হ্যারি ডান হাতটা তুলে রাজার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। রাজা বলল—হ্যাঁ। শুনলাম তোমরা বিদেশি। তোমরা কোন দেশের লোক এবং এখানে এসেছো কেন?
—আমরা জাতিতে ভাইকিং-হ্যারি বলল।
রাজা স্পিনোলাকে বলল—স্পিনোলা, ভাইকিংদের কথা আপনি জানেন?
—হ্যাঁ, মহামান্য রাজা। এরা খুব দুঃসাহসী। জাহাজ চালনায় কোনো জাতিই এদের সমকক্ষ নয়। তবে এদের দুর্নামও আছে জাহাজ লুণ্ঠনকারী বলে-স্পিনোলা বলল।
হ্যারি বলল মহামান্য রাজা—শৌর্যেবীর্যে আমাদের সঙ্গে যারা পেরে ওঠেনি তারাই আমাদের দুর্নাম দেয় একটু থেমে হ্যারি বলল—আমরা বীরের জাতি। বীরত্বকে মানবিকতাকে বিশ্ববাসীর ভ্রাতৃত্ববোধকে শ্রদ্ধা করি—হ্যারি ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে বলল—এর নাম ফ্রান্সিস, আমার বাল্যবন্ধু। ফ্রান্সিস অনেক রহস্যের সমাধান করেছে। শুধু সাহসে ভর করে অনেক মহামূল্যবান গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধার করেছে। ফ্রান্সিস আপনাকে কিছু বলতে চায় স্পেনীয় ভাষায়। আপনিও ঔ ভাষায় আপনার বক্তব্য বলুন।
—বেশ, রাজা তারপর ফ্রান্সিসকে বলল—তোমরা এখানে এসেছ কেন? ফ্রান্সিস বলল—মহামান্য রাজা—আমরা দূর দূরে দেশে ঘুরে বেড়াই। কোনো গুপ্ত ধনভাণ্ডার বা নিখোঁজ মূল্যবান কিছুর সংবাদ পেলে আমরা তা উদ্ধার করি—ফ্রান্সিস বলল।
স্পিনোলা হেসে বলল—তারপর সেসব লুকিয়ে চুরিয়ে দেশে পাচার করো।
—খুবই দুঃখ পেলাম মাননীয় স্পিনোলা। সৎ, নির্লোভ মানুষও যে পৃথিবীতে আছে, এটা বোধহয় আপনি বিশ্বাস করেন না, ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল।
স্পিনোলা হো হো করে হেসে উঠলেন। শূন্যে ডানাহাতটা ঘুরিয়ে ফ্রান্সিসের কথাটা উড়িয়ে দিলেন। ফ্রান্সিস বলল—যাকগে, আমার একটা নিবেদন আছে।
-বলো—রাজা বলল।
—মহামান্য রাজা—ফ্রান্সিস বলতে লাগল—দোনিয়ার সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে সাত সোনার যোদ্ধামূর্তির কথা শুনেছি। পরে আরো কিছু জানতে হবে। দোনিয়া দীর্ঘ ছ’মাস আপ্রাণ চেষ্টা করেও সেই মূর্তিগুলো জলের তলা থেকে উদ্ধার করতে পারেন নি। আমার মনে হয়—প্রায় দুশো বছর আগে ডুবে যাওয়া ঔ মূর্তিগুলি শুধুমাত্র কয়েকটা স, বঁড়শি ডুবিয়ে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অন্য কোনো সূত্র চাই।
—কোন্ সূত্র? স্পিনোলা বললেন।
—সেটা আমি এখুনি বলতে পারছি না। তার জন্যে আমার সময় প্রয়োজন।
রাজা বলল—তুমি কি সেই চেষ্টা করতে চাও নাকি?
—তাহলে তো ভালোই হয়-স্পিনোলা বললেন।
—মহামান্য রাজা আপনি অনুমতি না দিলে তা হবে না, ফ্রান্সিস বলল।
—ধরো আমি অনুমতি দিলাম-রাজা বলল।
—তাহলে আমি আমার স্ত্রী ও কয়েকজন বীর বন্ধুকে নিয়ে সেই মূর্তিগুলোর সন্ধান চালাবো।
—মূর্তিগুলোর মোট মূল্য কত জানো? স্পিনোলা বলল।
—আমি সেসব জানা নিষ্প্রয়োজন মনে করি। কারণ মূর্তিগুলো উদ্ধার করতে পারলে আমি সব মহামান্য রাজাকেই দেব। কারণ সেসব এই দেশের রাজার সম্পত্তি।
—তোমরা তো পারিশ্রমিক চাইবে-স্পিনোলা বললেন।
—একটি স্বর্ণমুদ্রাও চাইবো না—ফ্রান্সিস দৃঢ়স্বরে বলল।
স্পিনোলা বেশ অবাক হয়ে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কত কষ্ট করে এত মূল্যবান মূর্তিগুলি উদ্ধার করবে অথচ একটা স্বর্ণমুদ্রাও নেবে না, এরকম বোকা লোক আছে না কি? ফ্রান্সিস বলল—তবে দোনিয়া তো আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তিনি আপনাদেরই দেশবাসী। তিনি নিশ্চই কিছু পারিশ্রমিক চাইতে পারেন।
—দোনিয়া সোনার মূর্তিগুলির সমমূল্যের অর্থ চেয়েছিলেন। আমি দেবনা-রাজা বলল।
ফ্রান্সিস বলল ঠিক আছে। দোনিয়ার হয়ে আমি বলছি—আমরা তো কিছু নেব না শুধু দোনিয়াকে আপনার সমমূল্যের চারভাগের এক ভাগ অর্থ দেবেন, দোনিয়া তাতেই সম্মত হবেন।
স্পিনোলা নিজের আসন থেকে উঠে রাজার কাছে গেলেন। দু’জনের চাপা গলায় কি কথাবার্তা হলো। স্পিনোলা নিজের আসনে ফিরে এলেন। রাজা বলল—ঠিক আছে। আমিও এই প্রস্তাবে সম্মত
স্পিনোলা বললেন—দোনিয়া, আপনি পরে বেঁকে বসবেন না তো?
ফ্রান্সিস একটু হেসে বলল—মান্যবর স্পিনোল, আমরা কিন্তু এখনও অন্ধকারে। মূর্তিগুলো জলের তলায় কোথায় আছে আমরা এখনো তার বিন্দুবিসর্গও জানি না। উদ্ধার করা তো অনেক পরের কথা।
রাজা ও স্পিনোলা ফ্রান্সিসের কথা শুনে বেশ বিব্রত হলো। স্পিনোলা একটু কেশে নিয়ে বলল, ঠিক আছে। মহামান্য রাজা এই প্রস্তাবে তার সম্মতির কথা তো আগেই জানিয়েছেন। এখন কথা হলো আপনারা কীভাবে সন্ধান চালাবেন।
—সে সব আমরা ভেবে স্থির করবো—ফ্রান্সিস বলতে লাগলো—শুধু মহামান্য রাজাকে অনুরোধ, আপনি আমাদের একটা বেশ শক্তপোক্ত নৌকা দেবেন। আমার স্ত্রী আমাদের জাহাজেই থাকবেন। শুধু সন্ধান চালাবার সময়ে আমাদের সঙ্গে থাকবেন। দোনিয়া সবসময় আমাদের সঙ্গে থাকবেন। আমরা এই নুরাঘিতেই থাকবো। আর সারাদিন যতক্ষণ সম্ভব খোঁজখুঁজি করব। তবে রাতে নয়, দোনিয়া রাতের অন্ধকারে গোপনে—সন্ধানের কাজ চালিয়েছিলেন। সেইজন্যই ব্যর্থ হয়েছেন।
-–তুমি কি মনে করো তুমি পারবে? স্পিনোলা বললেন।
—আমি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। তবে এখন না সব জেনে দেখে শুনে তবেই আমি বলতে পারবো, এটা সম্ভব কিনা—ফ্রান্সিস বলল।
—ঠিক আছে। দেখা যাক-স্পিনোলা মাথা ওঠানামা করে বলল।
ফ্রান্সিস এবার রাজাকে বলল—মহামান্য রাজা। আর একটি অনুরোধ—আপনি হুকুম জারি করে দিন আমাদের স্বাধীন চলাফেরায় কেউ যেন বাধা না দেয়।
