—রাজকুমারী মারিয়া, বন্ধুরা রাজি হয় কিনা দেখো—হ্যারি বলল।
—হুঁ। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। তারপর দোনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল—দোনিয়া আপনিও আমাদের জাহাজে আসুন। আজ রাতটা জাহাজে থাকবো আমরা। কাল সকাল থেকে কাজে নামবো।
—বেশ চলুন—দোনিয়া রাজি হলো।
তিনজনে নুরাঘি থেকে বেরিয়ে এলো। সামনের পাথরের ঘাটে দেখল একটা সুন্দর নৌকো বাঁধা। দেখেই ফ্রান্সিস বুঝল—এটা কাল রাতের সেই রাজার নৌকো। রাতের অন্ধকারে ভালো করে দেখা যায় নি। এখন দেখল নৌকার দু’পাশে ছ’ইঞ্চি লোহা দিয়ে বাঁধানো। দু’কোণায় দুটো শক্ত দাঁড়। নৌকোর গলুইয়ের ওপর দামি কাঠের আচ্ছাদন। ওপরে ঘাসের গদি পাতা। শৌখিন নৌকো, তবে বেশ।
একজন সৈন্য এগিয়ে এলো। দোনিয়াকে বলল—মহামান্য রাজা এই নৌকোটা আপনাদের ব্যবহারের জন্যে দিয়েছেন।
ফ্রান্সিস নিজেদের নৌকোটা খুঁজল। দেখল একটু দূরে ওদের নৌকোটা আর দোনিয়ার নৌকোটা পরস্পরের সঙ্গে বাঁধা। ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি, আমাদের নৌকোটা তুমি নিয়ে এসো। আমাদের অনেক সুখদুঃখের সঙ্গী এই নৌকোটা। নতুন নৌকো পেয়ে এটাকে তো ভুলে যেতে পারি না।
সবাই ঘাটে নামল। ফ্রান্সিস রাজার নৌকোটায় উঠল। হ্যারি ওদের নৌকোন। দোনিয়া তার নৌকোয়। দোনিয়ার নৌকোয় রয়েছে তার সেই বড় বড় বঁড়শিবাঁধা লম্বা দড়িটা।
ওরা নৌকো বেয়ে চলল খাঁড়ির মুখের দিকে। একটু পরই ওর রাজার জাহাজের পাশ দিয়ে এসে সমুদ্রে পড়ল। নৌকোগুলো চালাল ওদের জাহাজ লক্ষ্য করে।
সূর্য অস্ত যাচ্ছে তখন। পশ্চিম আকাশ লালে লাল। মধ্য আকাশে অস্তগামী সূর্যের আলো পড়েছে হালকা মেঘগুলোয়। মনে হচ্ছে যেন পাহাড়, বন, নদীর ছবি। নৌকো বাইতে বাইতে আকাশে এই রঙের খেলা দেখছিল ফ্রান্সিস হঠাই ওর মনটা ভারী হয়ে উঠল। দেশের কথা বাড়ির কথা মনে পড়ল। বাড়িতে থাকলে এসময় ও বাগানের শ্বেতপাথরের আসনটায় এসে বসে। মনে পড়ল কতদিন মা’র সঙ্গে ঐ আসনে বসে আকাশে তারা ফুটে উঠতে দেখেছে। অবশ্য শীতের দেশ ওদের সবসময় আকাশে তারা দেখা যায় না। তাই যেদিন আকাশ পরিষ্কার থাকে তারা দেখা যায়, সেদিন ফ্রান্সিসের খুব আনন্দ হতো। মা হেসে বলতো—দ্যা—আজ আমি তোর পাশে আছি—তাই তারা দেখতে পেলি। জানিস্ এই পৃথিবীতে যারা মানুষের উপকার করে,সব মানুষকেই ভালোবাসে, কাউকে দুঃখ দেয় না, কারো ক্ষতি করে না, তারা মৃত্যুর পর আকাশের এক-একটি তারা হয়ে যায়।
ফ্রান্সিস আকাশের দিকে আবার তাকাল। অন্ধকার হয়ে আসছে আকাশ। তারা ফুটতে শুরু করল। ফ্রান্সিসের দাঁড় বাওয়া হাত থেমে গেল। হারি, দোনিয়া নৌকো অনেকটা এগিয়ে গেছে তখন। ফ্রান্সিসের কি হলো। নৌকোয় উঠে দাঁড়াল—আকাশের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলো –মা—কোন তারাটা তুমি? মা-।
সমুদ্রের বাতাসের শব্দ ঢেউয়ের শব্দের মধ্যেও হ্যারি ফ্রান্সিসের গলার শব্দ চিনল। সঙ্গে-সঙ্গে নৌকোয় উঠে পেছন ফিরে চিৎকার করে ডাকল—ফ্রান্সিস
তখন ফ্রান্সিস ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়েছে। দু’হাতে মুখ ঢেকেছে। হ্যারি ভীষণ চিন্তায় পড়ল। কি হলো ফ্রান্সিসের ও নৌকো ঘোরাল। ফ্রান্সিসের নৌকোর কাছে এসে দেখল, ফ্রান্সিস দু’হাতে মুখ ঢেকে নৌকোয় বসে আছে। হ্যারি তাড়াতাড়ি ফ্রান্সিসের নৌকোয় উঠতে গেল। কিন্তু হ্যারি শরীরের দিক থেকে বরাবরই দুর্বল। ও প্রায় সমুদ্রের জলে পড়ে যাচ্ছিল। ফ্রান্সিসের নজরে পড়ল সেটা। ও দ্রুত উঠে হ্যারিকে জড়িয়ে ধরল। হ্যারি বলল,ফ্রান্সিস, তুমি কাঁদছিলে?
—হ্যারি মা’র কথা মনে পড়ল হঠাৎ।
ফ্রান্সিস আস্তে বলল। হারি জোরে ফ্রান্সিসকে বুকে চেপে ধরল। ওর চোখেও তখন জল।
দোনিয়াও নৌকো চালিয়ে ফিরে এলো। অল্প আলোয় দুই বন্ধুকে কাঁদতে দেখল। দোনিয়া কিছুই বুঝে উঠতে পারলোনা। ফ্রান্সিস বলল হ্যারিকে—তুমি আমার নৌকোতেই থাকো। আমাদের নৌকোটা পেছনে বেঁধে নিচ্ছি।
আবার তিনটে নৌকো চলল ফ্রান্সিসদের জাহাজের দিকে। দোনিয়া ফ্রান্সিসকে বলল সত্যি—আপনাদের বন্ধুত্বের গভীরতা অনুভব করে আমি আশ্চর্য হলাম। ফ্রান্সিস ও হ্যারি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসল শুধু। জাহাজের কাছাকাছি আসতে দেখল মারিয়া ভাইকিং বন্ধুরা জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে ফ্রান্সিসদের আসতে দেখে বন্ধুরা চিৎকার করে উঠল –ও—হো হো হো। মারিয়া হাসতে হাসতে হাতের রুমাল তুলে নাড়তে লাগল।
মারিয়া সকাল থেকেই জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিল দুপুরে একবার খেতে গেছে শুধু। বিস্কোরা বারবার এসে বলেছে রাজকুমারী এভাবে রোদে দাঁড়াবেন থাকবেন না। ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করুন।
মারিয়া কোনো কথাই শোনেনি। অনড় দাঁড়িয়ে থেকেছে রেলিং ধরে।
ফ্রান্সিসরা জাহাজের ডেক-এ আসতেই বন্ধুরা ওদের দুজনকে জড়িয়ে ধরল। মারিয়া হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস দোনিয়াকে দেখিয়ে বলল, মারিয়া, ইনি দোনিয়া। এই সার্দিনিয়ার এক অভিজাত পরিবারের সন্তান। দোনিয়ার মতো এমন উদার হৃদয়ের মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি—এবার দোনিয়াকে বলল,ইনি মারিয়া। আমাদের দেশের রাজকুমারী। আমার স্ত্রী
দোনিয়া হেসে মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানাল। বলল—রাজকুমারী। আপনাকে দেখেই বুঝতে পারছি আপনি অনেকদিন জাহাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমি আমার অভিজ্ঞতায় এমন কোনো রাজকুমারী দেখি নি যিনি রাজপ্রাসাদের বিলাসবহুল্যের সুখের নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে এভাবে জাহাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
