আমি আর কাল বিলম্ব না করিয়া অন্ধকারের ঝড়বিক্ষুদ্ধ খাঁড়ির জলে ঝাঁপাইয়া পড়িলাম। আজ আর আমি জানি না কীভাবে আমি তীরে আসিয়া পৌঁছাইয়াছিলাম।
যাহা হউক, আমি সাসারিতে কিছুদিন আত্মগোপন করিয়া ছিলাম। এক্ষণে আমি পিসায় আসিয়া নিম্নলিখিত সরাইখানায় আছি। তুমি আমাদের দুইজনের পরিচিত কয়েকজনকে লইয়া আমার পত্র পাওয়ামাত্র পিসায় আসো। সাসারির ঐ খাঁড়ি অঞ্চলে নৌকায় চড়িয়া সন্ধান করিতে পারিলে আমরা সাত সৈন্যমূর্তি জলের তলা হইতে উদ্ধার করিতে পারিব। মূর্তি গলাইয়া সোনা বিক্রয় করিয়া আমরা অচিরেই ধনী হইতে পারিব। তোমরা আসিলে নিখোঁজ সাতমূর্তির সন্ধান আরম্ভ করিব।
ইতি—মুবারক।
দোনিয়া এত বড় চিঠি নির্ভুল মুখস্থ বলে গেল,এই শুনে ফ্রান্সিস হ্যারি দু’জনেই বেশ আর্ম হলো। হ্যারি বলল—
—দোনিয়া,-আপনি শুধু বিদ্বান নন, জ্ঞানীও।
দোনিয়া মৃদু হাসল।
-–তারপর আপনি কি করলেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
—আমিও আগ্রহী হলাম। স্থির করলাম, আমি চেষ্টা করবো ঐ সাত স্বর্ণমূর্তি উদ্ধারের জন্যে। মাসকয়েক আগে আমি সাসারিতে এলাম। গেলাম রাজধানী কাগলিয়ারিতে। রাজা এনজিওর সঙ্গে দেখা করলাম। মুবারকের চিঠির কথা বললামনা। শুধু বললাম—কোনো এক সূত্র থেকে আমি জানতে পেরেছি যে মুজাহিদ সাত স্বর্ণমূর্তি নিজের দেশেনিয়ে যেতে পারে নি। সাসারির খাঁড়িঅঞ্চল যে নৌকোয় রেখে স্বর্ণমূর্তিগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সেটা ঐ খাঁড়ি কোথাও ডুবে গিয়েছিল। আমার স্থির বিশ্বাস—ঐ সাত মূর্তি আছে ঐ খাঁড়ি অঞ্চলেই জলের নীচে কোথাও। আপনি অনুমতি দিলে আমি সন্ধানকার্য চালাতে পারি। শুনে রাজা এনজিও তো খুশিতে আটখানা। একটুক্ষণ থামলো দোনিয়া। ফ্রান্সিস আস্তে বলল—বুঝলাম পরে রাজা সম্মতি দেন নি। দোনিয়া ম্লান হেসে বলল-আপনি বেশ বুদ্ধিমান। ঠিকই অনুমান করেছেন। একটু থেমে দোনিয়া বলতে লাগল—আসলে ছোটবেলা থেকেই সংসারের সঙ্গে আমার বিশেষ কোনো সম্পর্কই ছিল না। গানবাজনা, পড়াশুনা এসব নিয়েই থাকতাম। তাই স্বার্থান্ধ মানুষ কতটা নীচহীনমনা হতে পারে এ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা গড়ে ওঠে নি। যাক গে-রাজা এনজিওর বয়স কম। রাজাকে চালায়, স্পিনোলা নামে অভিজাত পরিবারের এক প্রৌঢ়। পরের বার দেখা করলাম রাজা এনজিওর সঙ্গে। আবার অনুমতি চাইলাম। রাজা এনজিও বলল—কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত যে ঐ খাঁড়িতেই সাত সৈন্যমূর্তি নিয়ে নৌকোটা ডুবে গিয়েছিল?
বুঝলাম স্পিনোলা রাজাকে অন্যরকম বুঝিয়েছে। বললাম—আমি সন্ধানকার্য চালাবো। যদি মূর্তিগুলো না পাই তাহলে তো আমারই পণ্ডশ্রম। কতদিন ধরে এই সন্ধানকার্য চালাতে হবে কে জানে! আমি যদি নিশ্চিতই না হবে তাহলে বোকার মতো এত কষ্ট স্বীকার করবো কেন?
এবার স্পিনোলা একটু হেসে বললেন—আচ্ছা দোনিয়া-এত কষ্ট করে আপনি সোনার মূর্তিগুলো উদ্ধার করতে চান কেন?
—আমাদের দেশের সম্পদ, তাই আমি বললাম। স্পিনোলা বললেন—
বুঝলাম। ধরুন ঐ মূর্তিগুলো উদ্ধার করলেন। ঐ সোনার মূর্তিগুলো বিশেষ করে সবচেয়ে বড় নিরেট সোনার মূর্তিটি—অনেক মূল্য ঐ মূর্তিগুলোর। আপনি সেসব উদ্ধার করে কি করবেন? বিক্রি করে আরো বড়লোক হবেন?
আমি বললাম,-না আমি সেসব রাজা এনজিওকে দেব। বদলে সমমূল্যের অর্থ তিনি আমাকে দেবেন। এবার রাজা এনজিও বলল, সেই অর্থ নিয়ে আপনি কি করবেন? এবার আমি আসল কথাটা বললাম-ঐ অর্থ দিয়ে আমি এখানকার দরিদ্র জেলেদের বেশ শক্তপোক্ত নৌকো তৈরি করিয়ে দেবো, মাছধরার উন্নতমানের সাজসরঞ্জাম দেবো, যাতে তারা গভীর সমুদ্রে গিয়ে নিশ্চিন্তে বেশি মাছ ধরতে পারে। উত্তর সার্দিনিয়ায় আমি ঘুরে বেড়াবোও চাষযোগ্য জমি উদ্ধার করবো। চাষীদের চাষবাসের ভালো সরঞ্জাম কিনে দেবো, যাতে তারা বেশি ফসল ফলাতে পারে। জেলে ও চাষীদের বসতি এলাকার বাড়িঘর নতুন করে তৈরি করিয়ে দেবো। চিকিৎসা আর শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করে দেবো যাতে দরিদ্র জেলে আর চাষীরা সুখে, স্বচ্ছন্দে তাদের জীবন কাটাতে পারে।
আমার স্বপ্নের কথা, আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা রাজা এনজিও কিন্তু মনোযোগ দিয়ে শুনল। স্পিনোলা হেসে উঠলেন—এসব আপনার মুখের কথা। মূর্তিগুলো পেলে আপনি, সেসব নিয়ে সাসারি থেকে পালিয়ে জেনোয়া কি পিসায় চলে যাবেন। সেসব গালিয়ে বিক্রি করে বিদেশে গিয়ে রাজার হালে বাকি জীবন কাটাবেন।
স্পিনোলার কথা শুনে দুঃখে চোখে জল এসে গেল। মানুষ এত নীচ হয়?
—রাজা এনজিও কি বললেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
সেদিন কিছু বলল না। কয়েক দিন পরে আসতে বলল। গেলাম কয়েকদিন পরে। রাজা এনজিও পরিষ্কার বলল—আমরা ভেবেচিন্তে দেখলাম। শুধু আপনার মুখের কথার ওপর বিশ্বাস করে আমি অনুমতি দিতে পারবো না। আমি বললাম—অত মূল্যবান মূর্তিগুলো জলের নীচে পড়ে থাকবে? আমি বেশ দুঃখের সঙ্গেই বললাম। স্পিনোলা বলে উঠলেন—আপনার অনুমান তো সত্যি নাও হতে পারে। মুজাহিদ হয়তো সেই মূর্তিগুলো নিয়ে নিজের দেশ স্পেনে পালিয়ে যেতে পেরেছিল।
দোনিয়া থামল। হ্যারি বলল—তারপর?
দোনিয়া বলল—আমি নানাভাবে রাজা এনজিওকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু রাজা এনজিও আমাকে কিছুতেই অনুমতি দিল না। বুঝলাম গোপনেই আমাকে এই সন্ধান চালাতে হবে। তাই কয়েকজন পরিচিত জেলেকে নিয়ে রাতের পর রাত জেগে নৌকোয় চড়ে সন্ধান চালাতে লাগলাম।
