—আমাদের দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে তুমি যাবে। পথে ঘোড়ার টানা শস্যের গাড়ি জোগাড় করবো হয়তো একটা ঘোড়া বা খচ্চর। কোনো কষ্ট হবে না তোমার। ফ্রান্সিস বুঝিয়ে বলল। মোরাবিত আর কোনো কথা বলল না। বিছানা ছেড়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। তখনই একজন বৃদ্ধ একটা জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে ছোট্ট ঘরটায় ঢুকল। ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় পোঁতা লোহার চোঙে জ্বলন্ত মোমবাতিটা বসিয়ে দিল। মোরাবিত মৃদুকণ্ঠে বৃদ্ধকে কী বলল। বৃদ্ধ মাথা ঝাঁকিয়ে বেরিয়ে গেল। মোরাবিত ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল-চলুন।
ওরা ছোট্ট ঘরটার বাইরে এসে দাঁড়াল। দেখল-মোরাবিতের বিদ্রোহী বন্ধুরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। মোরাবিত সবাইকে লক্ষ্য করে কী বলতে লাগল। হ্যারি বলল—মোরাবিত ওর বন্ধুদের বলছে ওরা যেন মনোবল না হারায়। ও সাভোনাকে সঙ্গে নিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে আসবে। আবার রাজা ফ্রেডারিকের সঙ্গে যুদ্ধ করবে ওরা। ওদের জয় হবেই। মোরাবিতের বিদ্রোহী বন্ধুরা খোলা তলোয়ার বর্শা উঁচু করে হৈ হৈ করে উঠল।
এবার ফ্রান্সিস হ্যারি আর মোরাবিত হাঁটতে শুরু করল। মোরাবিত বেশ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো ওকে সাহায্য করতে। মোরাবিত হেসে বলল—যতটা পারি হাঁটি। না পারলে তবেই আপনাদের সাহায্য নেবো। ফ্রোন্সিস হেসে মোরাবিতের কাঁধে আস্তে আস্তে চাপড় দিয়ে বলল—এই তো বীরপুরুষের মতো কথা।
সিমেতো নদীতে বাঁধা কাছি ধরে ধরে পার হ’তে মোরাবিতেরর বেশ কষ্টেই হ’ল। ফ্রান্সিস পেছন থেকে সর্বক্ষণ ওকে ধরে থেকে সাহায্য করল।
সিমেতো নদীর ওপারে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ওদের আবার যাত্রা শুরু হল।
একটা পাহাড়ি গ্রাম ছাড়তেই উত্তর পুব কোণায় চাঁদ উঠল। আধাভাঙা চাঁদ। মোটামুটি উজ্জ্বল। জ্যোৎস্না ছড়াল পাহাড়ি এলাকায় রাস্তায় দু’পাশের ফিকাস ওক গাছের মাথায়। মোরাবিত ভীষণ হাঁপাচ্ছে তখন। ফ্রান্সিস পিছিয়ে এসে মোরাবিতের বাঁ হাতটা কাঁধে তুলে নিল।
মোরাবিত হেসে বলল—সবটা যেতে পারলাম না। ফ্রান্সিস ও হেসে বলল—বন্ধু লড়াইটাই বড়ো কথা। জেতা হারাটা বড়ো কথা নয়। চলো-।
রাত বড়ল। চাঁদটা মাথার ওপার চলে এলো। এত রাতে পথে গাড়ি ঘোড়া কিছুই পেল না ওরা। হেঁটেই আসতে হল সারাটা পথ।
ম্যামিয়াস দুর্গে যখন ওরা পৌঁছল তখন শেষ রাত।
গই ছিল। ফ্রান্সিসরা ঘরে ঢুকতেই মারিয়া ছুটে এলো। ফ্রান্সিস বলল—পাহারাদার সৈন্যরা কোনো সন্দেহ করে নি তো?
—না। আমি দুপুরে খাওয়ার সময় বলেছি তোমরা কাতানিয়া গেছে। কাল সকালে ফিরবে। পাহারাদররা আর কিছু জিজ্ঞেস করে নি। মারিয়া বলল।
ফ্রান্সিস ক্লান্তমুখে একটু হাসল—মারিয়া—তোমায় উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করছি।
ওদের কথাবার্তায় সাভোনার তন্দ্রা ভেঙ্গে গেল। সাভোনা বিছানা ছেড়ে আস্তে আস্তে উঠে দাড়াঁল। মোরাবিত প্রায় ছুটে এসে সাভোনাকে জড়িয়ে ধরল। সাভোনাও ওকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল। মশালের আলোয় ফ্রান্সিসরা দেখল সাভোনার দুগাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। নিঃশব্দে কাঁদছে সাভোনা। মারিয়া মৃদুস্বরে–বলল-ফ্রান্সিস বোধহয় একেই বলে স্বর্গীয় দৃশ্য।
কথাটা হ্যারির কানে গেল। অভিভূত হ্যারি বলল ঠিক বলেছেন রাজকুমারী। ফ্রান্সিস কোনো কথাই বলতে পারল না।
পরদিন সকালের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিস বলল, সাভোনা চলুন গীর্জাটা দেখতে যাবো।
সবাই গীর্জার সামনে এলো। গীর্জার সিঁড়ি দিয়ে উঠল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ফ্রান্সিস বলল, গানটা কোথায় লেখা আছে?
সাভোনা আঙুল দিয়ে মেঝেটা দেখিয়ে বলল, ফুল লতা-পাতা নকশা দিয়ে এখানেই জড়িয়ে জড়িয়ে লেখা, লোভ হিংসায় কাতর—
পড়ুন তো। ফ্রান্সিস বলল। সাভোনা পড়তে লাগল। চার পঙক্তি পড়ে বলল, আরে পাঁচের পঙক্তিটা তো এখানেই লেখা নেই!
ফ্রান্সিস চমকে উঠল। বলল, ভালো করে দেখুন মেঝের কোথাও লেখা আছে কিনা!
সাভোনা মেঝের চারপাশে খুঁটিয়ে দেখল। বলল, উঁহু, এখানে তো লেখা নেই।
নিশ্চয়ই কোথাও লেখা আছে। বাইরের ছোটো বারন্দায়ও তো মোজেকের কাজ আছে। চলুন তো। ফ্রান্সিস বলল।
গীর্জাঘরের দরজার বাইরে ছোটো একটু বারান্দা। মেঝেয় মোজেকের কাজ। তবে খুব খুশি লতাপাতা ফুল জড়ানো নয়। এখানে দাঁড়িয়ে সাভোনা হাসল, এই এখানে লেখা—যেমন যীশুর ঘর-শেষ পঙক্তিটা।
ফ্রান্সিস ভাবল, যীশুর ঘর-তার মানে গীর্জা।
ফ্রান্সিস মেঝের উপর উবু হয়ে বসল। ফুল লতাপাতায় লেখাগুলো দেখতে লাগল। ও গভীরভাবে ভাবতে লাগল, বেশি পঙক্তিটা আলাদাভাবে এখানে লেখা কেন?ভাবতে ভাবতে যখন মেঝের এদিক-ওদিক দেখছে তখনই হঠাৎ দেখল লেখাটার ঠিক ওপরেই দুটো লম্বাটে পাথর বসানো, আর ঐ দুটো পাথরকে কেন্দ্র করেই ফুল-লতাপাতার নকশা আঁকা হয়েছে। পাথর দুটো রঙিন। রঙ কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে এসেছে। ভালো করে দেখতেই দেখল, একটা পাথরের রঙ হলুদ, অন্যটার লাল। সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিসের গানের দুটো পংক্তি মনে পড়ল—
হলুদ লাল পাথর
দূর কর এই দোসর
ফ্রান্সিস দ্রুত চিন্তা করতে লাগল—এই গানটার পঙক্তির পাঁচ এবং শেষেরটা আলাদা লেখা। অন্য কোনো গানে পাথরের কথা নেই। তবে এই পাথর দুটো তো হলুদ আর লাল রঙের। তবে কত দিন আগের। রঙ অনেক ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ওপরে ছাত আছে। তাই জল ঝড়ে রঙটা একেবারে মুছে যায় নি। ফ্রান্সিস আনন্দে চিৎকার করে উঠতে গেল। কিন্তু নিজেকে সংযত করল। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। হলুদ লাল পাথর দুটো দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যারি, কাউন্ট রজারের গুপ্তধন পোঁতা আছে এই হলুদ লাল পাথর দুটোর নীচে।
