অন্ধকারে নেমে এলো। সদর দেউড়ির দিকে লুকিয়ে দেখল চার-পাঁচজন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিচ্ছে। এ ম্যামিয়েস দুর্গে এখন রাজা ফ্রেডারিক আছেন। কাজেই জোর পাহারার ব্যবস্থা এখন। পাহারাদারদের নজর এড়িয়ে দেউড়ি দিয়ে পালানো অসম্ভব। মোরাবিত চারদিকে তাকিয়ে ভালো করে দেখতে লাগল। পাথরের উঁচু ঘেরা দেয়ালের প্রায় সব জায়গাতেই মশাল জ্বলছে। দেখতে দেখতে লক্ষ্য করল দক্ষিণ কোণায় দুটো মশাল নিবু নিবু। জায়গাটা বেশ অন্ধকার। নীচে কুয়াশাও ছড়িয়ে আছে ওদিকে।
মোরাবিত অন্ধকারে পাথর বাঁধানো রেবুকে পেতে শুয়ে পড়ল। তারপর শরীর টেনে টেনে চলল ঐ দক্ষিণ কোণায় দেয়ালের দিকে। হাঁটুর বুকের ঘা তখনও সম্পূর্ণ সারে নি। একটা কোণা উঁচু পাথরে হাঁটুটা ঘষটে গেল। মোরাবিত প্রচণ্ড বুকের যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠতে গিয়ে মুখে জোরে হাতচাপা দিল। একটু থেমে হাঁপাতে হাঁপাতে যন্ত্রণা সহ্য করতে লাগল। একটু পরে যন্ত্রণা একটু করল। প্রায় অন্ধকারে ডান হাঁটুর দিকে তাকিয়ে বুঝল রক্ত পড়ছে। ও মুখ বুজে যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে আবার বুক হিঁচড়ে চলল।
দেয়ালের কাছে এসে একটু বিশ্রাম নিল। ভীষণ হাঁপাচ্ছে তখন। একটু পরে হাঁপ ধরা ভাবটা কমল।
মোরাবিত উঠে দাঁড়াল। তারপর বেশ অন্ধকারে দেয়ালের পাথরের খাঁজে খাঁজে পা রেখে বেশ কষ্ট করে দেয়ালের ওপরে উঠেই ঘুরে দেয়ালের ওপাশে পাথুরে রাস্তায় লফিয়ে নামল। দ্রুত নামতে গিয়ে ও লক্ষ্যই করে নি যে দেয়ালের বাইরেও কাছাকাছি তিন-চারজন পাহারাদার খোলা তলোয়ার হাতে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিচ্ছে। রাজা ফ্রেডারিক আছেন দুর্গে। কাজেই কড়া পাহারা চলছে।
পাথুরে রাস্তায় লাফিয়ে পড়তেইশব্দ হল। দুজন পাহারাদার সেই শব্দ শুনল। একজন চিৎকার করে উঠল কে? দুজনেই অল্প অন্ধকারে খোল তলোয়ার হাতে ছুটে আসতে লাগল মোরাবিতের দিকে।
মোরাবিতের সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা পেরিয়ে পড়িমরি ছুটল সামনের অন্ধকার গলিটা লক্ষ্য করে। পাহারাদার দুজন ততক্ষণে চিৎকার করে অন্য পাহারাদারদের ডাকতে ডাকতে ছুটে আসছে। তারা কাছাকাছি আসার আগেই মোরাবিত গলির অন্ধকারে মিশে গেল। ছুটল প্রাণপণে। আস্তে আস্তে পাহারাদারদের ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকির শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল।
হঠাৎ হ্যারি উত্তেজিত স্বরে ডাকাডাকিতে ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও দ্রুত বিছানায় উঠে বসল। হ্যারি বলল—ফ্রান্সিস—সর্বনাশ হয়েছে। মোরাবিত পালিয়ে গেছে।
-বলো কি। ফ্রান্সিস মোরাবিতের শোবার জায়গাটার দিকে তাকাল। দেখল ফাঁকা। পাশেই সাভোনা মাথা নিচু করে বসে আছে। সাভোনা চুপ করে আছে। তখনই মারিয়ারও ঘুম ভেঙে গেল। মশালের আলোয় মারিয়া এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল—ঢালা বিছানার কোথাও মোরাবিত নেই। মারিয়া বেশ ঘাবড়ে গেল। মোরাবিত পালিয়ে গিয়ে ওদের ভীষণ বিপদে ফেলে গেল।
ফ্রান্সিস কদিন যাবই লক্ষ্য করছিল মোরাবিত চুপ চাপ শুয়ে বসে থাকে। কে জানে কী ভাবে। কোনো কথাও বলতো না। সাভোনার সঙ্গেও কথা বলতো না। ওরা বাইরে বেরুতো। মেরাবিতও ওদের সঙ্গে প্রথমদিন বেরিয়েছিল। পালাবার চেষ্টা করেছিল। ফ্রান্সিসের তৎপরতায় পারেনি। তারপর থেকেই মোরাবিত কেমন নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল। ওদের সঙ্গে বাইরেও বেরুতো না।
ফ্রান্সিস ডাকল—সাভোনা। সাভোনা মুখ তুলে ওর দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস বলল মোরাবিত কেন পালালো বলতে পারবে। সাভোনা মাথা এপাশ-ওপাশ করল।
—মোরাবিত তো আমাদের ভীষণ সমস্যায় ফেলে গেল। হ্যাঁর বলল।
ফ্রান্সিস বলল—উপায় নেইমোরাবিকে ধরে নিয়ে আসতে হবে।
—কিন্তু মোরাবিত কোথায় গেছে তার হদিশ পাবে কী করে? মারিয়া বলল।
ফ্রান্সিস বলল—সাভোনা বলুন তো মোরাবিত পালিয়ে কোথায় যেতে পারে?
সাভোনা আস্তে আস্তে বলল—ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে লিপারি দ্বীপে যায় নি। ওখানকার ঘাঁটি এলাইমো নিশ্চয়ই এতদিন ভেঙে দিয়েছে।
—ঐ দ্বীপ ছাড়া আর কোথায় মোরাবিত আত্মগোপন করেছে বলে আপনার মনে হয়। ফ্রান্সিস বলল।
—এখান থেকে মাইল দশেক দক্ষিণে আছে সিমমাতো নদী। নদীর ওপারে জঙ্গলের মধ্যে আমরা প্রথমে ঘাঁটি গেড়েছিলাম। পরে এলইমোর সৈন্যদের তাড়া খেয়ে আমরা লিপারি দ্বীপে ঘাঁটি সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। লিপারিতে আমরা যুদ্ধ হেরে গেছি। তাড়া খেয়ে বিদ্রোহবন্ধুরা নিশ্চয়ই পুরোনো আস্তানায় ফিরে এসেছে। মোরাবিত নিশ্চয়ই ঐ আস্তানায় আত্মগোপন করেছে। ফ্রান্সিস বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল—ঐ সিমেতো পেরিয়ে জঙ্গলের আস্তানায় যেতে হবে। পাথরের জানালা দিয়ে ফ্রান্সিস বাইরে তাকাল। দেখল—বাইরেটায় আর অন্ধকার তেমন নেই। তার মানে রাত শেষ হয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস ঘরের পাথরের মেঝেয় পায়চারি করতে লাগল।
ভোর হল। বেলা একটু বাড়ল। দুজন সৈন্য ওদের সকালের খাবার নিয়ে এলো। কাঠের থালায় গোল করে রুটি আর নানা সজিমেশানো ঝোলমতো। ফ্রান্সিসরা বিছানায় বসে খেয়ে নিল।
এঁটো থালা নিয়ে সৈন্যরা চলে গেল। ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি—চললা সিমেতো নদীর ওপারে জঙ্গলে যাবো। মোরাবিতকে খুঁজে বের করতেই হবে। হ্যারি উঠে দাঁড়াল। কোমরবন্ধনী ভালো করে এঁটে যাবার জন্যে তৈরি হল।
