নিজেদের কেবিনঘরে ফ্রান্সিস বিছানায় বসে আছে কাঠের দেয়ালে পিঠের ভর রেখে। মারিয়া বিছানার একপাশে বসে সুঁচ সুতো দিয়ে নিজের একটা পোশাকের সেলাই ছিঁড়ে যাওয়া জায়গাটা সেলাই করছিল।
বিকেলের আলো কমে এসেছে। মারিয়া সেলাই বন্ধ করে সবকিছু একটা চামড়ার পেটিতে তুলে রেখে বলল ফ্রান্সিস—আর কোথাও নয়। এবার দেশের দিকে জাহাজ চালাতে বলো।
ফ্রান্সিস ও এই কথাটাই ভাবছিল। অনেকদিন হয়ে গেল ওরা দেশ ছেড়ে এসেছে। কতদিন কত রাত কেটে গেল সমুদ্রে বিদেশের মাটিতে। বন্ধুদের মনের অবস্থা ও ভালো করেই বুঝতে পারছে। মারিয়া তো দেশে ফেরার কথা বলবেই। এতদিন ও কখনো বাবা মাকে ছেড়ে থাকেনি। ফ্রান্সিস হ্যারি, আর বন্ধুদের তো বিদেশের বন্দরে-বন্দরে ঘুরে বেড়ানো কত বিচিত্র মানুষদের জীবন ওরা দেখেছে। কখনো সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও বন্দী দশার জীবন তো কাটিয়েছে। এবার ওরা তো ফিরতে চাইবেই।
ফ্রান্সিস এসব ভাবছে তখনই হ্যারি এলো। ফ্রান্সিসদের পাশে বসল। মারিয়া বলল, হ্যারি-বন্ধুকে বুঝিয়ে বলল এবার দেশের দিকে জাহাজ চালাতে।
হ্যারি বলল,ফ্রান্সিস-এবার দেশেই ফিরে চলল।
—দেখো হ্যারি ফ্রান্সিস আস্তেআস্তে বলল—তুমি ভালো করেই জানো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অলস জীবন আমাকে কোনোদিন টানেনি। আমি ভালোবাসি অভিযাত্রীর জীবন। ঝড়বিক্ষুদ্ধ সমুদ্র। দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা দেশ, মানুষজন তাদের জীবন তাদের সঙ্গে ভালোবাসার সম্বন্ধ।
হ্যারি বলল—আমি জানি ফ্রান্সিস কিন্তু তোমার জীবন সম্পর্কে এই ধারণা যে সবাই বোঝে না। প্রায় সকলেরই ঘরমুখী মন।
ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল ঠিক আছে। এখন তো আমরা ভূমধ্যসাগর অঞ্চল আছি। জাহাজ চালককে বলো দেশের দিকে জাহাজ চালাতে।
খবরটা জাহাজে রটে গেল। বন্ধু ভাইকিংরা লেগে পড়ল দড়িদড়া বাঁধা আর পাল খাটানোর কাজে। সন্ধে নাগাদ জাহাজে পাল খাটানো শেষ হলো। সমুদ্রে শো শো শব্দে বাতাস ছুটেছে। ঘড় ঘড়শব্দে জাহাজের নোঙর তোলা হলো। নজরদার পেড্রো জাহাজের মাস্তুলে জড়ানো দড়ি বেয়ে-বেয়ে মাস্তুলের মাথায় উঠে গেল। পালগুলো হাওয়ার তোড়ে ফুলে উঠল। জাহাজ চলল মাঝসমুদ্রের দিকে।
জাহাজ চলেছে। রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর ভাইকিংরা পালা করে জাহাজ পাহারা দিচ্ছে। আকাশে চাঁদের আলো বেশ উজ্জ্বল। বেশদূর পর্যন্ত সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। নজরদার পেড্রো নজর রাখছে চারিদিকে। যদি হঠাৎ কখনো জলদস্যুদের জাহাজ নজরে পড়ে তবে আগে থেকেই সাবধান হওয়া যাবে।
রাতটা নির্বিঘ্নেই কাটল। পরদিন সকালে বাতাস বেশ পড়ে গেল। জাহাজের গতিও কমে গেল। ফ্রান্সিসকে খবর দেওয়া হলো। ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে ডেক-এ উঠে এলো। জাহাজচালকের কাছে এলো। বলল-তোমার কী মনে হয়? বাতাসের গতি কমে গেল কেন?
জাহাজের হুইল ঘোরাতে ঘোরাতে চালক বলল—চারপাশের সমুদ্রের ঢেউ দেখে বাতাসের গতি বুঝে মনে হচ্ছে আমরা এখনও ভূমধ্যসাগর এলাকার মধ্যেই আছি। এই বাতাস প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া গুমোট ভাব এই সবকিছু ঝড়ের পূর্বাভাস বলে আমার সন্দেহ হচ্ছে।
ফ্রান্সিস বলল—তাহলে তো আমাদের সাবধান হতে হবে।
—ঝড়ের সঙ্গে লড়বার জন্য আমাদের তো তৈরি হতেই হবে—হ্যারি বলল।
জাহাজচালক বলল—যদি ঘন্টা তিনেকের মধ্যে ঝড় ছুটে না আসে তবে আবার বাতাসের বেগ বাড়বে, গুমোট ভাবটা আর থাকবে না।
কিন্তু ফ্রান্সিস সেই অনুমানের ওপর খুব ভরসা করতে পারল না। ও বিস্কোকে ডাকল। বিস্কো এলো। ফ্রান্সিস বলল—সবাইকে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে বলল। ঝড়ের আশঙ্কা আছে। সব পাল গুটিয়ে ফেলে তৈরি হও সবাই।
বিস্কো জাহাজের ডেক-এর বন্ধুদের সবাধান হ’তে বলল। কেবিনঘরে গিয়ে খবর দিল সবাইকে। রসুইঘরে গিয়ে রাঁধুনি বন্ধুদের তাড়া দিল তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করার জন্য। দুপুরের আগে খাওয়া-দাওয়া সেরে সব ভাইকিংরা তৈরি হতে লাগল যদি ঝড় আসে ভবে ঝড়ের সঙ্গে লড়বার জন্য।
আশ্চর্য। জাহাজচালকের আশঙ্কাই সত্যি হলো। একটু বেলা হতেই দক্ষিণ দিক থেকে হালকা মেঘের সারি উড়ে আসতে লাগল। একটু পরেই ভারি কালো মেঘের সারি ছুটে আসতে লাগল। কালো মেঘ জতে লাগল। সূর্য ঢাকা পড়ে গেল। তারপরই প্রচণ্ড বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল উন্মত্ত বাতাস।
ততক্ষণে ভাইকিংরা সব পাল গুটিয়ে ফেলেছে। নজরদার পেড্রো মাস্তুলের মাথা থেকে নেমে এসেছে। মাস্তুল ঘিরে, রেলিঙের ধারে-ধারে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে ভাইকিংরা। মাস্তুলের লম্বা টানা দড়ি, পাল খাটানোর কাঠে বাঁধা ঝোলানো দড়ি সব টেনে ধরে ভাইকিংরা ঝড়ের প্রথম প্রচণ্ড ঝাপ্টা সামলাল। জাহাজটা প্রথম ধাক্কায় কাত হয়ে গেলেও ভাইকিংদের অভিজ্ঞ হাতে টানা দড়ির টানে আবার সোজা হয়ে গেল। এবার মেঘের গায়ে আঁকাবাঁকা বিদ্যুতের আলো চমকাতে লাগল। ঘন ঘন বাজ পড়ার প্রচণ্ড শব্দের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। মাস্তুলের টানাদড়ি, রেলিঙের দড়িদড়া, পাল খাটানো কাঠের ঝোলানো দড়ি প্রাণপণে টেনে ধরে ভাইকিংরা ঝড়ের সঙ্গে লড়তে লাগল। জাহাজের দুলুনির সঙ্গে তাল রেখে ওরা জাহাজের সঙ্গেই উঠতে পড়তে লাগল। কিন্তু কেউ নিজের জায়গা ছাড়লো না।
ফ্রান্সিসদের ভাগ্য ভালো বলতে হবে। বিকেলের আগেই ঝড় থেমে গেল। হাওয়ার বেগ কমল। আকাশে আর মেঘ নেই। পশ্চিম দিকে সূর্য নেমে এসেছে। রোদের তেজও কমে এসেছে। ঝড়বৃষ্টি বেশিক্ষণ ছিল না। ঐটুকু সময়ই ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করে ভাইকিংরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ক্লান্তিতে ডেক-এর ওপরেই এখানে-ওখানে কেউ কেউ শুয়ে পড়েছে। কেউ কেউ বসে পড়েছে।
