ম্যামিয়েস দুর্গে ফিরে আসতে একটু রাতই হলো। রাতের খাওয়াদাওয়ার পর সবাই শুয়ে পড়ল। হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস, কিছু হদিস করতে পারলে?
না। তবে এখানকার গীর্জাটা কালকে ভালো করে দেখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া বলল, আমার মনে হয় গানগুলোর মধ্যেই কোনো সূক্ষ্ম ইঙ্গিত আছে।
হ্যারি বলল, আচ্ছা সাভোনা, কাউন্ট রজারের এরকম আরো গান আছে?
হ্যাঁ, আছে, তবে সেসবের এখন খুব বেশি চল নেই। গীর্জার মেঝেয় লেখা গানগুলোরই চল বেশি। প্রায় একশো বছর ধরে সব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়।
ফ্রান্সিস বলল, এই গানই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই গান দুটোই সকলে জানে। গীর্জার মেঝেতেও লেখা রয়েছে। ম্যামিয়ে দুর্গের গীর্জায় তো আগে সকলেই যেতে পারতো।
আর সবই ঘুমিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস তখন জেগে। নানা চিন্তা মাথায়। তার ওপর কাউন্ট রজারের গুপ্তধন উদ্ধারের জন্য ও জীবনটাই বাজি ধরেছে। ভাবতে ভাবতেই একসময় ওর দুচোখে ঘুম জড়িয়ে এলো।
গভীর রাতে হঠাৎ ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। কে যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ফ্রান্সিস উঠে বসল। ঘরে মশাল জ্বলছে। তার আলোয় দেখল হ্যারি শুয়ে চোখে দুহাত চাপা দিয়ে ফোঁপাচ্ছে। ফ্রান্সিস হ্যারির গায়ে হাত রাখল। আস্তে ডাকল, হ্যারি হ্যারির ফোঁপানি বন্ধ হলো ফ্রান্সিস বলল, কী হয়েছে?
হ্যারি কান্নাভেজা গলায় বলল, তুমি এভাবে নিজের জীবনটাকে বাজি ধরলে? একবার কারো কথা ভাবলে না? তোমার বাবা, মারিয়া, আমরা—কারো কথা না?
ওদের কথাবার্তায় মারিয়ারও ঘুম ভেঙে গেল। মারিয়া বলে উঠল, হ্যারি, কেঁদো না তোমাকে কাঁদতে দেখলে ফ্রান্সিসের মন দুর্বল হয়ে পড়বে। দেখো আমি তো কাঁদছিনা।
সাভোনার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ওদের কথাবার্তা শুনে সাভোনা আস্তে আস্তে বলল, সত্যি তোমাদের মধ্যে এমন ভালোবাসা কমই দেখা যায়। একটু থেমে বলল, মানুষকে ভালোবাসা মানেই ঈশ্বরকে ভালোবাসা।
ফ্রান্সিস হেসে বলল, সাভোনা, কাউন্ট রজারের গানটা শোনান না!
এত রাত্রে গান? সাভোনা হেসে বলল।
করুন না। হ্যারি বলল। সাভোনা শুয়েই আস্তে আস্তে গাইতে লাগল—
লোভ হিংসায় কাতর
হলুদ লাল পাথর
দূর কর এই দোসর
হৃদয় শ্বেতপাথর
যেমন যীশুর ঘর।
গান শেষ হলো। হঠাৎ ফ্রান্সিস বলল, আচ্ছা সাভোনা, লক্ষ্য করেছেন আর দুটো গানের পঙক্তি চারটে। শুধু এই গানটা মানে যেটা এখানকার গীর্জার মেঝেতে লেখা সেই গানটার কিন্তু পঙক্তি পাঁচটা।
সাভোনা একটু হিসেব করল। হেসে বলল, ঠিক বলছো। আমি তো কোনোদিন খেয়াল করিনি। ওদের মধ্যে আর কথাবার্তা হলো না। ঘুমিয়ে পড়ল ওরা।
মোরাবিত চুপ করে শুয়ে এতক্ষণ সাভোনার গান শুনছিল। ওর মন একেই ভালো নেই। তার ওপর এই গানটা শুনে ওর মন আরো খারাপ হয়ে গেল। কত কাজ এখন। লিপারি দ্বীপে লড়াইয়ে হেরে গেছে ওরা। বেশ কয়েকজন বিদ্রোহী বন্ধু লড়াইয়ে প্রাণ দিয়েছে। ও নিজেও রাজা ফ্রেডারিকের সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করতে চেয়েছিল শেষ পর্যন্ত। কিন্তু সাভোনা ওকে জোর করে লড়াই থেকে নিরস্ত করেছিল। ভীষণভাবে আহত ওকে অনেক কষ্টে সাভোনা প্রায় বুকে জড়িয়ে ধরে লড়াইয়ের ময়দান থেকে সরিয়ে নিয়ে এসেছিল। মোরাবিত বার বার নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করেছে। বলেছে-সাভোনা বন্ধুদের এভাবে ফেলে রেখে আমি পালাবো না। সাভোনা বলেছে—মোরাবিত—তোমাকে বেঁচে থাকেতই হবে। এই লড়াই আমরা হেরে গেছি। তুমি প্রাণ দিলেও এই লড়াইয়ে আমরা জিতবো না। কিন্তু তুমি বেঁচে থাকলে আবার আমরা বিদ্রোহ চালিয়ে যেতে পরবো। আরো দেশবাসীকে একত্র করতে পারবো। সময় সুযোগ বুঝে আমরা আরো শক্তি সংগ্রহ করে রাজা ফ্রেডারিককে বিদেশি নর্মানদের অত্যাচারী ভূস্বামীদের সিসিলি থেকে তাড়াতে পারবো। কিন্তু তুমি মরে গেলে সব শেষ হয়ে যাবে। তোমাকে বেঁচে থাকতেই হবে। সাভোনা অনেক কষ্টে ওকে সমুদ্রতীরে নিয়ে আসতে পেরেছিল। তারপর নৌকোয় লুকিয়ে। পালাতে পেরেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য ধরা পড়তেই হল।
মোরাবিত ঘাসের বিছানায় শুয়ে শুয়ে এসব সাত-পাঁচ ভাবছিল। ওর ঘুম আসছিল না। ঘরের জ্বলন্ত মশালের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই মোরাবিত সিদ্ধান্ত নিল—পালাতে হবে। সিমেতো নদীর ওপারের জঙ্গলে বিদ্রোহীদের পুরানো আস্তানায় যাবে। আবার সব বিদ্রোহী সঙ্গীসাথীদের একত্র করবে। এলাকার আরো লোক একত্র করবে। অস্ত্র তৈরি করবে।
সবাইকে তালিম দিয়ে রাজা ফ্রেডারিকের সৈন্যদের চেয়েও শক্তিশালী নিপুণ যোদ্ধা তৈরি করবে। তারপর আক্রমণ করবে ম্যামিয়েস দুর্গ। অনেক কাজ—অনেক কাজ—মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে মোরাবিত মনে মনে বার বার বলল কথাটা।
রাত বাড়তে লাগল। মোরাবিরে চোখে ঘুম নেই। ও দুচোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে রইল।
শেষ রাতের দিকে মোরাবিতের একটু তন্দ্রামতো এসেছিল। হঠাৎ তন্দ্রা ছুটে গেল। মোরাবিত বিছানায় উঠে বসল। দেখল—সাভোনা ফ্রান্সিসরা গভীর ঘুমে। একবার ভাবল-সাভোনাকে পালাবার কথা বলি। পরক্ষণেই সাবধান হল। নাসাভোনাকে কিছু বলা চলবে না। সাভোনা কিছুতেই ওকে এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিতে দেবে না।
মোরাবিত আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। পা টিপে টিবে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। পাথরের বারন্দায় মশালের আলোয় দেখল একজন সৈন্য পাথরের দেয়ালে পিঠ রেখে ঝিমুচ্ছে। মোরাবিত নিঃশব্দে দেয়ালে পিঠ ঘষে ঘষে মশালের আলোর এলাকা থেকে বাইরে
