পাহারাদারের মুখ আর বাঁধা হল না। ছায়ামূর্তি আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়াল। পাহারাদারটা গোঙাতে লাগলো। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বললো—ঘুরে দাঁড়াও। ছায়ামূর্তি ঘুরে দাঁড়ালো। ফ্রান্সিসের চোখে তখন অন্ধকারটা সয়ে এসেছে। সে চোখ কুঁচকে ভালো করে দেখল। আরে? এ কি? এ যে ফজল। ফ্রান্সিস তরোয়াল ফেলে ফজলকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলো। পাহারাদারটা তখনও গোঙাচ্ছে। ফজল তাড়াতাড়ি তার মুখ থেকে কাপড়টা খুলে দিল। পাহারাদারটা ওদের দুজনকে দেখেই হেসে উঠলো। ফ্রান্সিস পাহারাদারকে বলল–যাও ভাই ঘুমিয়ে নাও গে!
ফ্রান্সিস আর ফজল কাঁধ ধরাধরি করে ঘরে এসে বিছানায় বসল। ফ্রান্সিস বলল–ফজল ভাই, তোমার ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারবো না।
–কি যে বলো তোমার কাছেও কি আমার ঋণ কিছু কম।
–অবাক কাণ্ড–তুমি এখানে এলে কি করে?
–তোমাকে চাবুক মারা, ফাঁসি দেওয়া, এসব দেখে রহমান আমাকে বেশ বিশ্বাসী লোকবলে ধরে নিয়েছিল। তারপর কিছু ঘুষও দিয়েছি। কাজেই সুলতানের সৈন্যদলে জায়গা পেতে খুব অসুবিধে হলো না।
–আমি এই জাহাজেই যাচ্ছি, তুমি বুঝলে কি করে? ফজল হাসলো। বললো–সোনার ঘন্টা আনতে জাহাজ যাচ্ছে, আর তুমি বেঁচে থাকতে সেই জাহাজে যাবে না, এ কি হয়। ভাল কথা তোমাকে যে দুটো মোহর দিয়েছিলাম, সেগুলো আছে?
ফ্রান্সিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোহর বিক্রির কথা, মকবুলের মোহর চুরির কথাও বলল।
–মকবুল? ফজল বেশ চমকে উঠল।
–হ্যাঁ, লোকটা নিজের নাম বলেছিল মকবুল।
–কেমন দেখতে বলো তো?
–মোটাসোটা। গোলগাল বেশ হাসিখুশী।
–হুঁ। ফজল দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
–তুমি মকবুলকে চেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞাসা করলো।
–ফজল ম্লান হেসে কপালের কাটা দাগটা আঙ্গুল দিয়ে দেখালো–মকবুলের তরোয়ালের কোপের দাগ।
ফজল বলতে লাগল, ভাই মকবুল আমার খুড়তুতো দাদা। বাবা আর খুড়ো মারা গেল। তারপর বিষয়সম্পত্তি নিয়ে লাগল গণ্ডগোল। বিষয়সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারর সময় পাওয়া গেল একটা পুরানো বাক্স। তাতে সেই মোহর দুটো। বংশপরম্পরায় ঐ বাক্সটা প্রাপ্য ছিল মকবুলেরই, কিন্তু সে ভীষণ লোভী। একটা ছোট মরূদ্যান আমার ভাগে পড়েছিল। ঐ মরুদ্যানটার ওপর ওর লোভ ছিল বরাবর। সে বলল–তুই বরং এই মোহরের বাক্স বদলে আমাকে ঐ মরুদ্যানটা দে। আমি রাজী হলুম, কি হবে ঐ মরুদ্যানটা নিয়ে। আমি তো আর ব্যবসা করবো না। তার চেয়ে বরং আমাদের বংশের একটা স্মৃতি মোহরের বাক্সটাই আমি রাখি। মকবুলের হাতে পড়লে বিক্রি করে দেবে। আমি রাজী হলাম। মোহরের বাক্সটা আমার কাছেই রইল।
–তারপর?
–মককুলন পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে ব্যবসার ধান্ধায় আমদাদ গেল, হায়াৎ গেল, আরো কত জায়গায় ঘুরে বেড়ালো। আফ্রিকাও নাকি গিয়েছিল। তারপর হঠাৎ একদিন বাড়ি এলো। মোহন্ত্রে বাক্সটা আমার কাছ থেকে ফেরৎ চাইলো। আমি দেব কেন? ওকে তো চিনি। নিশ্চয়ই মোহর দুটো বিক্রি করে দেবে। আমি স্পষ্ট বলে দিলাম এই বাক্স আমার, আমি দেব না।
–তারপর?
–সেই রাত্রেই মকবুল আমাকে খুন করতে এল। খুব ভাগ্যিস আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তবু তরোয়ালের কোপ এড়াতে পারিনি। কপালে সেই চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছি।
–মকবুল মোহর দুটোর জন্যে এত পাগল হয়ে উঠেছিল কেন?
–কারণটা আমি পরে জেনেছি। সোনার ঘন্টা যে দ্বীপে রয়েছে, সেই দ্বীপে যাবার এবং ফিরে আসার দুটো পথেরই নকশা আঁকা আছে সেই মোহর দুটোতে।
–তাহলে কথাটা সত্যি? ফ্রান্সিস চিন্তিত স্বরে বললো।
–কি সত্যি?
–জানো ফজল, আমিও ঠিক এই কথা শুনেছি।
–তাই নাকি?
–হ্যাঁ।
–যা হোক এই কথাটা জানবার পরই আমি বাড়ি ছাড়লাম। মোহর দুটো রুমালে বেঁধে সব সময় আমার কোমরে রাখতাম। ইচ্ছে ছিল, ঐ নকশাটা কারো কাছে থেকে বুঝে নেব, তারপর কিছু টাকা জমিয়ে জাহাজ কিনে একদিন সোনার ঘন্টা আনতে যাবো। কিন্তু–
–কেন যেতে পারলে না?
–আচ্ছা ফজল, তুমি আমাকে মোহর দুটো দিয়েছিলে কেন?
–মকবুলের হাত থেকে মোহর দুটো বাঁচাবার জন্যে।
ফ্রান্সিস দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বললো–আশ্চর্য! নিজের জীবন বিপন্ন করেও তুমি যে মোহর দুটো হাতছাড়া করো নি–আমি খিদের জ্বালায় সেটা বিক্রি করে দিলাম।
–তোমার দোষ নেই ভাই। আমারই বোঝা উচিত ছিল। তুমি বিদেশী কে তোমাকে চেনে? কে খেতে দেবে তোমাকে? আশ্রয়ই বা দেবে কে? যাকগে যা হবার হয়ে গেছে।
–তোমার কি মনে হয়? মকবুল সোনার ঘন্টার দ্বীপে যেতে পেরেছে?
–মনে হয় না। কারণ ও একটা মোহরই পেয়েছে। দুটো মোহর আছে জেনে নিশ্চয়ই অন্যটার খোঁজে আছে। জহুরী ব্যাটা সোনার লোভে অন্যটা বোধহয় এতদিনে গালিয়েই ফেলেছে।
গল্প করতে করতে দুজনের কারোরই খেয়াল নেই যে, রাত শেষ হয়ে এসেছে। ভোর হয় হয়। হ্যারি ফ্রান্সিসের খোঁজখবর নিতে এল। তখন দুজনের খেয়াল হল যে ভোর হয়েছে। ফজল তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। যে ঝোলানো দড়িটা বেয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠে এসেছিল সেটা বেয়েই নেমে গেল সমুদ্রের জলে। আবছা অন্ধকারের মধ্যে সাঁতরাতে সাঁতরাতে সুলতানের জাহাজের কাছে গেল। ওখানে একই দড়ি ঝুলিয়ে নেমে এসেছিল। সেই দড়িটা বেয়ে জাহাজে উঠে গেল। তারপর দড়িটা তুলে রেখে পা টিপে টিপে কেবিন ঘরের দিকে চলে গেল।
জাহাজ দুটো চলল। দিন যায়, রাত যায়। এদিকে ফ্রান্সিসের চোখে ঘুম নেই। এক চিন্তা কি করে ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে, ডুবো পাহাড়ের ধাক্কা এড়িয়ে সে সাদা মন্দিরের দ্বীপটায় জাহাজ নিয়ে যাবে।
