জাহাজের রেলিং ধরে পঁড়িয়ে ছিল মারিয়া। ফ্রান্সিসদের নৌকোটা দেখতে লাগল। ওর মন খারাপ হয়ে গেল। এই বিদেশ বিভুইয়ে কে জানে কোনো বিপদে পড়ে কিনা ফ্রান্সিসরা। কিন্তু ফ্রান্সিসকে কোনোভাবেই সংকল্পচ্যুত করা যাবে না, এটা মারিয়া জানে। ভয় কাকে বলে ফ্রান্সিস জানে না। ওর আত্মবিশ্বাসও প্রবল।
নৌকা চলেছে। সমুদ্র বেশ শান্ত। হাওয়ার বেগও বেশি নয়। তবু দূরবিস্তৃত সমুদ্রের শোঁ-শোঁ শব্দটা শোনা যাচ্ছে। দাঁড় বাইছে ফ্রান্সিস আর একটা দাঁড় হালের মতো ধরে চুপ করে বসে শাঙ্কো নৌকোর অন্য কোণটায়। মাঝখানে হ্যারি আকাশ তারার মেলা বসে গেছে। ভাঙা চাঁদ। চাঁদের আলো খুব উজ্জ্বল নয়। তবে অস্পষ্ট হলেও ফ্রান্সিস দেখল ওদের নৌকো খাড়িটার তীরের কাছে চলে এসেছে। ফ্রান্সিস চাঁদের আলো দেখে নৌকোটা খাঁড়িটায় ঢুকিয়ে দিল। তারপর তীরের কাছ দিয়ে নৌকো চালাতে লাগল। খাঁড়ির পার ধরে চলেছে উঁচু উঁচু বিরাট পাথুরে চাঁই। খাঁড়ির ওপারে দেখা যাচ্ছে সেই তলামোটা মিনার মতো। বেশ উঁচু। কিন্তু ওপর থেকে অনেকটা ভাঙা, যেন ধস নেমেছিল। ধসের মধ্যে চৌকোনো বড় বড় পাথরের চাঙ ছড়ানো। বোঝাই যাচ্ছে, ঐ মিনারেরই ভগ্নস্তূপ। খাঁড়ি শেষে যে তলামোটা মিনারটা দেখা যাচ্ছে সেটা কিন্তু অটুট। পাথর-বাঁধানো। দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ঐ তলামোটা মিনারগুলো কিফ্রান্সিসরা বুঝতে পারলোনা।
খাঁড়ির জলে তেমন ঢেউ নেই। অল্প জ্যোৎস্নার আলোয় সবই দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস খাঁড়ির ধারের উঁচু-উঁচু পাথরের চাঁইগুলোর দিকে নজর রেখে চলল যদি সমতল এলাকা পায়। সমতল এলাকাতেই বাড়ি ঘর থাকবে। লোকজনের বাস সেখানেই তো হবে।
দু’তিনটে পাথরের চাইয়ের পাশ দিয়ে খাড়ির জল অনেকটা ঢুকে গেছে। এখানটায় আসতেই ফ্রান্সিস দেখল পাথরের চাঁইগুলোর আড়াল থেকে একটা এদেশীয় নৌকো দ্রুত ওদের নৌকোর দিকে ছুটে আসছে। নৌকোটায় তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। হাতে খোলা তলোয়ার। ফ্রান্সিসরা কিছু বোঝার আগেই নৌকোটা ওদের নৌকার গায়ে এসে লাগল। ঝাঁকুনি সামলে তিনজন সশস্ত্র লোকই ফ্রান্সিসদের নৌকায় লাফ দিয়ে নামল। শাঙ্কো দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে কোমর থেকে তলোয়ার খুলল। ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল—তলোয়ার নামাও।
শাঙ্কো তলোয়ার নামাল। ফ্রান্সিস পর্তুগীজ ভাষায় বলল—আমরা বিদেশি—লড়াই চাই না। লোক তিনটি কিছুই বুঝল না। তবে তলোয়ার নিয়ে আক্রমণও করল না। নিজেরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। এবার হ্যারি লো লাতিন ভাষায় বলে উঠল—আমরা বিদেশি, ভাইকিং, লড়াই নয় বন্ধুত্ব চাই।
এবার লোক তিনজন বুঝল। ওরা তলোয়ার নামাল। আস্তে আস্তে টাল সামলে নৌকোটায় বসে পড়ল। লোকগুলোর গায়ে এখানকার জেলেদের জোব্বামতো পোশাক। অল্প চাঁদের আলোয় দেখে হ্যারি বুঝল ওদের পোশাক জলে ভেজা। ওদের মধ্যে রোগা আর লম্বামতো লোকটি লো ল্যাতিন ভাষায় বলল, তোমরা বিদেশী ভাইকিং এখানে এসেছো কেন?
—সে অনেক কথা—হ্যারি বলল, শুধু এটুকু বলছি যে আমরা মোজারকা দ্বীপ থেকে আসছি। যাবো পর্তুগালের দিকে। এটা কি কোনো দ্বীপ?
—হ্যাঁ। এটা সার্দিনিয়া দ্বীপের উত্তরের সাসারি বন্দর। কিন্তু তোমরা হঠাৎ এখানে এসেছো কেন?
—একটু দূরে আমাদের জাহাজ নোঙর করা আছে। আমরা কোথায় এলাম, তার হদিশ জানতে এসেছি হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস বলল হ্যারি, জিজ্ঞেস করো তো ঐ তলামোটা মিনার মতো-ওগুলো কী?ফ্রান্সিস কথাটা বলল স্পেনীয় ভাষায়। দেখা গেল লোকগুলো স্পেনীয় ভাষা বুঝল। লম্বামতো লোকটা পরিষ্কার স্পেনীয় ভাষায় বলল—ওগুলো নুরাঘি। সার্দিনিয়ার অনেক জায়াগায় নুরাঘি আছে।
—এগুলো কি দুর্গ? শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল।
লোকটি বলল—হ্যাঁ। সৈন্যরা থাকে।
—তোমার নাম কি ভাই?
—দোনিয়া লোকটি বলল।
হঠাৎ পেছন ফিরে কি দেখেই দোনিয়া এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। চাপাস্বরে বলে উঠল—রাজার জাহাজ। পালাও। দোনিয়ার সঙ্গী দু’জনও উঠে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিসরা পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখল সেই সুদৃশ্য সুন্দর ছোট্ট জাহাজটা নিঃশব্দে এদিকেই আসছে। সেই জাহাজের সম্মুখে দুটো ছোট নৌকো খুব দ্রুত আসছে। নৌকো দুটো সাধারণ মাছধরা নৌকো না। বেশ সৌখিন সুন্দর নৌকো। নৌকো দু’টোয় প্রায় জনাদশেক সৈন্য। খোলা তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। সৈন্যদের মাথায় শিরস্ত্রাণ, বুকে লোহার বর্মআঁটা।
দোনিয়া আর তার সঙ্গী দু’জন নিজেদের নৌকোয় লাফিয়ে উঠতে গেল। নৌকোটা। টাল সামলাতে না পেরে একজন সঙ্গী জলে পড়ে গেল। তাকে হাত বাড়িয়ে নৌকোয় তুলতে গিয়ে দোনিয়ার দেরি হয়ে গেল। ততক্ষণ সৈন্যবোঝাই নৌকো দু’টো অনেক কাছে চলে এসেছে। সৈন্যদের নৌকো থেকে কে যেন চিৎকার করে বলল, দোনিয়া—পালাবার চেষ্টা করবেন না। আজকে আপনাকে ধরা দিতেই হবে।
দোনিয়া ততক্ষণে সঙ্গীটিকে নৌকোয় তুলে ফেলেছে। দোনিয়া দেখল রাজার নৌকো জাহাজের অনেক কাছে চলে এসেছে। এত সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে মৃত্যু অনিবার্য। দোনিয়া পাথরের চাই-ওঠা তীরের দিকে তাকাল। ওর লক্ষ্য সাঁতার দিয়ে তীরে উঠে পালানো। কিন্তু দেখলো তীরে পাথরের চাইয়ের ওপর খোলা তলোয়ার হাতে কয়েকজন সৈন্য এসে দাঁড়িয়েছে। বোঝা গেল সৈন্যরা আটঘাট বেঁধেই নেমেছে। যাতে দোনিয়া কোনোভাবেই পালাতে না পারে।
