া নৌকোটা আর মূর্তিগুলো। কয়েকদিন ধরে খাঁড়ির দু’ধারেও খোঁজ চালাবো। তার মধ্যে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কিছু পেতেও পারি, যার সাহায্যে নিখোঁজ মূর্তিগুলো উদ্ধার করতে পারবো। কাজেই কয়েকদিন না কাটলে আমি কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারবো না। দিন কয়েক পরে আমি জাহাজে এসে। জানাবো—মূর্তিগুলো উদ্ধার করা সম্ভব কিনা। যদি বুঝি সম্ভব নয়—আমরা দেশের দিকে জাহাজ চালাবো।
ফ্রান্সিস থামলো। বন্ধুরা আবার ধ্বনি তুললাম—ও-হো-হো-হো। সভা ভেঙে গেল। বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে অনেকেই নেমে গেল নিজের নিজের কেবিনঘরে যাওয়ার জন্যে। অন্য বন্ধুরা জাহজের ডেক-এ শুয়ে পড়ল, কেউ কেউ বসে রইল। ফ্রান্সিস আর মারিয়া নিজেদের কেবিনঘরে চলে এলো।
পরদিন সকালের খাবার খাচ্ছে ফ্রান্সিস কেবিনঘরে বসে। মারিয়ার খাওয়া হয়ে গেছে। হ্যারি ও খাওয়া সেরে। বলল “ফ্রান্সিস, তোমার সঙ্গে কে কে? ফ্রান্সিস খেতে খেতে বলল, মারিয়া তুমি আর বিস্কো।
হ্যারি বলল শাঙ্কো আমাকে বারবার বলল ওকে যেন তুমি সঙ্গে নিয়ে যাও।
হ্যারির কথা শেষ হতেই দোনিয়াকে নিয়ে শাঙ্কো ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিস বলল,—শাঙ্কো, তুমি তীর ছুঁড়তে ওস্তাদ। নিখুঁত তোমার নিশানা। কিন্তু আমরা তো লড়াই করতে যাচ্ছি না। কাজেই তোমার বদলে বিস্কোকে নিয়ে যাবো। জাহাজ পাহারার দায়িত্বে থাকবে তুমি।
