বলো কি! হ্যারি পাথর দুটোর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল। মারিয়া আর সাভোনা দুজনেই পাথর দুটোর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কিছুই বুঝতে পারল না।
ফ্রান্সিস বলল, সাভোনা, রাজা ফ্রেডারিককে খবর দিন। এই পাথর দুটো তুলে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে।
কী করে বুঝলে যে-সাভোনা বলতে গেল। ফ্রান্সিস বলে উঠল, ভুলে যাবেন না এই গীর্জার ওপরটাই রাজা ফ্রেডারিক পুননির্মাণ করিয়েছিলেন। মেঝেটা তৈরি করিয়েছিলেন কাউন্ট রজার। এটা কিন্তু আজও অক্ষত আছে।
সাভোনা আর কোনো কথা না বলে ছুটল দুর্গের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনজন অমাত্যকে সঙ্গে নিয়ে রাজা ফ্রেডারিক এলেন। ফ্রান্সিসকে বললেন, আপনি কি নিশ্চিত এই লাল হলুদ পাথরের নীচেই আছে কাউন্ট রজারের গুপ্তধন?
হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলল, আর শুধু একটা কথার ধাঁধা। হৃদয় শ্বেতপাথর। এই দুটো পাথর খুলে তুললে যদি একটা শ্বেতপাথর পাওয়া যায় তাহলে সব ধাঁধার সমাধান হয়ে যাবে। গানে আছে, দূর কর এই দোসর। হৃদয় শ্বেত পাথর। . রাজা ফ্রেডারিকের নির্দেশে মোজেকের কয়েকজন কারিগরকে নিয়ে আসা হলো। ওরা বাঁকানো লোহার দু-তিনরকম যন্ত্র বের করে পাথর দুটো অল্পক্ষণের মধ্যেই আলগা করে ফেলল। যখন সবাই মিলে টেনে পাথর দুটো তুলে ফেলল, দেখা গেল একটা লম্ফা শ্বেতপাথরবসানো। মারিয়া খুশিতেহাততালি দিয়ে ফেলল। ফ্রান্সিস হেসে—বলল,হ্যারি, সাফল্য।
এবার শ্বেতপাথরটা কারিগর কয়েকজন বেশ কসরৎ করে তুলে ফেলল। দেখা গেল একটা লম্ফাটে ওক কাঠের বা’। তাতে সোনারুপোর লতাপাতার কাজ। এবার বা’টা তোলা হলো। ভারী বাটা রাখা হলো মেঝেয়। রাজা ফ্রেডারিক এগিয়ে এলেন। ওপরের কাঠের ঢাকনাটা আস্তে আস্তে তুললেন। দেখা গেল অনেক সোনার ছোটো ছোটো চাকতি সারা বাটায় ছড়ানো। সেগুলো রাজা ফ্রেডারিক কিছুটা সরাতেই দেখা গেল কতরকম দামী পাথর বসানো মিনেকরা অলঙ্কার। সোনা দিয়ে বাঁধানো আয়না। সোনার চিরুনি। সকালের রোদ পড়েছে ঐ সোনার চাকতি অলঙ্কারগুলোর ওপর। ঝিকিয়ে উঠছে সব। আয়না চিরুনি। রাজা অমাত্যরা কারিগররা সাভোনা সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো ঐ মহামূল্যবান গুপ্ত সম্পদের দিকে। শুধু হ্যারি ফ্রান্সিস মারিয়া খুব একটা অবাক হলো না। ফ্রান্সিসের উদ্ধার করা গুপধন ওরা তো আগেও দেখেছে। তবে মারিয়া তো মেয়ে। অলঙ্কারগুলো দেখতে লাগল। কী সুন্দর গড়ন অলঙ্কারগুলোর! ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। উদগত কান্নায় ওর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। ফ্রান্সিস হেসে বলল, হ্যারি এখনও কিন্তু আমাদের কিছু কাজ বাকি।
হ্যারির আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে ফ্রান্সিসরাজা ফ্রেডরিকের সামনে এলো। বলল মহামান্য রাজা, আমি আমার কর্তব্য করেছি। এবার আপনি আপনার প্রতিশ্রুতিরাখুন।
রাজা ফ্রেডারিক সে কথার জবাব দিলেন না। আশ্চর্য হয়ে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, তোমার এত আত্মবিশ্বাস!
ফ্রান্সিস হাসল। তারপর বলল,এবার তাহলে মোরাবিত আর সাভোনাকে মুক্তি দিন। রাজা আস্তেআস্তে বললেন, নিশ্চয়ই কিন্তু তোমরা এইগুপ্তধন উদ্ধার করেছো, তোমাদেরও তো কিছু প্রাপ্য আছে। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে হাসল। বলল,এই গুপ্তধন আপনাদের দেশের, আপনাদের। আমরা কিছু নেব না। এখানকার আদিম বাসিন্দা সারাসেন জাতি, মানে মোরাবিরা, তাদের কল্যাণের জন্যে আমাদের প্রাপ্য সব দিলাম। আমার অনুরোধ, আপনি ওদের ওপর সদয় হোন ওদের ভালোবাসুন। ওদের কল্যাণে আমাদের প্রাপ্য অংশ ব্যয় করুন। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল, এবার আমরা আমাদের জাহাজে ফিরে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস মারিয়া ও হ্যারির দিকে তাকাল।
তিনজনে চলল দুর্গের দিকে। পেছন ফিরে ফ্রান্সিস দেখল সাভোনা ছুটতে ছুটতে আসছে। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে পড়ল। সাভোনা ছুটে এসে ফ্রান্সিসের দু হাত জড়িয়ে ধরল। ওর চোখে জল সাভোনা কান্নাভেজা লগায় বলল, তুমি আমার সন্তানতুল্য। সেই তোমাকে আমি আমার অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। তোমার মতো মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।
ফ্রান্সিস হেসে বলল, অনেক আছে সাভোনা। আমরা জানি না তাই। আচ্ছা চলি—মোরাবিতের সঙ্গে দেখা হলো না। ওকে আমার অন্তরের স্নেহ জানাবেন।
ওদিকে সমস্তনগরে কাউন্ট রজারের গুপ্তধন আবিষ্কারের কথা ততক্ষণে রটে গেছে। যে কারিগররা পাথর তুলেছিল, তারাই বাইরে এসে বলেছে।
তিনজন দুর্গের বাইরে আসতে দেখে হাজার হাজার নগরবাসী ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরাও খবর শুনে ছুটে এসেছে। ফ্রান্সিসরা দুর্গ থেকে বেরোতেই বন্ধুরা ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। আনন্দে ধ্বনি দিল—ও হো হো।
উপস্থিত নগরবাসীরা ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। ওরা বুঝতে পারল না একজনকে নিয়ে এত লোক মাতামাতি করছে কেন?
যোদ্ধামূর্তি রহস্য
তখন বিকেল। ফ্রান্সিসদের জাহাজ পালমা বন্দরে নোঙর করে রয়েছে। ফ্রান্সিসের বীর—বন্ধু ভাইকিংরা অনেকেই জাহাজের ডেক-এ উঠে এসেছে। কেউ কেউ শুয়ে বিশ্রাম করছে। অনেকেই বসে আছে। জাহাজের রেলিঙ ধরে তাকিয়ে দেখছে পালমা বন্দরের ব্যস্ততা। ফ্রান্সিসদের জাহাজের কাছাকাছি আরো তিন-চারটে ভিনদেশি জাহাজ নোঙর করা। নানা দেশের পতাকা উড়ছে সেইসব জাহাজে। সেইসব জাহাজের বন্দরের কর্মীরা বাদাম তেলের পিপে তুলছে। ডুমুর, খুবানির বস্তা তুলছে জাহাজঘাট থেকে।
