—একটা মজার কথা বলি। অতীতে গ্রীক ব্যবসায়ীরা এই সার্দিনিয়া দ্বীপের নাম দিয়েছিল ইচনিসা অর্থাৎ মানুষের পায়ের ছাপ। এই দ্বীপটি দেখতে ওরকমই। প্রায় দু’শো বছর আগের ঘটনা—দোনিয়া আস্তে আস্তে বলতে লাগল –তখন সার্দিনিয়ার রাজা প্রথম ফ্রেডারিক। স্পেনের দোনিয়া অঞ্চলের আরবীয় সুলতান মুজাহিদ সার্দিনিয়া আক্রমণ করেছিল। কয়েকটি যুদ্ধজাহাজে সৈন্যবাহিনী নিয়ে মুজাহিদ প্রথমে এই সাসারি বন্দর আক্রমণ করে সহজেই এই উত্তর সার্দিনিয়া দখল করে নিয়েছিল। রাজধানী কাগলিয়ারি দক্ষিণ সার্দিনিয়ায়। সেখানে যতদিনে খবর পৌঁছল, ততদিনে মুজাহিদ এই উত্তর সার্দিনিয়া সম্পূর্ণভাবে দখল করে নিয়েছিল। রাজা প্রথম ফ্রেডরিক কাগলিয়ারি থেকে সৈন্যবাহিনী নিয়ে এখানে এসেছিলেন স্থলপথে। তাতে বেশ সময় লেগেছিল। যাইহোক—মুজাহিদের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে ফ্রেডারিকের সৈন্যবাহিনীর প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়েছিল এই সাসারিতে। যুদ্ধে ফ্রেডারিক হেরে গিয়েছিলেন। রাতের অন্ধকারে একটা ছোট জাহাজে চড়ে অনেক কষ্ট পালাতে পেরেছিলেন। তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন মূল ভূখণ্ডের জেনোয়ায়। বছরখানেক পরে জেনোয়া আর পিসার শাসকদের সহায়তায় অনেক যুদ্ধ জাহাজ ও সৈন্য নিয়ে তিনি সাসারি আক্রমণ করেছিলেন। এই যুদ্ধে মুজাহিদের সৈন্যবাহিনী পরাজিত হয়েছিল। সেই রাতে প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গিয়েছিল সাসারির এই অঞ্চল দিয়ে। সেই সুযোগে মুজাহিদ একটা ছোট্ট জাহাজে চড়ে স্পেনে পালাতে পেরেছিল। এই হলো ইতিহাসের ঘটনা দোনিয়া থামল।
—আমার মনে হয় এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা আছে। হ্যারি বলল। মাথা একটু ঝাঁকিয়ে নিয়ে দোনিয়া বলল—ঠিক। এবার শুনুন সেটা। মুজাহিদ যখন সাসারি দখল করে তখন এখানে এইনুরাঘিটা তো ছিলই আর একটানুরাঘি ছিল খাঁড়ির বাঁদিকের তীরে। কি কারণে জানা যায় না সেই নুরাঘিটার অর্ধেকটা ভেঙে পড়েছিল। এখন তো প্রায় ধ্বংসস্তূপ। এইনুরাঘিটা তখনও ভেঙে পড়ে নি। মুজাহিদ তার লোকজন দিয়ে এই নুরাঘিটা খুবমজবুত করেছিল। এইনুরাঘির দোতলায় সে তার রাজসভা বসাত। একেবারে ওপরের ঘরটা ছিল ফ্রেডারিক প্রতিষ্ঠিত গির্জা। এখনও সেই গির্জা আছে। গির্জায় যীশুর মূর্তি এখনও আছে। বেদীর কাছেই এলো সাতটি ঝুলন্ত সৈন্যমূর্তি। সেই সৈন্যমূর্তিগুলোয় দু’টো রূপার হাতলমতো দিয়ে, ঘা দিয়ে দিয়ে একজন বাদ্যকর সুন্দর সুরধ্বনি তুলতেন। গির্জার ঘণ্টার কাজ করত সেই সুরধ্বনি। প্রতিদিন ভোরবেলা যেই বাদ্যকর এই বাজনা বাজাতেন। সেই সুরধ্বনি ছিল স্বর্গীয়। নিশ্চয়ই এক গভীর সান্ত্বনার পরিবেশ সৃষ্টি হতো এখানে। আমাদের দুর্ভাগ্য আজকের আমরা কেউ সেই সুরধ্বনি শুনিনি। দোনিয়া থামল।
-কেন বলুন তো? ফ্রান্সিস বলল।
—কারণ মুজাহিদ সেই সাতটি সৈন্যমূর্তি চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল যখন সে একটা ছোট জাহাজে চড়ে পালাচ্ছিল। দোনিয়া বলল।
—মূর্তিগুলো কি মূল্যবান ছিল?হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
—হ্যাঁ, সবকটাই ছিল সোনার। প্রায় একফুট করে উচ্চতা ছিল মূর্তিগুলোর। শুধু পঞ্চম সৈন্যমূর্তিটি ছিল উচ্চতায় চারফুট আর শুধু ওটাই ছিল নিখাদ সোনার। কাজেই সবচেয়ে মূল্যবান। দোনিয়া বলল।
—তাহলে মুজাহিদ সেসব মূর্তি নিজের দেশেই নিয়ে গেছে। হ্যারি বলল।
—এতদিন আমরাও তাই শুনে এসেছি। কিন্তু বছরখানেক আগে পিসার এক অভিজাত পরিবারের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় পড়াশুনো করবার সময় আমি একটা আরবী ভাষায় লেখা জোতিষবিদ্যার চামড়ায় তৈরি গ্রন্থে হঠাৎই একটা ছেঁড়া পাতা পাই। একটা চিঠি। আলগা চামড়ায় লেখা। গ্রন্থটায় গুঁজে রাখা।
—কার চিঠি? ফ্রান্সিস সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল।
—চিঠিটা আমার পড়ে পড়ে মুখস্থ হয়ে গেছে। বলছি শুনুন। দোনিয়া আস্তে আস্তে বলতে লাগল—
ভাই আবু—
সার্দিনিয়া অঞ্চলের সকলেই জানে সে সুলতান মুজাহিদ গির্জা হইতে সাতটি সোনার সৈন্যমূর্তি চুরি করিয়া স্পেনে লইয়া গিয়েছেন। কিন্তু ইহা সত্য নহে।
যুদ্ধে পরাজিত হইয়া মুজাহিদ সাসারি হইতে পালাইবার উপায় খুঁজিতেছিলেন। সুলতানের কয়েকজন দেহরক্ষী সৈন্য একটি হালভাঙা জাহাজ জোগাড় করিয়া ছিল। সেই জাহাজের পিছনে একটি নৌকা বাঁধা ছিল।
তখন গভীর রাত্রি। আমরা সকলেই সাসারির নুরাঘিতে সুলতানের সঙ্গে জাগিয়া ছিলাম। সকলেরই চিন্তা কি করিয়া সাসারির খাঁড়ি পার হইয়া সমুদ্রে গিয়া পড়িব।
ভাগ্য ভালো। হঠাই সমুদ্রের উপর প্রচণ্ড ঝড় ছুটিয়া আসিয়া সাসারির বন্দর এলাকায় ঝাপাইয়া পড়িল। সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি। সুলতান মুজাহিদ আনন্দে চিৎকার করিয়া উঠিলেন এই সুযোগ। জাহাজ ছাড়ো। সুলতান নুরাঘি হইতে বাহির হইলেন। আমরা সুলতানের পিছনে আসিতেছিলাম। হঠাৎ সুলতান আমাদের কয়েকজনকে বলিলেন গির্জা হইতে সমস্ত সোনার সৈন্যমূর্তিগুলি লইয়া পিছনের নৌকায় রাখো। আমরা ছুটিয়া গিয়া গির্জায় উঠিলাম। সবগুলি সৈন্যমূর্তি খুলিয়া লইয়া ছুটিতে লাগিলাম জাহাজঘাটার দিকে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে কোনোরকমে মূর্তিগুলি নৌকায় রাখিলাম। সুলতান এই সংবাদ পাইয়া জাহাজ চালাইতে হুকুম দিলেন।
অন্ধকারে প্রবল ঝড়বৃষ্টির মধ্যে জাহাজ চলিল। দুই-পার্শ্বের পাহাড়ি এলাকা হইতে তখনও রাজা ফ্রেডারিকের সৈন্যরা স্লিং-এ চড়াইয়া বড় বড় পাথরের টুকরো আমাদের জাহাজ নৌকা লক্ষ্য করিয়া মাঝেমাঝেই খুঁড়িতে ছিল। একটা বড় পাথরের চাই আমাদের নৌকার মুখে আসিয়া পড়িল। জাহাজের সঙ্গে বাঁধা দড়ি ছিঁড়িয়া গেল। সেই সঙ্গে ঝড়ের প্রবল ধাক্কায় আমাদের নৌকা কত হইয়া ডুবিতে লাগিল। নৌকায় আমার একমাত্র সঙ্গীটিকে বারবার ডাকিয়াও কোনো সাড়া পাইলাম না।
