যোদ্ধারা অস্ত্রনামাল। ওদেরমধ্যে বয়স্ক একজন এগিয়ে এলো। বলল-তোমরা কারা?
—আমরা ভাইকিং। আমরা মেরাবিতের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। হ্যারি বলল।
—কেন? যোদ্দটি বলল।
—সেটা মোরাবিতকেই বলবো। হ্যারি বলল।
—হুঁ—এসো। যোদ্ধাটি পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করল। অন্য যোদ্ধারাও চলল। পেছনে চলল ফ্র্যান্সিস আর হ্যারি
ন্যাড়া উঁচু টিলারের নীচেই ওরা দেখল প্রায় আট-দশটা ঘর। শুকনো ঘাসের ছাউনি। দেয়াল শুকনো ঘাস গেঁথে গেঁথে তৈরি করা হয়েছে। ওরা ঘরগুলোর কাছে এলো। বয়স্ক যোদ্ধাটি একটা ঘরে ঢুকে পড়ল। একটু পরেই বেরিয়ে এসে বলল—এই ঘরে এসো।
ফ্রান্সিস ও হ্যারি মাথা নিচু করে ঘরটায় ঢুকল। ঘরটায় আলো জ্বালা হয় নি। অন্ধকারে ওরা আন্দাজেই বুঝল মোটা কাপড় পাতা বিছানায় কে বসে আছে। হ্যারি ডাকল—মোরাবিত। মোরাবিত বিছানা ছেড়ে উঠল। একটু খুঁড়িয়ে কয়েক পা এসে হাত বাড়িয়ে ফ্রান্সিসের ডান হাতটা ধরল। ফ্রান্সিস হেসে ওর হাতে চাপা দিল। মোরাবিত এবার হ্যারির হাতও ধরল। হাতে চাপ দিল। হ্যারি বলল—তোমার হাঁটুর ঘাটা শুকোয় নি?
— শুকিয়ে এসেছিল পালাতে গিয়ে পাথরে ঘষটানি লেগে হাঁটতে একটু অসুবিধে হচ্ছে। মোরাবিত বলল।
—তুমি বিছানায় বসো। হ্যারি বলল।
—আপনারাও বসুন। মোরাবিত বসল। মোরাবিত বলল—আপনাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করি।
—না—না—হ্যারি বলল—আমরা আসার পথে খেয়ে নিয়েছি।
ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি-মোরাবিকে বলো ও পালিয়ে এলো কেন?
হ্যারি সেটা মোরাবিতকে বলল।
মোরাবিত একটু চুপ করে থেকে বলল—আমার বিদ্রোহী বন্ধুরা এখানে লিপারি দ্বীপ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে কী কষ্টের জীবন কাটাচ্ছে ওরা। এইসব জেনে বুঝেও আমি রাজার দুর্গে পেটপুরে খেয়ে ঘুমিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে সময় কাটাবো—অসম্ভব। তাই আমি পালিয়ে এসেছি। আবার সব বিদ্রোহীকে একত্র করবো। অস্ত্র সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাবো। তারপর চুড়ান্ত যুদ্ধে নামবো ঐ ভিনদেশি রাজা ফ্রেডারিকের বিরুদ্ধে। হ্যারি মোরাবিতের কথাগুলো ফ্রান্সিসকে বলল।
একটু চুপ করে থেকে ফ্রান্সিস বলল—আমি যা বলছি তা মোরাবিকে বুঝিয়ে দাও। ফ্রান্সিস বলতে লাগল—মোরাবিত তুমি সাভোনা খাঁটি দেশপ্রমিক এসম্বন্ধে আমার মনে বিন্ধুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি বলবো-তুমি এভাবে পালিয়ে এসে ভালো করো নি।
কথাটা শুনে মোরাবিতের মুখ গম্ভীর হল। একটু তিক্তকণ্ঠে ও বলল—তার মানে আমি পালিয়ে আসায় আপনারা বিপদে পড়েছেন। কথাটা বুঝে নিল ফ্রান্সিস কথাটা ফ্রান্সিসের মনে খুব লাগল। দুঃখার্তরে ও বলল শুধু আমাদের বিপদ হলে কিছু বলতাম না। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন তোমাদেরই সাভোনা-সাভোনাকেও আমরা মুক্ত করে নিয়ে আসবো। মোরাবিত বলল। কথাটা বুঝে নিয়ে ফ্রান্সিস এবার বলল—মোরাবিত রাজা ফ্রেডারিককে আমি কী বলেছিলাম সেটা আমার ভাষা জানোনা বলেই তুমি বোঝে নি। কী বলেছিলেন আপনি? মোরাবিত বলল।
-রাজাকে বলেছিলাম যদি কাউন্ট রজারের গুপ্তধন আবিষ্কার করতে না পারি তাহলে তোমাদের দুজনের সঙ্গে আমিও ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যুবরণ করবো। মোরাবিকে ফ্রান্সিসের এই সঙ্কল্পের কথা সাভোনা বলেছিলেন। কিন্তু মোরাবিত তখন বেশ অসুস্থ। সব কথা বোঝবার মতো মনের অবস্থা ওর ছিল না। মোরাবিত ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকাল। ঘরটায় তখনও আলো জ্বালা হয় নি। ফ্রান্সিসের মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেল না। মোরাবিত কোনো কথা বলল না। চুপ করে ফ্রান্সিসের এই সঙ্কল্পের কথা ভাবতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল—দেখো মোরাবিত—তোমাদের দেশের সমস্যা তোমরা যেভাবে পারো মেটাও আমাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু আমরা এখানে রয়েছি কাউন্ট রজারের নিখোঁজ গুপ্তধন উদ্ধারের জন্যে। এখন তোমরা দুজনে পালিয়ে এলে রাজা ফ্রেডারিক আমাদের বন্দি করবেন। কারণ তোমাদের সব দায়িত্ব আমি নিয়েছি। তাহলেই বুঝতে পারছো যে কাজের জন্যে আমরা দেশে ফিরলাম না সেই কাজটাই তো ভণ্ডুল হয়ে যাবে। মাঝখান থেকে আমার বন্ধুরা আমাদের মুক্ত করতে লড়াইয়ে নামবে অযথা রক্তপাত মৃত্যু। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল—একটু ভেবে দেখো মোরাবিত এখন অন্ততঃ আমাকে সুযোগ দাও যাতে আমি নিশ্চিন্ত মনে গুপ্তধনের খোঁজ বের করতে পারি। গুপ্তধন খুঁজে বের করতে পারলে রাজা ফ্রেডারিক তোমাদের মুক্তি দিতে বাধ্য। এই শর্ত আমি রাজাকে দিয়ে আগেই করিয়ে নিয়েছি। হ্যারি ফ্রান্সিসের কথাগুলো বুঝিয়ে বলতে মোরাবিত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—ঠিক আছে—”আমি দুর্গে ফিরে যাবো। সাভোনা যা বলবেন আমি তাই করবো।
—বেশ তোমাকে আজই ফিরে যেতে হবে। এক্ষুণি। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি কথাটা বুঝিয়ে বলতেই মোরাবিত বলে উঠল-বলেন কি! আমি এখনও ভালো করে হাঁটতে পারছি না। কয়েকদিন ওষুধ বিশ্রাম। কথাটা বুঝে নিয়ে ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল—না—তোমাকে এক্ষুণি আমাদের সঙ্গে ম্যামিয়াস দুর্গে ফিরে যেতে হবে।
—আপনি আমাকে এক্ষুণি যেতে বলেছেন কেন? মোরাবিত জানতে চাইল।
—কারণ—ফ্রান্সিস বলল—তুমি পালিয়ে গেছো এটা জানাজানি হয়ে গেল রাজা ফ্রেডারিক সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কয়েদ ঘরে বন্দি করে রাখবেন। তখন সাভোনাকেও তোমরা মুক্ত করতে পারবেনা। আমাদের মুক্তির আশা না হয় ছেড়েই দিলাম। মোরাবিত একটুক্ষণ ভাবল। বলল—পিরবো এতটা পথ হেঁটে যেতে?
