—কিন্তু মারিয়া আর বন্ধুরা কি আর এই সার্দিনিয়ায় অপেক্ষা করতে চাইবে?
—দেখা যাক-ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি আর কিছু বলল না। ওদের খাওয়া শেষ হল। তখনই একজন বেশ মোটা দাড়িগোঁফওলা একজন সশস্ত্র লোক ঘরে ঢুকল। তার পেছনে কয়েকজন সশস্ত্র সৈন্য। দোনিয়া গলা নামিয়ে আস্তে বলল—ইনিই সেনাপতি।
সেনাপতি বেশ গম্ভীর ভঙ্গীতে বলল—দোনিয়া—আপনারা আর ঐ বিদেশীরা চলুন। রাজা এনজিও আপনাদের প্রাসাদে নিয়ে যেতে বলেছেন।
—আমদের কি বন্দী করা হবে? দোনিয়া বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল।
—এখনো তো আপনাদের হাত-পা বাঁধা হয়নি। রাজা এনজিও পরে যা হুকুম দেবেন তাই হবে-সেনাপতি বলল।
নুরাঘি থেকে বেরিয়ে ফ্রান্সিসরা পাথর বাঁধানো পথ দিয়ে চলল। সামনে পেছনে খোলা তলোয়ার হাতে কয়েকজন সৈন্য। সবার সামনে সেনাপতি। সেনাপতির শিরস্ত্রাণ আর বুক বাঁধা বর্ম পেতলের। সৈন্যদের মতো লোহার নয়।
পথের দুপাশে পাথরের বাড়িঘর। এখানে লোকের বসতি আছে। বাড়ির জানালা, দরজা দোকান থেকে লোকজন ফ্রান্সিসদের চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। ওরা দোনিয়াকে চেনে ওটা ওদের মুখে দেখেই বোঝা গেল। ফ্রান্সিসদের চেহারা পোশাক দেখে ওরা একটু আশ্চর্য হলো। এই বিদেশীদের রাজার কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কেন এটা ওরা বুঝে উঠতে পারল না।
পাথুরে পথ ধরে কিছুটা যেতেই একটা ঘাসে ঢাকা উপত্যকামতো। সেখানেই ছাই ছাই রঙের পাথরে তৈরি একটা লম্বাটে বাড়ি দেখা গেল। বেশ বড় বাড়ি। বোঝা গেল এটাই এখানকার রাজপ্রাসাদ। রাজা এনজিও এখন এখানেই আছেন।
প্রাসাদের বেশ বড় সদর দরজাটা খোলা। দরজাটা ওক কাঠের। কাঠের দরজায় কুঁদে কুঁদে পাতা ফুল লতার পাখির নকশা তোলা। দরজার দু’ধারে খোলা তলোয়ার হাতে প্রহরীরা। সকলেই মাথা একটু নুইয়ে সেনাপতিকে সম্মান জানাল।
সদর দরজাটা পার হতে একটা পাথর বাঁধানো চত্বর। তারপর একটা পাথরের তৈরি ঘর। ঘরে ঢোকার দরজার পাশে দ্বাররক্ষী দু’জন। ওদের হাতে চকচকে পেতলের বর্শা। এ দ্বাররক্ষী দু’জনও সেনাপতিকে মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানাল।
চত্বর পার হচ্ছে যখন তখনই ফ্রান্সিস দোনিয়াকে জিজ্ঞেস করল-–রাজা এনজিও কি এখানেই বরাবর থাকেন?
—না। রাজধানী কাগলিয়ারিতে বিরাট প্রাসাদে থাকে। নিখোঁজ মূর্তি সন্ধানের খবর পেয়ে তিনেক হলো এখানে এসেছে। উদ্দেশ্য আমাকে বন্দী করা। সৈন্যদের হাত থেকে বার কয়েক পালিয়েছি। কাল রাতেই ধরা পড়ে গেলাম। দোনিয়া বলল।
ওরা ঘরটায় ঢুকল। প্রশস্ত ঘর। মেঝের পাথরে মোজেকের কাজ করা। লোহার গরাদ বসানো পাথরের জানালা দিয়ে রোদ পড়েছে ঘরটার একপাশে। ঘরটার শেষের দিকে এক মানুষ সমান উঁচু পিঠঅলা চেস্টনাট কাঠের সিংহাসন। তার গায়ে কুঁদে কুঁদে নানা কাজ করা। সিংহাসনের লাল ভেলভেট-ঢাকা আসেন। রাজা এনজিও বসে আছে। ফ্রান্সিস দেখল। রাজাকে। বয়েস বেশি নয়-ওদেরই বয়েসী। দুধে আলতায় গায়ের রঙ। মুখে দাড়িগোঁফ কামানো। মাথায় তিনকোণা ওঠা সোনার মুকুট। গায়ে দামী কাপড়ের সোনারূপোর সুতোর কাজ করা। গলায় মুক্তোর মালা। সিংহাসনের বাঁপাশে পাথরের। আসনগুলো নীল ভেলভেট কাপড়ে ঢাকা। আসনে একজন প্রৌঢ় বসে আছেন। গায়ে হলুদরঙের জোব্বামতো। মাথার চুল দাড়িগোঁফ সব সাদা। ফ্রান্সিস বুঝল ইনিই স্পিনোলা। রাজা এনজিওর পরামর্শদাতা। সম্মানিত অমাত্য।
ফ্রান্সিসদের সিংহাসনের সামনে নিয়ে আসা হলো। সেনাপতি মাথা অনেকটা নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানিয়ে লো লাতিন ভাষায় একনাগাড়ে কি বলে গেল। হ্যারি ফ্রান্সিসকে মৃদুস্বরে বলল—সেনাপতি কীভাবে আমাদের ধরা হয়েছে, তার কথা বলল। আমাদের কথাও জানাল। আমরা বিদেশি এটাও বুঝেছে কিন্তু কোন দেশী তা জানে না। রাজা এনজিও আর স্পিনোলা দু’জনইমন দিয়ে সেনাপতির কথা শুনলেন।
রাজা দোনিয়ার দিকে তাকাল। বলল-দোনিয়া, আপনি আমার সম্মতি না নিয়ে যা করে চলেছিলেন তাতে অন্য কেই হলে তাকে কয়েদঘরে পাঠাতাম। নেহাৎ আপনি সার্দিনিয়ার এক অভিজাত বংশের সন্তান। ঐ শাস্তি আপনাকে দেব না। তবে শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে।
এবার স্পিনোলা গলা খাঁকারি দিল। হেসে বলল-মাননীয় রাজামহাশয়, অভিজাত পরিবারের হলেও পরিবার পরিজনদের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। চাষাভুষা জেলেদের সঙ্গেই তাঁর যত সম্পর্ক। যাক—গেমনে হয় একটা শাস্তি দিলেই দোনিয়াকে শায়েস্তা করা যাবে।
—ঠিক আছে। বলুন সেটা কী? রাজা বলল।
—দোনিয়া কোনোদিন এই সাসারিতে প্রবেশ করতে পারবে না। সাসারিতে তাকে দেখলেই বন্দী করা হবে। এবং তৎক্ষণাৎ বিনা বিচারে এখানকার কযেদঘরে বন্দি করে রাখা হবে। হ্যারি ফ্রান্সিসকে সব কথাবার্তা বুঝিয়ে বলছিল। স্পিনোলা যে কত বড় ধূর্ত আর কুচক্রী, স্পিনোলার বক্তব্য শুনেই ফ্রান্সিস বুঝল। দোনিয়াকে যদি সাসারিতে ঢুকতে না দেওয়া হয় তাহলে দোনিয়ার সব চেষ্টাই বানচাল হয়ে যাবে। কারণ এই সাসারির খাড়িতেই তো জলের তলায় রয়েছে সাত সৈন্যমূর্তি। ফ্রান্সিস এও বুঝল যে এক্ষুণি এই শাস্তিদান বন্ধ করতে হলে ওকে এগিয়ে আসতে হবে। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল—রাজাকে বলো যে আমরা স্পেনীয় ভাষায় কিছু বলতে চাই। উনি এবং স্পিনোলা যেন স্পেনীয় ভাষায় যা বলার বলেন।
