—কিন্তু গভীর রাতে নৌকায় চড়ে এই এই খাঁড়ি এলাকায় ঘুরে বেড়ান কেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
-দোনিয়া মাঝেমাঝেই মূল ভূখণ্ডের জেনোয়া পিসায় চলে যান। লোকে বলে উনি নাকি ওখানে পড়াশুনো করতে যান।
লোকটি থামল। তারপর বলতে লাগল—মাস ছয়েক আগে তিনি হঠাই ফিরে আসেন। একদিন সন্ধেবেলা আমাদের জেলে পাড়ায় আসেন। আমরাও তাঁর কাছে গেলাম। উনি বললেন একটা বিশেষ প্রয়োজনে আমার কয়েকজন সাহসী সঙ্গী চাই। তোমরা আমাকে সাহায্য করবে? আমরা সঙ্গে-সঙ্গে রাজি হলাম। সেই রাতেই তিনি আমাদের দু’জন বন্ধুকে নিয়ে গেলেন। এরকম করে দিন কয়েক পরে পরে রাত হলে আসেন আর দু’জন করে সঙ্গী বেছে নিয়ে যান। লোকটি থামল। তারপর আস্তে আস্তে বলতে লাগল—গত সাতদিন ধরে আমরা দু’জন তাঁর সঙ্গে আছি।
-কি করো তোমরা? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
—রাত একটু বাড়লেই এই ক্যালে মানে খাঁড়ির ধারে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে রাখা নৌকোয় চড়ে খাড়িটায় ঘুরে বেড়াই। এসময় দোনিয়া একটা লম্বা দড়ির মাথায় বাঁধা লোহার বড় বড় বড়শির মতো কি যেন খাড়ির জলের নীচে ফেলে দেন। তারপর নৌকো চলার সঙ্গে-সঙ্গে ঐ দড়িবাঁধা বঁড়শিগুলো টেনে নিয়ে চলেন। সারারাত এই বঁড়শিটানা চলে। ভোর হবার আগেই নৌকো লুকিয়ে রেখে চলে আসি আমরা।
—কিন্তু বঁড়শি টেনে দোনিযা কি কিছু খোঁজেন? ফ্রান্সিস বলল।
—হ্যাঁ, একদিন রাতে আমি জানতে চাইলাম—দোনিয়া—সারা রাত জেগে বঁড়শি ফেলে আপনি কী খোঁজেন?
দোনিয়া বললেন তোমরা ঠিক বুঝবে না। শুধু এটুকু জেনে রাখো আমি কয়েকটি যোদ্ধামূর্তি খুঁজছি। কথাটার মাথামুণ্ডু আমি কিছুই বুঝলাম না।
লোকটি থামল। ফ্রান্সিস আপন মনে বলল-যোদ্ধামূর্তি! ফ্রান্সিস বার বার জানতে চাইল সেই যোদ্ধামূর্তি লোহার না অন্য কোনো দামী ধাতুর তৈরি।
লোকটি বারবারই মাথা নেড়ে বলল—সে সব আমরা কিছুই জানি না। দোনিয়া সব জানেন। তাঁকেই জিজ্ঞেস করুন।
ফ্রান্সিস দোনিয়ার দিকে তাকাল। দেখল—দোনিয়ার ঘুম ভেঙে গেছে। দোনিয়া চোখ খুলে দু’হাত ওপরে তুলে হাই তুলল। তারপর আস্তে আস্তে উঠে বসল। ফ্রান্সিস বলল—দোনিয়া—যদি কিছু মনে না করেন আপনার কাছ থেকে কয়েকটা কথা জানার ছিল।
দোনিয়া ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। বলল—বলুন।
—আপনার সঙ্গীর কাছে শুনলাম—আপনি এই সার্জিনিয়ার এক অভিজাত পরিবারের মানুষ। দোনিয়া সামান্য হাসল, একটু মাথা নেড়ে বলল—অভিজাত হলেই সে হৃদয়বান, সৎ, নির্লোভ মানুষ হয়না। কত অভিজাত মানুষ দেখেছি-নৃশংস, লোভী, অর্থ পিশাচ অন্যাচারী। বংশের আভিজাত্য নয়—একজন মানুষের পরিচয় তার কথায়, ব্যবহারে মানবিকতাবোধে।
দোনিয়া কথা থামিয়ে দরজার দিকে তাকাল। দেখল—বাইরে রোদ উঠেছে। তবে ঘরটার অন্ধকার এখনও সবটা কাটে নি। মশালও নেভানো হয় নি।
তখনই দু’জন সৈন্য সাধারণ পোশাকে ঘরে ঢুকল। তাদের হাতে চীনে মটির বড় থালা বাটি। তাতে সকলের খাবার। থালায় গোল কাটারুটি, বাটিতে বিভিন্ন শাকসজির ঝোলমতো। খাবার থালাগুলো সঙ্গীদের সামনে বিছানায় রাখল ওরা। ফ্রান্সিস হ্যারিকে ডাকল। হ্যারি উঠে বসলো। ফ্রান্সিসরা খেতে লাগল। সকলেরই খুব খিদে পেয়েছে তখন। . ফ্রান্সিস খেতে খেতে চারদিক তাকিয়ে দেখল, ঘরের সৈন্যরা জেগে আছে। ফ্রান্সিস ভাবল সৈন্যদের সামনে দোনিয়াকে সব জিজ্ঞেস করে জানাটা ঠিক হবে না। দোনিয়াও হয়তো সব কথা বলতে চাইবে না। ফ্রান্সিসদের খাওয়া হয়ে গেল। একটা বড় কাঠের পাত্র থেকে ওরা জল নিল। সৈন্য দু’জন চলে যেতেই ঘর প্রায় কঁকা হয়ে গেল। বিছনার কোণার দিকে দু’জন সৈন্য তখনও ঘুমুচ্ছে। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল হ্যারি,একটা বেশ রহস্যময় ঘটনার কথা শুনেছি। পরে তোমাকে সব বলবো।
ফ্রান্সিস এবার সোনিয়াকে বলল—আপনার অনেক কথাই আপনার সঙ্গীর কাছ থেকে শুনেছি। কিন্তু যোদ্ধামূর্তির ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারি নি।
দোনিয়া চোখ খুলে বলল আমার সঙ্গী এ ব্যাপারটা আপনাকে না বললেই ভালো—হতো। যাক গে, আমার শুধু একটাই প্রশ্ন—আপনার এই ব্যাপারে এত আগ্রহ কেন?
এবার বলল—দেখুন ওর নাম ফ্রান্সিস, আমার বাল্যবন্ধু। ফ্রান্সিস এর আগে অনেক রহস্যের সমাধান করেছে। মূল্যবান সোনার ঘন্টা, হীরের পাহাড় মুক্তোর সমুদ্র, তুষারে গুপ্তধন ফ্রান্সিস আবিষ্কার করেছে নিজের বুদ্ধি খাঁটিয়ে।
—হুঁ—হলে মূল্যবান ধনভাণ্ডার নিখোঁজ মূল্যবান জিনিসের প্রতি আপনার লোভ আছে। দোনিয়া বলল।
—বিন্দুমাত্র না—ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল।
—তবে আপনার আগ্রহ হয় কেন? দোনিয়া বলল।
—বলতে পারেন এটা আমার এক জীবনদর্শন। আমি ভালোবাসি ঝড়বিক্ষুদ্ধ সমুদ্র, দেশবিদেশের মানুষের সঙ্গ, তাদের ভালোবাসা পাওয়া। স্বার্থান্ধ হয়ে কারো কোনো ক্ষতি আমি কোনোদিন করি নি, করবোও না। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল। হারি বলল, এসব ফ্রান্সিসের মুখের কথা নয়। এসব ওর গভীর বিশ্বাসের কথা। ফ্রান্সিসের সঙ্গে মিশলেই আপনি ওকে ঠিক বুঝতে পারবেন। দোনিয়া একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—দেখুন যোদ্ধামূর্তির ব্যাপারটা বুঝতে হলে আপনাকে এই সার্দিনিয়ার অতীত ইতিহাস একটু জানতে হবে।
—আমার অনুরোধ, আপনি সব বলুন। আমাকে আপনি বিশ্বাস করতে পারেন। ফ্রান্সিস বলল।
