ততক্ষণে বিস্কো ও আরো পাঁচ-ছ’জন ভাইকিং রেলিং-এর ওপর ঝুঁকে পড়ে দেখছে মারিয়া নৌকো চালিয়ে চলেছে শাঙ্কোর দিকে। ওরা প্রথমে বুঝল না মারিয়া এত দ্রুত নৌকোয় চড়ে যাচ্ছে কেন। তখনই হাঙরের পিঠের চলন্ত পাখনা জলের ওপর ভেসে উঠল। ওরা চমকে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। হাঙর!বিস্কো চিৎকার করে বলল, রাজকুমারী-হাতের দাঁড়টা জলে জোর জোর ফেলুন যাতে বেশিদূর পর্যন্ত জল ছিটকায়।
হাঙর তাড়াবার এসব নিয়ম মারিয়ার জানার কথা নয়। বিস্কো বারবার চিৎকার করে কথাটা বলতে লাগল। মারিয়া বিস্কোর নির্দেশমতো তাই করতে লাগল। সত্যি হাঙরটা দূরে সরে গেল। ততক্ষণে শাঙ্কো নৌকোর গায়ে হাত রেখেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে নৌকোর ওপরে কোমর পর্যন্ত তুলে লাফিয়ে তারপর পা দুটো তুলে নৌকোর গলুইয়ের মধ্যে গড়িয়ে একেবারে মড়ার মতো পড়ে রইল। মুখ হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল। চোখবোঁজা। মারিয়া নৌকো চালাল ওদের জাহাজ লক্ষ্য করে। জাহাজ থেকে তখন সমস্ত ভাইকিংরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল—ও—হো-হো। ওরা চিৎকার করে মারিয়াকে উৎসাহ দিতে লাগল।
মারিয়ার নৌকো জাহাজের গায়ে এসে লাগল। মারিয়া হালের কাছে এসে হালের খাঁজে খাঁজে পা রেখে জাহাজে উঠে এলো। বিস্কো সঙ্গে সঙ্গে দড়িতে ঝুলে পড়ে নৌকোটায় নামল। ততক্ষণে ভাইকিং বন্ধুরা জালের মতো বাঁধা দড়িদড়া নামিয়ে দিল নৌকোর ওপর। বিস্কো শাঙ্কোকে অনেক কষ্টে ধরে ধরে দাঁড় করিয়ে সেই দড়ির জালে বসিয়ে দিল। বন্ধুরা দড়ি টেনে টেনে শাঙ্কোকে জাহাজের রেলিঙের কাছে নিয়ে এলো। তারপর ওকে টেনে ধরে নামিয়ে জাহাজের ডেক-এ শুইয়ে দিল। বিস্কো ততক্ষণে নৌকো থেকে জাহাজের ডেক-এ উঠে এসেছে। বিস্কো আর দু’তিনজন ভাইকিং শাঙ্কোকে কাঁধে করে নীচে নামবার সিঁড়ির দিকে চলল। আস্তে আস্তে ওরা শাঙ্কোকে নামিয়ে এনে ওর কেবিনঘরে নিয়ে গেল। গায়ের ভেজা পোশাক খুলে ওকে শুকনো পোশাক পরিয়ে দেওয়া হলো। বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হলো। শাঙ্কো অসাড় শুয়ে রইল। সকলের মনেই তখন প্রশ্ন ফ্রান্সিস হ্যারির কী হলো? ওরা কোথায়? কিন্তু ঐ অবস্থায় শাঙ্কোকে কিছু জিজ্ঞেস করা বৃথা। ও তখন কথাও বলতে পারছেনা। ও চোখ বুজে তখনও হাঁপাচ্ছে। হাত-পা ছড়িয়ে একইভাবে পড়ে আছে।
ভয়ে আশঙ্কায় মারিয়ার বুক কাঁপছে তখন। এতক্ষণের উত্তেজনায় যে কথা মারিয়া ভুলে গিয়েছিল সেটাই মনে পড়ল তখন। ফ্রান্সিস, হ্যারির কি হয়েছে? পুরুষ ভাইকিং বন্ধুরা দুঃসাহসী। কিন্তু মারিয়া তো মেয়ে। ও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বিস্কো সান্ত্বনা দিতে লাগল—কাঁদবেন না রাজকুমারী। আপনাকে কাঁদতে দেখলে শাঙ্কো আরো নিস্তেজ হয়ে পড়বে।
মারিয়া দু’হাতে চোখ মুছে শান্ত হবার চেষ্টা করল। কিন্তু ফ্রান্সিস, হ্যারির কথা মনে হতেই আবার দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠতে লাগল।
একটু পরে শাঙ্কো আস্তে-আস্তে চোখ মেলে তাকাল। বিস্কো শাঙ্কোর মুখের ওপর ঝুঁকে চেঁচিয়ে থেমে থেমে বলল—শাঙ্কো—ফ্রান্সিস আর হ্যারি—ভালো থাকলে—মাথাটা আস্তে-আস্তে—ওঠানামা করো।
বিস্কো কথাটা দুবার বলল। বিস্কোর কথা শেষ হইেমারিয়া আর অন্য ভাইকিং বন্ধুরা সাগ্রহে শাঙ্কোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। শাঙ্কো অনেক কষ্টে একটু হাসল—তারপর আস্তে মাথা ওঠানামা করল। সবকিছু ভুলে ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল-ও হো হো—।
মারিয়া আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। নিজের কেবিনঘরে চলে এলো। আস্তে আস্তে বিছানায় মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল। ফোঁপাতে লাগল। ভাইকিং বন্ধুরা আস্তে আস্তে ডেক-এ উঠে এলো। ওরা তখন এই ভেবে নিশ্চিন্ত হলো যে ফ্রান্সিস আর হ্যারির কোনো, বিপদ হয়নি। ওরা ভালো আছে।
ওদিকে নুরাঘির সৈন্যদের ঘরে ঘাসের বিছানায় ফ্রান্সিস চোখ বুজে শুয়ে রইল কিছুক্ষণ। পাশে হ্যারি তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। বাইরে দু’একটা পাখির ডাক শোনা গেল। রাত শেষ হয়ে এসেছে। দোনিয়া তখনও ঘুমুচ্ছে। দোনিয়ার একজন সঙ্গী শুয়ে আছে। অন্য সঙ্গীটা দুহাঁটুতে মাথা রেখে বসে আছে।
ফ্রান্সিস চোখ বুজে ভাবছে তখনও। এরপরে ওরা কি করবে? রাজা এনজিও কি বিচার করবে কে জানে। ঠিক তখনই দোনিয়া মুখে কি বিড়বিড় করে বলে পাশ ফিরল। ফ্রান্সিস দোনিয়ার দিকে তাকাল। হঠাৎই মনে হলো—দোনিয়া কে, তা তো জানা হয়নি। সৈন্যদের দলপতি দোনিয়াকে আপনি করে বলছিল। তার মানে দোনিয়া সামান্য মাছ ধরা পেশার জেলে নয়। দোনিয়ার পরিচয়টা তো পেতে হবে। উনি জেলেদের পোশাক পরে জেলেদের সঙ্গে গভীর রাতে নৌকোয় চড়ে ঘুরে বেড়ান কেন?
ফ্রান্সিস উঠে বসল। হাঁটুতে হাত রেখে মাথা পেতে বসে ছিল দোনিয়ার যে সঙ্গীটি, তার হাত ধরে একটু টানল। লোকটা মাথা তুলল। ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস স্পেনীয় ভাষায় বলল—ভাই। তুমি স্পেনীয় ভাষা জানো?
লোকটি মাথা কাত করে স্পেনীয় ভাষায় বলল—হ্যাঁ তবে কাজ চলা গোছের।
-আমার তাতেই হবে—ফ্রান্সিস বলল—আচ্ছা ভাই—দোনিয়া কে? কেনই বা তোমরা গভীর রাতে নৌকোয় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলে?
লোকটি বলল,—সেসব দোনিয়া জানেন। তবে সোনিয়ার কথা বলছি শুনুন। দোনিয়া এখানকার প্রাচীন এক অভিজাত বংশের সন্তান। কিন্তু উনি বরাবরই বংশের আভিজাত্যের ব্যাপারটা মানতেন না। উনি তিন-চারটে ভাষা জানেন। লেখাপড়া নিয়েই থাকেন। অবসর সময় আমাদের জেলেপল্লীতে চাষীদের বাড়িতে চলে আসেন। আমাদের সুখ-দুঃখের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। নিজের উচ্চ বংশ নিয়ে উনি কখনও গর্ব করেন না। অন্য অভিজাত পরিবারের বাড়িতে উনি কখনও যান না। এই সাসারির এমন কি, রাজধানী কাগলিয়ারির গরীব মানুষেরা দোনিয়াকে দেবতার মতো শ্রদ্ধা করে।
