—বেশ, হুকুম জারি করা হবে—রাজা বলল। তারপর একটু ভেবে বলল—আমি তো এখানে আর বেশিদিন থাকতে পারবো না। আমাকে রাজধানীতে ফিরে যেতে হবে। তাই বলছিলাম-মূর্তিগুলো খুঁজে উদ্ধার করতে কতদিন লাগবে?
—আমি দিন সাতেক সব দেখেশুনে মোটামুটি কতদিন লাগবে, তা আপনাকে বলতে পারবো–ফ্রান্সিস বলল।
—বেশ। তোমরা এবার যেতে পারো—রাজা বলল।
ফ্রান্সিসরা মাথা একটু নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানিয়ে রাজপ্রাসাদের বাইরে এলো। দেখল, রাজপ্রাসাদের সামনে মোটামুটি সমতল উপত্যকাটা ঘাসে ঢাকা। সেখানে উষ্ণীষ বর্ম পরে কোমরে তলোয়ার খুঁজে প্রায় পঁচিশ-তিরিশজন সৈন্য কুচকাওয়াজ করছে। ফ্রান্সিস বুঝল, গ্রীক সৈন্যদের শিক্ষাদীক্ষা-রণকৌশল এখনকার সব রাজারাই গ্রহণ করেছে। ও ভাবল দেশে ফিরে গিয়ে ওদের রাজাকে এইভাবেই সৈন্যদের যুদ্ধবিদ্যায় শিক্ষিত করে তুলতে বলবে।
সেনাপতি সৈন্যদের কুচকাওয়াজ দেখছিল। ফ্রান্সিস দোনিয়াদের দেখে এগিয়ে এসে। বলল-দোনিয়া, আপনাদের জন্যে এই নুরাঘিতেই একটা ঘর নির্দিষ্ট করেছি। আপনারা ওখানেই থাকবেন।
নুরাঘির সদর দরজার কাছে এলো সবাই। ফ্রান্সিস বলল—দোনিয়া, আপনি আপনার সঙ্গীদের নিজেদের ঘরে ফিরে যেতে বলুন। এখন থেকে আমরাই সঙ্গী। দোনিয়া তার সঙ্গ ীদের বলল ভাই, তোমরা আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছ। এবার তোমরা ঘরে যাও। এই বিদেশি বন্ধুরা এখন থেকে আমাকে সাহায্য করবে। দেখি, মূর্তিগুলো উদ্ধার করতে পারি কিনা-বলে দোনিয়া ডান হাতটা বাড়াল। সঙ্গী দু’জন তার হাতটা ধরে একটু মাথা নামিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে গেল।
সবাই নুরাঘিতে ঢুকল। সেনাপতির নির্দেশে একজন সৈন্য ওদরে নিয়ে চলল। পাথরের সিঁড়ি দিয়ে সবাই ওপরে উঠল। বাঁদিকে একটা ছোট ঘর। সৈন্যটি ঘরটা দেখিয়ে বলল—আপনারা এই ঘরে থাকবেন বলে সৈন্যটি চলে গেল।
ঘরে ঢুকল সবাই। মেঝেয় কয়েকটা কাঠের তক্তার ওপর দড়ি পেঁচিয়ে বাঁধা বিছানা মতো। ওপরে মোটা কাপড় পাতা। ফ্রান্সিস বাঁদিকের গরাদ-আঁটা প্রায় চৌকোনো ছোট জানালাটা দিয়ে তাকাল। অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। খাঁড়ি, সমুদ্র খাঁড়ির মুখে রাজার জাহাজ।
ওদের জাহাজটা অবশ্য দেখা যাচ্ছেনা। সমুদ্রের জোর হাওয়া ঢুকছে ঘরটায়।
ফ্রান্সিস ফিরে দাঁড়াল। ততক্ষণে বিছানায় দোনিয়া আর হ্যারি বসে পড়েছে। ফ্রান্সিস ও এসে বসল। তারপর শুয়ে পড়ল। মাথার পেছনে দু’হাত রেখে পাথরের ছাদ দেখতে লাগল। ঘরটা ছোট কিন্তু তিনজনের পক্ষে খুব ছোট নয়। ফ্রান্সিস সমুদ্রের দিকে জানালাটার দিকে তাকাল। তখনই নজরে পড়ল—জানালাটার পাশে পাথুরে দেয়ালে বেশ অস্পষ্ট কি যেন লেখা। সব বিষয়েই ফ্রান্সিসের খুব কৌতূহল। ও তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। জানালার ধারে গেল। পাথুরে দেয়ালের অস্পষ্ট লেখাগুলো দেখতে দেখতে বলল—দোনিয়া, এখানে কি কিছু লেখা আছে?
দোনিয়া হেসে বলল—সংগীত, সুর, এসব সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকলে বুঝতেন ওগুলো স্বরলিপি।
—গানের? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
—না, সুরের। একটু চুপ করে থেকে দোনিয়া বলল—এখানকার রাজপ্রাসাদের মাটির নীচের ঘরে ভেড়ার চামড়ার প্রাচীন ল্যাতিন ভাষায় লেখা কিছু ভেঁড়াখোরা গ্রন্থ পেয়েছিলাম। সেসব খুব সম্ভব এই প্রাসাদযিনি নির্মাণ করিয়েছিলেন সেই রাজা ফ্রেডারিক যত্ন করে সংরক্ষণ করেছিলেন। রাজা ফ্রেডারিক সংগীতবোদ্ধ ছিলেন। সুর-সঙ্গীত ভালোবাসতেন। নিজেও গ্রীক দেশীয় বীণা বাজাতে পারতেন। সেই ছিন্ন গ্রন্থগুলি থেকে সার্দিনিয়ার প্রাচীন ইতিহাসের অনেক তথ্য পেয়েছিলাম।
দোনিয়া থামল। ফ্রান্সিস বলল কিন্তু এই দেয়াল লেখা স্বরলিপিগুলি কার লেখা?
দানিয়া বলল—বলছি, রাজা ফ্রেডারিক এই সাসারিতে খুব প্রাচীন একটা ব্রোঞ্জের সৈন্যমূর্তি পেয়েছিলেন। অনেক ভেবে ঐ রকম সাতটি সুর বাজে এরকম সাতটি সৈন্যমূর্তি তৈরি করিয়েছিলেন পিসার এক কর্মকারকে দিয়ে। তাই ওটা ছিল বড়ো আর নিখাদ সোনার মূর্তি। পঞ্চম সুরধ্বনিটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
—তাহলে ঐ সৈন্যমূর্তিগুলোই আমরা খুঁজে বের করবো? হ্যারি জানতে চাইল।
—হ্যাঁ। দোনিয়া বলল—সাতটি সুর বেজে ওঠে এরকম সেই মূর্তিগুলো ওপরের গির্জায় রাখলেন। সেগুলো বাজাবার জন্যে জেনোয়া থেকে এক বাদ্যকরকে এনেছিলেন। বাদ্যকর প্রথম প্রথম নাকি ভালো বাজাতে পারতেন না। আস্তে আস্তে সেই বাদ্যকর অপূর্ব সুরমূৰ্ছনা সৃষ্টি করতে শিখলেন—দোনিয়া থামল। তারপর বলল—দেয়ালে লেখা ঐ স্বরলিপি সেই বাদ্যকরের।
—বলেন কি? এ তো অনেকদিন আগের কথা—ফ্রান্সিস বলল।
—হ্যাঁ, আরো শুনলে আশ্চর্য হবেন। সেই বাদ্যকর ছিলেন অন্ধ—দোনিয়া বলল। ফ্রান্সিস, হ্যারি দু’জনেই চমকে দু’জনের মুখের দিকে তাকাল। দু’জনেই নির্বাক তাকিয়ে রইলো দেয়ালের গায়ে লেখা বেশ অস্পষ্ট স্বরলিপিগুলোর দিকে।
—সেই বাদ্যকর এই ঘরেই থাকতেন, সোনিয়া বলল।
ফ্রান্সিস হ্যারির চোখে মুখে তখনও বিস্ময়ের ঘোর।
.
বিকেল হয়ে এলো। ওরা তিনজনেই বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম করছিল। হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস এখন কি করবে?
—আমাদের জাহাজে যাবো। বন্ধুদের তো বোঝাতে হবে সৈন্যমূর্তির কথা, সেগুলো উদ্ধারের কথা। তার জন্যে এখানে তো থাকতে হবে—ফ্রান্সিস বলল।
