মারিয়া বলল—আমিও যাবো।
ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল–না মারিয়া। যদি আমরা দুজন বিপদে পড়ি তুমি অন্ততঃ জাহাজে বন্ধুদের সে খবরটা দিতে পারবে। তুমিও আমাদের সঙ্গে গেলে সে উপায় আর থাকবেনা।
সাভোনা বলল—চলো-আমিও তোমাদের সঙ্গে যাই।
না সাভোনা—ফ্রান্সিস বলল—শুধু মারিয়া একা এখানে থাকলে রাজার মনে সন্দেহ হতে পারে। মোরাবিত পালিয়েছে এটা যেন এখানে কেউ না জানে। তুমি থাকলে কারো মনে সন্দেহ জাগবেনা। তুমি আর মারিয়া থাকো।
ফ্রান্সিস বলল—মারিয়া—যদি দেখো আমরা কাল পরশুর মধ্যে ফিরে এলাম না তাহলে জাহাজে বন্ধুদের খবর দিও। সাভোনাকে নিয়ে আমাদের খুঁজতে যেও।
গত কয়েকদিনের মতো নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে ফ্রান্সিস আর হ্যারি দুর্গের সদর দেউড়ির দিকে চলল। ওরা এসময় বাইরে বেরোয় এটা পাহারাদারদের দেখেছে। ওরা কোনো সন্দেহ করল না। ওদের দেখাশুনো করার জন্যে ওদের কাজে সাহায্য করার জন্যে রাজা ফ্রেডারিক যে দুজন সৈন্যকে রেখেছিলেন তারা এগিয়ে এলো ফ্রান্সিসদের দিকে। হ্যারি বলল—ভাই—আজকে আর তোমাদের দরকার নেই। আজ আমরা নিজেরাই সব খোঁজ খবর করবো। গাড়িরও দরকার নেই। সৈন্য দুজন ফিরে গেল।
দুর্গের বাইরে এসে ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল—হ্যারি—জোরে পা চালাও। দুজনে দ্রুতপায়ে দক্ষিণমুখো রাস্তাটা ধরে হাঁটতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বসতি এলাকা ছেড়ে ওরা একটা পাহাড়ি এলাকায় এলো। উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ ধরে চলল।
দুপুর হল। সূর্য মাথার ওপরে। বেশ রোদের তেজ। হেঁটে চলল ওরা।
কিছু পরেই একটা পাহাড়ি গ্রাম পেল। পাথরের বাড়িঘর। ঘাসের ছাউনি। মাত্র কয়েকটা ঘরবাড়ি। একটা বাড়ির ঘরের সামনে চোট গাছের নীচে একজন বয়স্ক লোক পাথরের ওপর বসেছিল। ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি—জিজ্ঞেস করো তো—সিমেতো নদী কতদূরে?
হ্যারি লোকটির কাছে গেল। বলল—আচ্ছা সিমেতো নদী এখান থেকে কতদূর?
লোকটি একটু পাহাড়ি টানের ভাষায় বলল—আর বেশি দূরে না কাছেই। তারপর ফ্রান্সিসদের পোশাক দেখে বলল—মনে হচ্ছে আপনার বিদেশি।
—হ্যাঁ আমরা ভাইকিং জাতি। হ্যারি বলল।
—এত বেলা হয়েছে—বিদেশি আপনারা নিশ্চয়ই খিদে পেযেছে লোকটি বলল। হ্যারি বলল—ফ্রান্সিস—বলছে আমরা ক্ষুধার্ত কিনা।
ফ্রান্সিস হেসে বলল—বলো যে প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। হ্যারি হেসে বলল সেকথা। লোকটি পাথরের আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি শুরু করে দিল। ঘর থেকে বৌঝিরা বেরিয়ে এলো। লোকটি তাদের কী বলল। তারপর ফ্রান্সিসদের বসতে ইঙ্গিত করল।
ক্লান্ত হ্যারি চেস্টনাট গাছের ছায়ায় লম্যাটে পাথরটায় শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির মেয়েরা বড়ো পাতায় রুটি পাখির মাংসের ঝোল নিয়ে এলো। ফ্রান্সিস হ্যারি হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে ধন্যবাদ জানাল। যা খিদে পেয়েছিল। হাপুস হুপুস করে খেয়ে নিল।
খেয়েদেয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে ওরা চলল সিমেতে নদীর উদ্দেশ্যে। হাঁটতে হাঁটতে ফ্রান্সিস বলল হ্যারি—দেখো এই যে বিদেশ বিভুইয়ে আমরা আতিথ্য পেলাম ক্ষুধার মুখে খাদ্য পেলাম—অচেনা অজানা মানুষের ভালোবাসা পেলাম আপনার জীবনে এর মূল্য কি কম?
হ্যারি হেসে বলল—মোটেইনা।
প্রায় ঘন্টাখানেক পরে ওরা সিমেতো নদীর ধারে পৌঁছল। নদীটা খুব বড়ো নয়। পাহাড়ি নদী। খুব স্রোত। এদিকটায় প্রচুর গাছপালা। নদীর ওপারেও ঘন বন জঙ্গল। তবে গাছপালা খুব দীর্ঘ নয়। গাছগাছালির নীচে বুনো ঘাস। লম্ফা লম্ফা।
এবার সমস্যা এই খরস্রোতা নদী পার হওয়া যাবে কী করে। তখনই ওরা দেখল নদীটার এপারের একটা গাছে মোটা কাছি বাঁধা। কাছিটা টেনে নিয়ে ওপারের একটা গাছে বাঁধা হয়েছে। কাছি নদীর জলের কিছু ওপরে ঝুলছে। ওরা বুঝল এই কছি ধরে ধরেই এখানকার লোকেরা নদীটি পারাপার করে। যে প্রচণ্ড স্রোত তাতে পা ঠিক রাখা অসম্ভব। দড়ি ধরেই এই স্রোতকে ঠেকাতে হয়।
ফ্রান্সিস হ্যারি—দুহাতে দড়ি ধরে নদীর জলে নামল। নদীর জল বেশ ঠাণ্ডা। আস্তে আস্তে দড়ি ধরে ধরে নদীর স্রোতধারার মধ্যে দিয়ে পেছল পাথরগুলিতে পা রেখে রেখে বেশ কসরৎ করে নদী পার হল দুজনে। দড়ি না ধরে পার হওয়া অসম্ভব। প্রচণ্ড স্রোতের ধাক্কায় কোথায় ছিটকে যাবে তার ঠিক নেই।
ওপরে পৌঁছে কিছুক্ষণ পরিশ্রান্ত দুজনে বিশ্রাম করল। তারপর বনের মধে ঢুকল। বনের গাছপালর নীচে লম্ফা লজ্জ্বা ঘাস। তার মধ্যে দিয়ে ওরা চলল।
আসার সময় সাভোনা বলে দিয়েছিল ডানদিকে ছাড়া ছাড়া তিনটে উঁচু টিলামতো পড়বে। একেবারে তৃণশূন্য টিলাটার নীচেই বিদ্রোহীদের পুরানো আস্তানা।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি চলল। কিছুই যেতেই ডানদিকে দেখল উঁচু টিলা একটা। টিলাটা সবুজ ঘাসে ঢাকা। এই টিলাটা নয়।
আবার চলল দুজনে। বেশ কিছুটা ঘাসের জঙ্গল ঠেলে যাবার পর দেখল ডানদিকে বেশ কিছুটা দূরে আর একটা উঁচু টিলা। আশ্চর্য! টিলাটা একেবারে তৃণশূন্য। শুধু ছাই রঙা পাথরের। বিকেলের নরম আলো টিলাটার মাথায় পড়েছে। এটার নীচেই কোথাও আছে বিদ্রোহীদের আস্তানা।
ওরা টিলাটি লক্ষ্য করে চলল। বিকেল হয়ে গেছে। গাছগাছালির নীচে এর মধ্যেই অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে। ওরা ঠাহর করে করে চলল।
হঠাৎ চারপাশের ঘাসের বনে ছড় ছড় শব্দ উঠল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল—ওদের চারপাশে ঘাসের জঙ্গলের আড়াল থেকে আট দশজন যোদ্ধা খোলা তলোয়ার বর্শা হাতে উঠে দাঁড়াল। হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল—লড়াইনয়। আমরা সাভোনা মোরাবিতের বন্ধু। একটু থেমে আবার বলল কথাটা। ফ্রান্সিস ভেবে আশ্বস্ত হল যে সঙ্গে হ্যারিকে এনে বুদ্ধির কাজই করেছে। ও একা লে ল্যাতিন ভাষা বলতে পারতো না। কাজেই প্রাণ সংশয় হত।
