নজরদার পেড্রো মাস্তুলের দড়িদড়ায় পা রেখে উঠতে লাগল মাস্তুলের মাথায়। নিজের জায়গায় গিয়ে বসে চারদিকে নজর রাখাই তো ওর কাজ। নিজের জায়গায় মাস্তুলের মাথায় পৌঁছবার পর ওর নজরে পড়ল পুবদিকে পাথুরে ডাঙা। পেড্রো চেঁচিয়ে উঠল—ডাঙা-ডাঙা দেখা যাচ্ছে।
ডেক-এর ওপরে যে ভাইকিংরা শুয়ে বসে ছিল তাদের কয়েকজন এসে রেলিঙ ধরে দাঁড়াল। ওরাও দেখল পাথুরে ডাঙা। বিস্কোও ছিল তাদের মধ্যে। ও একজন ভাইকিং বন্ধুকে বলল—ফ্রান্সিস-হ্যারি দের আসতে বলল।
বন্ধুটি ছুটল সিঁড়ি দিয়ে নেমে কেবিনঘরের দিকে। কেবিনঘরে ক্লান্ত ফ্রান্সিস শুয়ে বিশ্রাম করছিল। মারিয়া এমব্রয়ডারির কাজ করছিল। দরজায় টোকা পড়তে মারিয়া উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। ভাইকিং বন্ধুটি বলল—ফ্রান্সিস, ডেক-এ এসো। পেড্রো ডাঙা দেখতে পেয়েছে।
ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে চাল ডেক-এ ওঠার সিঁড়ির দিকে। মারিয়াও চলল পেছনে পেছনে।
ডেক-এ উঠে রেলিঙের ধারে এলো ফ্রান্সিস বিস্কো আঙ্গুল দিয়ে পুবদিকটা দেখান। বিকেলের আলো অনেকটা কমে এসেছে। তবু দেখা গেল উঁচুনিচু পাথুরে জমি। কিছু কাঠপাথরের বসতি এলাকাও দূরে দেখা গেল। আর পড়ন্ত রোদে দেখা গেল উঁচু মিনারের মতো। শঙ্কুর আকারের। নীচের দিকটা গোল, ছড়ানো। পাথরের দেয়াল। একটা বেশ বড়ো খাঁড়ির মতো। সমুদ্রের জল অনেকটা ভেতরে এখানে গেছে।
ততক্ষণে হ্যারি এসে পড়েছে। সবাই উৎসুক চোখে দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি, কিছু বুঝতে পারছো?
—কোনো দ্বীপটিপহবে বসতি এলাকা খুব বড়ো নয় বলেই মনে হচ্ছে। হ্যারি বলল। ফ্রান্সিসদের জাহাজটা তখনই একটু উত্তরমুখো হলো। এবার দেখা গেল বন্দর এলাকা। বড় খাঁড়িরমুখে জাহাজঘাটা। দুটো জাহাজ নোঙর করা। একটা জাহাজ বড়। যুদ্ধ জাহাজ। তবে মালবহনের কাজও করে। অন্য জাহাজটা ছোট। ঝকঝকে সবুজসাদা রঙ করা। বেশ শৌখিন জাহাজ। পালগুলো গুটোনো। মাস্তুল ডেকও রঙ করা। সবুজ রঙের মোটা দড়ির রেলিং। তাতে ছোট ছোট পতাকা বসানো। হাওয়ায় উড়ছে পতাকাগুলো। জাহাজটার মাথায় একটা সবুজ রঙের দামী কাপড়ের পতাকা উড়ছে। তাতে কিছু একটা নকশা আঁকা। শেষ বিকেলের আলোয় ঠিক বোঝা গেল না কিসের নকশা। আলো কমে আসায় আর বিশেষ কিছু দেখা গেল না। জাহাজ দুটোয় মাত্র কয়েকজনকে দেখা গেল। তারা পাহারদার সৈন্য না আরোহী বোঝা গেল না। ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি, কি করবে?
—আমরা বন্দরের দিকে যাবোনা। খাঁড়ির এপাশে বেশ দূরে আমাদের জাহাজ নোঙর, করবো-হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস বলল, বেশ। জাহাজচালককে তাই বলো।
বিস্কো জাহাজ চালককে নির্দেশ দিতে চলে গেল। মারিয়া বলল—কিন্তু কোথায় এলাম। এটা কোনো দ্বীপনা দেশ সেটাও তো জানতে হবে।
-তাহলে তো আমাদের এখানে নামতে হবে, হ্যারি বলল। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল, হ্যারি—সেটা আমিও ভাবছি। কিন্তু খোঁজটা নেবো কি করে?
হ্যারি বলল,—যা বুঝতে পারছি ঐ জাহাজ দু’টোয় যারাই থাকুক তাদের কারোও থেকে এসব জানতে গেলে বিপদ হতে পারে।
—হুঁ ঠিক বলেছো—ফ্রান্সিস বলল-ঐ সুন্দর ঝকঝকে জাহাজটা দেখে আমার সন্দেহ হচ্ছে নিশ্চয়ই ওটা কোনো রাজা বা ধনী ব্যবসায়ীর। তাদের কাছে কোনো সাহায্য পাওয়ার আশা কম। উল্টে আমাদের ওরা জলদস্যুর দল ভেবে আক্রমণ করতে পারে। তাতে আমাদের আত্মরক্ষার জন্য লড়াইয়ে নামতে হতে পারে। আমরা কোন লড়াইবা ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে যাবো না। আমাদের কোনো ক্ষতি হয়, এমন কিছু আমরা করবো না।
হ্যারি বলল, হ্যাঁ আমরাও তাই মত। একটু থেমে বলল—সবচেয়ে ভালো হয় একটু রাত হলে নৌকায় চড়ে আমরা খাড়ির গায়ে গিয়ে নামবো। ধারে-কাছের বাড়িগুলোর কোনোটাতে গিয়ে কোথায় এলাম এটা জেনে নিয়ে চলে আসবো।
-ঠিকই বলছো হ্যারি এতে বিপদের আশঙ্কা কম-মারিয়া বলল। ফ্রান্সিসদের জাহাজ এতক্ষণে থেমে গেছে। বেশি শব্দ না করে আস্তে আস্তে নোঙর ফেলা হ’ল। সন্ধে হলো। ফ্রান্সিস, হ্যারি আর শাঙ্কো তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম করতে লাগল। রাতে বেরুতে হবে নৌকায় চড়ে।
রাত হলো। ভাইকিং বন্ধুরা সব খাওয়া-দাওয়া সেরে নিচ্ছে তখন হ্যারি এসে ওদের বলে গেল খাওয়া-দাওয়ার পরে ওরা সবাই যেন ডেক-এ উঠে আসে ফ্রান্সিস তাদের কিছু বলবে।
খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই জাহাজের ডেক-এ জড়ো হলো। একুট পরে পোশাক পরে কোমরে তলোয়ার নিয়ে ফ্রান্সিস, হ্যারি আর শঙ্কো এলো। মারিয়াও এলো।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলতে লাগল—ভাইসব যে ডাঙা আমরা দূরে দেখছি আমরা জানি না সেটা কোনো দ্বীপ না দেশ। সেটা না জানতে পারলে আমরা কোথায় এলাম, আমাদের দেশ কতদূর, এসব কিছুই বুঝতে পারবো না। তাই এসব খোঁজখবর নিতে আমি হ্যারি আর শাঙ্কোকে নিয়ে নৌকায় চড়ে তীরে যাবো। গোপনে খোঁজখবর নিয়ে আসবো। সে কাজটা এমনভাবে সারতে হবে যাতে কোনো বিপদে না পড়ি। তোমরা ঘুমোও কিন্তু কযেকজনকে ডেক-এ সতর্কভাবে থাকতে হবে। যদি কোন বিপদে পড়ি তাহলে যাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই অঞ্চল থেকে পালাতে পারি।
ফ্রান্সিস থামল হ্যারি আর শাঙ্কোকে নিয়ে চলল জাহাজের পেছন দিকে। হালের কাছে এসে ফ্রান্সিস দেখল একটা নৌকো জলে নামানো হয়েছে। ঢেউয়ে অল্প অল্প দু’লছে নৌকোটা। প্রথমে ফ্রান্সিস তারপরে শাঙ্কো আর হ্যারি জাহাজের বড় হালের খাঁজে পা রেখে নৌকোয় নেমে বসে পড়ল। জাহাজের সঙ্গে বাঁধা দড়িটা খুলে ফ্রান্সিস নৌকো ছেড়ে দিল। দাঁড় টানতে লাগল। ঢেউয়ের দোলায় দুলতে দুলতে নৌকো তীরের দিকে চলল।
