দোনিয়া বুঝলো পালাবার কোনো উপায় নেই। ও কোমরে গোজা তলোয়ার খুলে নৌকোর গলুইয়ে ফেলে দিল। সঙ্গী দু’জনও তাই করে। তারপর নৌকায় বসে পড়লো।
সৈন্যভর্তি একটা নৌকো ফ্রান্সিসদের নৌকো ছাড়িয়ে দ্রুত দোনিয়াদের নৌকোর গায়ে গিয়ে লাগল। দু’জন সৈন্য তলোয়ার কোমরের খাপে ভরে দোনিয়াদের নৌকোয় উঠল। নৌকো থেকে মোটা দড়ির মাথা ছুঁড়ে দেওয়া হলো। সৈন্য দু’জন দোনিয়ার নৌকোটার হালের কাছে দড়ি দিয়ে বাঁধল।
এদিকে অন্য নৌকোটা ফ্রান্সিসদের নৌকোর গায়ে এসে লাগল। চাঁদের অল্প আলোয় ফ্রান্সিসদের পোশাক-পরিচ্ছদ দেখেই বুঝলো –এরা বিদেশী।
সকলের সামনের সৈন্যটি খোলা তলোয়ার হাতে লাফিয়ে ফ্রান্সিসদের নৌকোয় উঠল। লো লাতিন ভাষায় বলল—তোমরা কারা?
হ্যারি উঠে দাঁড়াল। কোমর থেকে তলোয়ার খুলে নৌকোর গলুইয়ে রেখে। বলল—আমরা বিদেশি, ভাইকিং। আমরা লড়াই চাই না।
আপনাদের বন্ধুত্ব চাই। সৈন্যটি খোলা তলোয়ার কোমরে গুঁজে রাখল। হাত বাড়িয়ে সৈন্যদের নৌকো থেকে বেরিয়ে ধরা দড়ির মাথাটা নিল। ফ্রান্সিসদের নৌকোর গলুইয়ের কাঠের সঙ্গে দড়িটা বাঁধল।
—তোমাদেরও বন্দী করা হলো। কালকে রাজা এনজিওর কাছে হাজির করা হবে তোমাদের। রাজা যা বিচার করবেন, তাই করা হবে।
দু’তিনজন ফ্রান্সিসদের নৌকোতেও উঠল। এবার নৌকো দটো দড়ি দিয়ে বাঁধা দোনিয়া ও ফ্রান্সিসদের নৌকো টেনে বাঁধল। দোনিয়াদের নৌকোর সৈন্যটি তলোয়ার উঁচিয়ে দূরের নুরাঘিটা দেখিয়ে বলল—নুরাঘিতে টেনে নিয়ে চলো।
নৌকো দু’টো আগে চলল। পেছনে দড়ি বাঁধা দোনিয়া ও ফ্রান্সিসদের নৌকো। রাজার জাহাজটা দেখা গেল খাড়ির মুখের দিকে চলে যাচ্ছে।
দড়িবাঁধা দোনিয়া ও ফ্রান্সিসদের নৌকো দুটো টেনে নিয়ে চলেছে সৈন্যদের নৌকো দুটো। শাঙ্কো আস্তে নৌকোর গলুইয়ের ধারে সরে এলো। ও তখন দ্রুত ভাবছে আর দেরি করলে চলবেনা। রাত থাকতে থাকতেই পালাতে হবে। জাহাজেফিরে বন্ধুদের সব জানাতে হবে। কালকে রাজা বিচার করবে। ওদের কি শাস্তি দেবে কে জানে ওদের কাউকে কাল সকালেও ফিরতে না দেখলে বন্ধুরা চিন্তায় পড়ে যাবে। হয়তো ওদের খোঁজ নিতে জাহাজ চালিয়েই ওরা খাড়িতে ঢুকে পড়বে। রাজার জাহাজে অন্য জাহাজটায় অনেক সৈন্য আছে। হয়তো লড়াই হতে পারে। সশস্ত্র সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে বন্ধুরা হারবে। মৃত্যু হবে অনেক বন্ধুর। বন্দীও হবে অনেকে। কাজেই যে করে হোক ওদের সব খবর দিয়ে সাবধান করে দিতে হবে।
শাঙ্কো আরো স’রে এল। গলা নামিয়ে ফিফিস্ করে ডাকল—ফ্রান্সিস ফ্রান্সিসের কানে ডাক গেল। কিন্তু ও মাথা ঘুরিয়ে শাঙ্কোর দিকে তাকাল না। আঙুল দিয়ে বাঁ কানটা ছুঁল। তার মানে ও ডাক কানে শুনতে পেয়েছে। মাথা ঘুরিয়ে তাকালে সৈন্য দু’জনের সন্দেহ হতে পারতো কি কথা বলছে ওরা? শাঙ্কো আগের মতোই চাপা গলায় বলল আমি সাঁতরে পালাচ্ছি বন্ধুদের খবর দেব।
ফ্রান্সিস একটুক্ষণ ভাবল। তারপর মাথা ওঠানামা করে সম্মতি জানাল। তবে ফিফিস্ করে বলল—সাবধানে।
শাঙ্কো সৈন্য দু’জনের দিকে তাকাল। দেখল সৈন্য দু’জন তখনও খোলা তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে দূরের নুরাঘিটার দিকে।
শাঙ্কো নৌকো থেকে আস্তে-আস্তে দু’পা জলে নামল। তারপর সৈন্য দু’জনের অন্যমস্কতার সুযোগ নিয়ে দু’হাতে ভার দিয়ে জলের মধ্যে শরীরটা ছেড়ে দিল। টুপ করে জলে ডুবে গেল শাঙ্কো। সৈন্য দু’জন কিছুই বুঝতে পারল না।
শাঙ্কো এক ডুবে যতটা সম্ভব দূরে এসে আস্তে আস্তে মাথা ভাসাল। দেখল নৌকোগুলো অনেক দূর চলে গেছে। শাঙ্কো জলে কোনোরকম শব্দ না করে আস্তে আস্তে সারাতে লাগল তীরের দিকে।
কিছু পরে নৌকোগুলো নুরাঘির কাছে এলো। তখনও অন্ধকার কাটেনি। দেখা গেল জলের ধারটা পাথর বাঁধানো। রাস্তা চলে গেছে ওখান থেকে নুরাঘির সদর প্রবেশপথের দিকে। প্রবেশপথের কাঠের দরজা। তার মাথায় মশাল জ্বলছে। পাথরের টানা দেওয়ালের মাথায় এখানে আরো মশাল জ্বলছে। কয়েকজন পাহারাদার সৈন্য নুরাঘি পাহারা দিচ্ছে। তবে তাদের তলোয়ার কোষবদ্ধ। পাথর বাঁধানো তীরে নৌকোগুলো ভিড়ল। আস্তে আস্তে সবাই নামতে লাগল। সৈন্যরা নেমে সারি দিয়ে দাঁড়াল। সৈন্যদের দলনেতা গলা চড়িয়ে বলল—সব বন্দীরা উঠে এসো। ফ্রান্সিস, হ্যারি, দোনিয়া তার সঙ্গী দু’জন—সবাই আস্তে-আস্তে তীরে নামল।
সৈন্যদের মাঝখান দিয়ে ফ্রান্সিসরা চলল নুরাঘির প্রধান ফটকের দিকে। ততক্ষণে ফটকের বড় কাঠের দরজা পাহারাদার সৈন্যরা ঠেলে খুলে দিয়েছে। রাস্তা পার হয়ে ফ্রান্সিরা প্রধান ফটক দিয়ে নুরাঘির ভেতরে ঢুকল।
ছোট পাথরের চত্বরের পর নুরাঘি। গোল তলাটা। অনেকগুলো ঘর। ফ্রান্সিস মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল—গোল নুরাঘি ওপরের দিকে উঠে গেছে। ওপরেও বেশ কিছু লোহার গরাদবসানো জানালা। তার মানে ওপরেও আরো ঘর আছে।
দলনেতার নির্দেশে ফ্রান্সিসদের একটা ঘরে ঢোকানো হলো। ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস জ্বলন্ত মশালের আলোয় দেখল ঘরটা খুব বড়ো নয়। পাথরের মেঝেয় শুকনো ঘাসের ওপর কাপড়পাতা বিছানা। পাঁচ-ছ’জন সৈন্য ঘুমিয়ে আছে। ফ্রান্সিসদের ঢোকার শব্দে দু’একজন সৈন্যের ঘুম ভেঙে গেল। একজন উঠে বসে হাই তুলল।
