ফ্রান্সিস বুঝল এটা সৈন্যাবাস,কয়েদঘর নয়। ও একে খুশীহলো। কয়েদঘরের বন্দীদশার হাত থেকে বাঁচা গেল। এখন দেখা যাক-রাজা ওদের কি শাস্তি দেয়।
দোনিয়া ঘাসের বিছানায় বসল। তরপর শুয়ে পড়ল। বোঝা গেল—দোনিয়া খুবই ক্লান্ত। ফ্রান্সিসরাও ঘাসের বিছানায় বসল। একপাশে হ্যারি বসল। অন্যপাশে বসল দোনিয়ার সঙ্গী দু’জন। দেখা গেল দরজায় কোনো পাহারাদার নেই। তবে কিছু সশস্ত্র সৈন্য ঘোরাফেরা করছে দরজার কাছে।
রাত শেষ হয়ে আসছে। কিছু সৈন্য অস্ত্রশস্ত্র খুলে ঘরগুলোয় ঢুকছে। বোধহয় শুয়ে বিশ্রাম করবে এখন।
ফ্রান্সিস এবার বিছানায় শুয়ে পড়ল। হ্যারি ক বলল—হ্যারি শুয়ে বিশ্রাম।
হ্যারি ও শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস বলল—শাঙ্কো পালিয়েছে। খুব বাঁচোয়া যে ওর কোনো বিপদ হয়নি। মারিয়া বন্ধুরা অন্তত নিশ্চিত হবে শাঙ্কোর কাছে খবর পেয়ে যে আমাদের এখনও কোনো বিপদ ঘটে নি। আমরা ভালো আছি।
হ্যারি বলল—ভালোই হলো। শাঙ্কো খুব কায়দা করে পালিয়েছে। আমি তো বুঝতেই পারিনি। একটু চুপ করে থেকে হ্যারি বলল—আমরা বিপদ থেকে বাঁচবো কিনা, সেটা এখন নির্ভর করছে রাজা এনজিওর মর্জি-মেজাজের ওপর।
—দেখা যাক কপালে কি আছে। ফ্রান্সিস বলল।
ওদিকে শাঙ্কো সাঁতরে সাঁতরে যাচ্ছে। চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় দেখল রাজার জাহাজটা ঠিক খাঁড়ির মুখে নোঙর করে আছে। শাঙ্কো বুঝল—ওদিক দিয়ে পালানো যাবে না। ও সাঁতরে সাঁতরে তীরের কাছে এল। দেখল এখানে তীরের কাছটা পাথর ছড়ানো মাটি। অনেকটা সমতল। ও তীরের কাছে পায়ের নীচে পাথুরে মাটি পেল। কোমরজলে দাঁড়িয়ে একটু বিশ্রাম করল। ও তখনও হাঁপাচ্ছে। আস্তে আস্তে হাঁপ ধরা ভাবটা যেন কমল।
শাঙ্কো ছোট ছোট পাথরকুঁচি ছড়ানো মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে জল থেকে তীরে উঠল। ও স্থির করল পশ্চিমমুখো হেঁটে ঠিক খাঁড়ির মুখ থেকে দূর চলে যাবে। তারপর সমুদ্রের জলে নেমে সাঁতরে নিজেদের জাহাজে ফিরবে।
পাথুরে জমি পেরিয়ে বেশ একটা টানা সমতল এলাকা পেল শাঙ্কো। চলল পশ্চিমমুখে। হাঁটতে লাগলো শাঙ্কো। সমতল হলেও এখানে-ওখানে পাথর ছড়িয়ে আছে। কাজেই শাঙ্কোকে বেশ সাবধানেই হাঁটতে হচ্ছিল। গায়ে জলে ভেজা পোশাক সমুদ্রের জোর। হাওয়ার শরীর কেঁপে উঠছিল। বেশ শীত শীত লাগছিল। একসময় সমুদ্রের ধারে এলো শাঙ্কো। দেখল খাঁড়ির মুখে রাজার জাহাজ অনেক দূরে। শাঙ্কো পা টিপে টিপে পেছল পাথরের ওপর পা রেখে। সমুদ্রের জলে নামল। দূরে ওদের জাহাজ দেখা যাচ্ছে। শাঙ্কো ওদের জাহাজ লক্ষ্য : করে সাঁতরাতে লাগল।
একটু পরেই মাথার ওপর কালো; আকাশের অন্ধকার কেটে যেতে লাগল। শাঙ্কো মুখ তুলে পুবদিকে তাকাল। দেখল।—লালচি হয়ে উঠেছে। পূর্ব দিগন্তের—আকাশে সূর্য উঠতে দেরি নেই। শাঙ্কো প্রক এবার দ্রুত সাঁতরাতে লাগল। রোদ চড়া হলে বিপদ হতে পারে। অনেকটা দূর হলেও রাজার জাহাজ থেকে কারো নজরে পড়ে যেতে পারে ও। কাজেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তল্লাট ছেড়ে পালাতে হবে।
শাঙ্কো সাঁতরে চলল। হাত-পা যেন আর চলছেনা। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। তবুশাঙ্কো গতি কমাল না। পাথরের মতো ভারি হাত-পা। তবু প্রাণপণে সাঁতার কেটে চলল শাঙ্কো।
পুব আকাশে সূর্য উঠল। নরম আলো ছড়ানো শান্ত সমুদ্রের জলে। রোদ চড়া হতে লাগল। শাঙ্কো তখনও সাঁতরে চলল।
ওদের জাহাজের কাছে যখন এলো তখন রাজার জাহাজ অনেক দূরে। নজরে পড়ার সম্ভাবনা নেই। চারদিকে তাকাচ্ছে তখনই হঠাৎ দেখল জলের ওপর চলন্ত পাখনা। শাঙ্কোর বুক কেঁপে উঠল। হাঙর জল কেটে ঘুরছে। শাঙ্কো ভালো করে আবার চারদিকে তাকাল। না, আর কোনো চলন্ত পাখনা জল কেটে ছুটছেনা। শাঙ্কো যখন সাঁতরাতে শুরু করে তখন তলোয়ারটা কোমরে গোঁজা ছিল। কিন্তু হাত পা চালিয়ে সাঁতার কাটতে গিয়ে পায়ে খাপছাড়া খোলা তলোয়ারের খোঁচা লেগে কেটে ছড়ে যাচ্ছিল। তলোয়ারটা নানাভাবে পিঠের নীচে পোশাকে ঢুকিয়ে বুকের কাছে পোশাকে ঢুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছিল। এতে পরিশ্রমই বেশি হতে লাগল। তলোয়ারের খোঁচার হাত থেকে বাঁচা গেল না। কেটে যাওয়া, ছড়ে যাওয়া জায়গাগুলোয় সমুদ্রের নোনা জল লেগে ভীষণ জ্বালা করছিল। তখন শঙ্কো তলোয়ারটা ফেলে দিয়েছিল। এখন বুঝল—খুব ভুল হয়েছে। হাঙরের কামড় থেকে বাঁচবার আর কোনো উপায় রইল না। শাঙ্কো সাহস সঞ্চয় করল। এখন ভয় পেলে চলবেনা। হাঙর যাতে দূরে দূরে সরে যায় তার জন্যে শাঙ্কো জলে দু’পা দাপাতে দাপাতে সাঁতরাতে লাগল। এতে হাঙরটা দ্রুত আক্রমণ করতে পারল না। শাঙ্কোর চারপাশে পাক খেতে লাগল। বুঝে নিচ্ছে-লোকটা সশস্ত্র কিনা।
জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল মারিয়া। সারারাত ঘুমোয় নি মারিয়া। রেলিঙের ধারে কখনো বসেছে, কখনও উঠে দাঁড়িয়েছে। দৃষ্টি খাঁড়ির মুখের দিকে। ফ্রান্সিসরা ফিরল কিনা। শাঙ্কোকে প্রথম মারিয়াই দেখতে পেল। মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে ডাকল—বিস্কো—তোমরা শিগগির এসো। শাঙ্কো সাঁতরে আসছে। মারিয়ার ডাকে ডেক-এ ঘুমন্ত ভাইকিংদের ঘুম ভেঙে গেল।
মারিয়া তখনই দেখল শাঙ্কোর ঠিক ডান পাশে হাতকয়েক দূরে হাঙরের চলন্ত পাখনা। ভয়ে মারিয়ার বুক কেঁপে উঠল। মারিয়া কারো জন্যে অপেক্ষা না করে ছুটে হালের কাছে গেল। হালের কাঠের খাঁজে খাঁজে পা রেখে দ্রুত নেমে এলো দড়িবাঁধা একটা নৌকোয়। দড়ি খুলে জোরে দাঁড় বাইতে লাগল।
