জাহাজ ললো। চারদিকের কুয়াশা ঘন হতে লাগল। একটু পইে পকেই প্রচণ্ড ঝড়ের ঝাপ্টায় ঢেউগুলি ফুলে উঠেজাহাজের গায়ে এসেবঁপিয়েপল। সেনাপতিঙ্কুম দিল–পঁড় বাইতে থাকে।
দাঁড়িরা প্রাণপণে দাঁড় বাইতে লাগল। জাহাজ একটু এগোয়, আবার ঝড়ের ধাক্কায় পিছিয়ে আসে। সেই ঝড়ের শব্দের মধ্যে সোনার ঘন্টা বেজে উঠল–ঢং-ঢং-ঢং। সবাই সেই শব্দ শুনলো। সুলতান নিজের জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়েই সেই শব্দ শুনলেন। তার চোখ দুটো ক্ষুধার্ত বাঘের মত জ্বলে উঠল। সোনার ঘন্টা–এত কাছে? সেই জল ঝড়ের মধ্যে সেনাপতি দেখলো–দুদিকে দুটো ডুবো পাহাড়। ঝড়ের ধাক্কাটা আসছে ডানদিক থেকে। ডানদিকের ডুবো পাহাড়ের জন্যে ভয় নেই। কারণ জাহাজ ওদিকে যাবে না। কিন্তু আর একটু এগোলে ঝড়ের ধাক্কায় জাহাজটা বাঁদিকের ডুবো পাহাড়ের গায়ে গিয়ে ছিটকে পড়বে। তারপরের কথা সেনাপতি আর ভাবতে পারলো না। সে আর এগোতে সাহস পেল না। জাহাজ ধীরেধীরে পিছিয়ে আসতে লাগল। দেখা গেল সুলতানের জাহাজটা এই জাহাজের দিকে এগিয়ে আসছে। এই জাহাজের গায়ে এসে লাগল ওটা। ক্রুদ্ধ সুলতান ভাইকিংদের
জাহাজে উঠে চীৎকার করে সেনাপতিকে ডাকলেন। সেনাপতি এগিয়ে এসে দাঁড়ালো।
–জাহাজ পিছিয়ে নিয়ে এলেন কেন?
–সামনেই ডুবো পাহাড়। পিছিয়ে না এলে এতক্ষণে দুটো জাহাজই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেত।
–আমি কোন কথা শুনতে চাই না। আমাকে সোনার ঘন্টার দ্বীপে নিয়ে যেতেই হবে। সুলতান গর্জে উঠলেন।
সেনাপতি চুপ করে রইলো। সুলতান কিছুক্ষণ সেনাপতির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন–কি? আপনি জাহাজ নিয়ে যেতে পারবেন না?
সেনাপতি মাথা নাড়ল–না।
সুলতান চারপাশে ভিড় করে দাঁড়ানো ভাইকিংদের দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বললেন–তোমাদের মধ্যে কেউ পারবে?
কেউ কোন কথা বলল না। সুলতান অসহিষ্ণু স্বরে মন্তব্য করলেন ভাইকিংরা নাকি খুব সাহসী। জাহাজ চালাতে ওস্তাদ?
হ্যারি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বললো–কথাটা মিথ্যে নয়, সুলতান।
সুলতান কম করে হ্যারির দিকে তাকিয়ে বললেন–বেশ, তার প্রমাণ দাও।
–ডুবো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে জাহাজ নিয়ে যাওয়া অসম্ভব।
–তাহলে তোমরা কেউই পারবে না?
–একজন হয় তো পারে।
–কে সে?
–ফ্রান্সিস?
সুলতান অবাক চোখে হ্যারির দিকে তাকালেন। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন তুমি কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছো?
–আজ্ঞে না। ফ্রান্সিস বেঁচে আছে, আর এই জাহাজেই আছে।
সুলতান ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে রহমানের দিকে তাকালেন।
রহমান তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করলো–কিন্তু ফ্রান্সিস বাঁচলো কী করে?
–আপনারা কি সেই ইতিহাসই শুনবেন এখন, না দ্বীপে যাবার চেষ্টা করবেন।
সুলতান এতক্ষণে যেন একটু শান্ত হলেন। ধীর স্বরে বললেন–যদি ফ্রান্সিস দুটো জাহাজই নিরাপদে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে ওকে মুক্তি দেবো।
–বেশ। তাহলে ফ্রান্সিসকে ডাকি?
–হ্যাঁ।
ফ্রান্সিস সিঁড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে সবই শুনছিল। এবার আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে সুলতানের সামনে দাঁড়াল। ভাইকিংরা ফ্রান্সিসকে দেখে অবাক। পরক্ষণেই সবাই আনন্দে চীৎকার করে, উঠল। সুলতান ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন তুমি বোধহয় সবই শুনেছ।
–হ্যাঁ, কিন্তু আমি একা মুক্তি চাই না, আমাদের সবাইকে মুক্তি দিতে হবে।
সুলতান মাথা নীচু করে একটু ভাবলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন–বেশ। তাই হবে।
সুলতান আর কোন কথা না বলে নিজের জাহাজে ফিরে গেলেন।
ফ্রান্সিস এবার ভাইকিং বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল–ভাইসব, আমি জানি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করো। আমি জীবন দিয়েও তোমাদের সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখব।
সবাই হর্ষধ্বনি করে উঠল। ফ্রান্সিস বললো–অনেক দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে আজকে আমরা
সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি। জীবনের কোন সুলতান ফ্রান্সিসের মখের দিকে তাকিয়ে দুঃখ-কষ্টই বৃথা যায় না। আমরা সফল হবোই। বললেন, তুমি বোধহয় সবই শুনেছ। সোনার ঘন্টার সেই দ্বীপ আমাদের নাগালের মধ্যে। শুধু একটা বাধা ডুবো পাহাড়। সেই বাধা অতিক্রমের উপায় আমরা জানতে পেরেছি। এখন সবকিছু নির্ভর করছে আমাদের শক্তি সাহস আর বুদ্ধির ওপরে। তোমরা আমাকে সাহায্য করো।
সবাই চীৎকার করে ফ্রান্সিসকে উৎসাহিত করলো।
ফ্রান্সিস বলতে লাগল এবার আমাদের কি কাজ তাই বলছি। কয়েকজন চলে যাও জাহাজের পেছনে। সুলতানের জাহাজটা আমাদের জাহাজের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধতে হবে। আর একদল চলে যাবে দাঁড় টানতে। বাকি সবাই থাকবে ডেকের ওপর।
ফ্রান্সিস একটু থেমে আবার বলতে লাগল–ঝড় শুরু হলেই আমি আর হ্যারি যে নৌকোটা আমরা তৈরি করেছি, সেটাতে চড়ে এগিয়ে যাবো। আমাদের সঙ্গে থাকবে একটা লম্বা কাছি। দুটো ডুবো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে একটু এগোতে পারলেই শান্ত সমুদ্র পাব। তার ডানপাশেই ন্যাড়া পাহাড়ের দ্বীপ। সেখানে পাহাড়ের মাথায় আমরা কাছির একটা প্রান্ত বাঁধবো। কাছিটার আর একটা প্রান্ত থাকবে ডেকে যারা দাঁড়িয়ে থাকবে, তাদের হাতে। আমি কাছিটার তিনবার ঝাঁকুনি দিলেই তারা কাছি টানতে শুরু করবে। দাঁড়িরা দাঁড় বাইতে শুরু করবে। দাঁড়িরা দাঁড় বাইতে শুরু করবে। দুটো জাহাজই বিনা বাধায় ডুবো পাহাড় পেরিয়ে যেতে পারবে। আমরা সফল হবোই।
