হ্যারি আসে। দুজনে পরামর্শ হয়।
একদিন গভীর রাত্রে ফজল এলো। তাকে বেশ উত্তেজিত মনে হল। ফ্রান্সিস বেশ অবাকই হল। কি ঘটলো এমন? ফজল কোন কথা না বলে কোমর বন্ধনী থেকে সাবধানে একটা ভাজ করা কাগজ বের করল। আস্তে-আস্তে ভাজ খুলে ফ্রান্সিসের সামনে পাতলো। পার্চমেন্ট কাগজের মত শক্ত পুরোনো কাগজ। হলদেটে হয়ে গেছে। বললো যে বাক্সটাতে মোহর দুটো ছিল, সেই বাক্সে এই কাগজটা পেলাম।
–কিছু লেখা আছে এটাতে?
–না। তবে আমার বেশ মনে আছে, মোহর দুটো এই কাগজটায় জড়ানো ছিল। একটু লক্ষ্য করে দেখো অনেকদিন জড়ানো ছিল বলে দুটো মোহরের দুপিঠের আবছা ছাপ পড়েছে কাগজটাতে।
ফ্রান্সিস এবার উৎসুক হল। হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সত্যিই তাই। কাগজটার দুপাশে দুটো অস্পষ্ট ছাপ। একটাতে মাথার ছাপের মত। অন্যটাতে কয়েকটা ত্রিকোণের আভাস। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি পাহারাদারকে ডাকলো। বললো–রসুইঘর থেকে একটু কাঠকয়লার গুঁড়ো নিয়ে এসো।
খুব সন্তর্পণে ফ্রান্সিস সেই কাগজটায় কাঠকয়লার গুঁড়ো ঘষলো। আস্তে আস্তে কালো ছাপগুলো স্পষ্ট হলো। একটাতে মাথা আঁকা। অন্যটাতে কয়েকটা ত্রিকোণ নকশা দেখা গেল। ফ্রান্সিস বললো–এটা উলটো ছাপ আলোয় ধরলে সোজা ছাপ পাবো।
ফ্রান্সিস কাগজটাকে আলোর সামনে ধরল। একটা অস্পষ্ট নকশা ফুটে উঠল।
ফজল একটু উসখুস করে ডাকলো ফ্রান্সিস?
–কি হলো?
–এটা যাওয়ার পথের নকশা।
–হ্যাঁ। কিন্তু কয়েকটা চিহ্নের মানে বুঝতে পারছি না। ভাবতে হবে।
–কিন্তু আমি তো এখন—
–হ্যাঁ তুমি জাহাজে ফিরে যাও। কাগজটা থাক আমার কাছে।
–বেশ–ফজল চলে গেল।
পরের দিন ফ্রান্সিস হ্যারিকে নকশাটা দেখালো। হ্যারি মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝে উঠতে পারলনা। গম্ভীর মুখে বলল–ভুতুরে নকশা।
ফ্রান্সিস হাসলো। বললো–এই দেখ, তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি–বলে ফ্রান্সিস ‘ক’ ‘খ’ করে প্রত্যেকটি চিহ্নের আলাদা নামকরণ করল। প্রত্যেকটি চিহ্নের অর্থ কি তাও বলল। ক = জাহাজ। খ ও গ = ডুবো পাহাড়। ঙ = সোনার ঘণ্টার দ্বীপ। য ও ঘ = পাথুরে দ্বীপ।
হ্যারি হতবাক হয়ে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে তারপর বলল–তুমি কি করে বুঝলে ত্রিকোণগুলো পাথুরে দ্বীপ?
–ঝড়ের সময় মাস্তুলে উঠে ঠিক যা-যা দেখেছিলাম–নকশাটাতে তাই আঁকা আছে।
–তাহলে এটাই যাওয়ার পথের নকশা?
–নিশ্চয়ই। কিন্তু গোলমাল বাধিয়েছে ‘ক’ থেকে ‘ঘ’ পর্যন্ত এই অস্পষ্ট রেখাটা। রেখাটা আবার ‘ঘ’ দ্বীপটার চারদিকেও রয়েছে।
–এ তো সোজা।
–সোজা?
–হ্যাঁ, জাহাজটা এই পথে যাবে।
–ধোৎ ধোৎ, এ তো শিশুও বুঝবে–কিন্তু, প্রশ্ন হলো–কি করে?
হ্যারি এবার ঠাট্টা করার লোভ সামলাতে পারল না। বললো–দাগটা মনে হয় সুতো।
–সুতো?
–হ্যাঁ–সুতো দিয়ে জাহাজটা টেনে নিয়ে যেতে বলছে।
ফ্রান্সিস এক মুহূর্ত হ্যারির দিকে তাকিয়ে রইলো। পরক্ষণেই ওর চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সে আচমকা এক রদ্দা কষালো হ্যারির ঘাড়ে। হ্যারি বিছানা থেকে প্রায় ছিটকে পড়ে আর কি। ফ্রান্সিসের সেদিকে নজর নেই। সে তখন বিছানায় উঠে দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করেছে। হ্যারি ঘাড়ে হাত বুলোত বুলোতে অবাক চোখে ফ্রান্সিসের নাচ দেখতে লাগল। নাচ থামিয়ে ফ্রান্সিস ডাকল–হ্যারি ঘাড়ে লেগেছে খুব?
-–নাঃ–এমন আর কি! কিন্তু তোমার এই হঠাৎ পুলকের কারণটা কি?
–সুতো।
–সুতো?
–তুমি যে বললে, সুতো দিয়ে জাহাজ টেনে নিয়ে যাওয়া।
–তুমি কি তাই করতে চাও নাকি?
–হ্যাঁ, তবে সুতো নয়, মোটা কাছি। দ্বীপটার চারদিকে গোল দাগ মানে কাছিটা দ্বীপের, পাথরের সঙ্গে বাঁধতে হবে।
ফ্রান্সিস হ্যারির পাশে এসে বসলো। শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো–আচ্ছা, হ্যারি, আমাদের জাহাজে কাঠের পাটাতন কত আছে।
–আর একটা জাহাজ তৈরি করার মতো নেই।
–কিন্তু একটা বেশ শক্ত নৌকো।
–হ্যাঁ, তা তৈরি করা যাবে।
–আর দড়িকাছি এসব?
–যথেষ্ট আছে।
–আজ থেকে তাহলে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের দলের লোকদের ডেকে বলে দাও–সবাইকে হাত লাগাতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা শক্ত নৌকো তৈরি করতে হবে, আর একটা শক্ত লম্বা কাছি।
–কতটা লম্বা?
–যতটা লম্বা হতে পারে?
–বেশ।
দিন-রাত কাজ চললো। নৌকো, জাহাজ তৈরি করতে ভাইকিংরা খুবই দক্ষ। প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জাম সবই জাহাজে মজুত থাকে। দিনকয়েকের মধ্যেই একটা নৌকো তৈরি হয়ে গেল। দড়িদড়া যা ছিল, পাক দিয়ে দিয়ে বেশ শক্ত কাছিও তৈরি হলো একটা। এবার কুয়াশা, ঝড় আর ডুবো পাহাড়ের প্রতীক্ষা। পরদিন সকাল থেকেই সূর্যের আলো কেমন ম্লান হয়ে গেল। সমুদ্রের বুকে এদিক-ওদিক কুয়াশায় জটলা দেখা গেল। হ্যারি ছুটে এলো ফ্রান্সিসের কাছে। বললো–ফ্রান্সিস, আমরা এসে গেছি।
–কুয়াশা? ফ্রান্সিস শুধু এই কথাটাই বললো।
–হ্যাঁ।
–দাঁড়াও, সেনাপতি কি করে দেখা যাক।
–কিন্তু ওর ওপর নির্ভর করতে গেলে আমাদের জাহাজ টুকরো-টুকরো হয়ে যাবে।
–সেনাপতিরও সেই ভয় আছে। দেখোই না, ও কি করে। সেনাপতি ছিল ফ্রান্সিসদের জাহাজে। সে শিঙা বাজাবার হুকুম দিলো। এই জাহাজে শিঙা বাজাতে সুলতানের জাহাজেও শিঙা বেজে উঠল। বাতাস পড়ে গেছে। দাঁড় টানতে হবে। পাল নামাতে হবে। সবাই যে যার জায়গায় চলে গেল।
