ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল—আমাদের এক বন্ধু ভেক্তর আমাদের জাহাজে কিছু বন্ধুদের নিয়ে দল পাকিয়েছিল। তাদের বুঝিয়েছিল আমি কাউন্ট রজারের গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারবো না। তবে কেন ওরা এই বিদেশ বিভূঁইয়ে পড়ে থাকবে? ফ্রান্সিস একটু থেমে বলল মহামান্য রাজা আমরা জাহাজে জাহাজে দূর দূর দেশে দ্বীপে ঘুরে সমুদ্রযাত্রার একঘেয়েমির মধ্যে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে মাটির প্রতি টান বিশেষ করে স্বদেশে ফেরার টান অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। কাজেই ভেক্তর এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় এবং আমাদের কিছু বন্ধুকে ভুল বোঝায়। ফ্রান্সিস থামল।
–এখন ভেক্তর কোথায় আছে? রাজা ফ্রেডারিক জানতে চাইলেন।
—ভেক্তর লড়াই করতে গিয়ে মারা গেছে। তার দলের বন্ধুরা কেউ মারা গেছে কেউ জাহাজ থেকে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে। তাদেরই আহত দুজন আপনার সন্মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস বলল।
—হুঁ। বলো কী বলছিলে। রাজা ফ্রেডারিক বললেন।
—আপনার যে প্রহরী সৈন্যরা আমাদের জাহাজে থেকে পাহারা দিচ্ছিল ভেক্তর তাদের হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে মাত্র দুজন বন্ধুকে নিয়ে। তারা কেউ আর বেঁচে নেই। আপনার প্রহরী সৈন্যদের খাদ্যে বিষ মিশিয়ে ভেক্তর আর দুজন বন্ধু তাদের হত্যা করে। এই নির্মমতা ক্ষমার অযোগ্য। ফ্রান্সিস বলল।
-ঠিক। রাজা ফ্রেডারিক মাথা একটু ঝাঁকিয়ে বললেন।
—এইবার মহামান্য রাজা আপনার সুবিচারের জন্যে কয়েকটা কথা বলছি। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল আপনি দেখলেন আমি যদিনা বলে দিতাম তাহলে আপনারা কেউই জানতে পারতেন না আপনার আটজন প্রহরী সৈন্যের কীভাবে মৃত্যু হয়েছিল। আমি অনায়াসে সেই সত্য গোপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। তাহলেই আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন—আমি যা সত্য তা বলি এব? স্বীকার করি। কোনো অবস্থাতেই সত্য আমি গোপন করিনা। ফ্রান্সিস থামল। রাজা ফ্রেড’কে পাশের অমাত্যদের ফ্রান্সিসদের কথাগুলি লো ল্যাতিন ভাষায় বুঝিয়ে বললেন। অমাত্যরা ফ্রান্সিসদের স্পেনীয় ভাষা বুঝতে পারছিলেন না। তারা সব শুনে রাজাকে মৃদুস্বরে কিছু বললেন।
রাজা সব শুনে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বললেন—বেশ—আমরা তোমাকে সত্যবাদী বলে মেনে নিলাম।
তাহলে এবার আমি একটি সত্য কথা বলছি। ফ্রান্সিস বলল। তারপর আঙুল তুলে আহত দুই ভাইকিং বন্ধুকে দেখিয়ে বলল—এই বন্ধু দু’জনও ভেক্তরের চাতুরীতে ভুল বুঝে ঐ দলে ভিড়ে ছিল এবং ভেক্তরের নির্দেশে আপনার সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করেছিল। আহত হয়েছিল। কিন্তু আপনার প্রহরী সৈন্যদের যে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হবে এ কথা ভেক্তর ওদের কখনো বলে নি। ওরা সেকথা অন্যকোনো ভাবে জানতেও পারেনি। কাজেই আমার বিনীত আবেদন এই নিরপরাধ দুই বন্ধুকে আপনি মুক্তি দিন। এমনিতে আহত হয়ে বিনা চিকিৎসায় ওরা যথেষ্ট কষ্ট ভোগ করেছে। ফ্রান্সিস থামল।
রাজা ফ্রেডারিক আবার মৃদুস্বরে অমাত্যদের সঙ্গে সব জানিয়ে পরামর্শ করলেন। তারপর সেনাপতি এলাইমোর দিকে তাকিয়ে বললেন—এলাইমো –আপনি কী বলেন?
এলাইমো একটু মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল—মহামান্য—রাজা একটা কথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে ইনি সত্যবাদী। এই দুজন আহত ভাইকিং আমাদের প্রহরীদের মৃত্যুর ষড়যন্ত্র অংশ নেয়নি—ইনি সেকথা বলেছেন এবং আমাদের এক্ষেত্রে ওর কথা সত্য বলে মেনে নেওয়া উচিৎ। এলাইমোর কথাগুলি হ্যারি ফ্রান্সিসকে বুঝিয়ে বলল।
রাজা ফ্রেডারিক আবার অমাত্যদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তারপর ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বললেন—দেখো—এই আহত দু’জন ভাইকিং আমাদের সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করেছে। আমাদের সৈন্যদের হত্যা করেছে না তো আহত করেছে। কাজেই শাস্তি তাদের পেতেই হবে।
ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল হ্যারি শাস্তি মুকুব করা যাবে না। বলো কী করবে।
হ্যারি মাথা নিচু করে একটু ভাবল। তারপর বলল—মহামান্য রাজা এই দুজন। আমাদের বন্ধু স্বদেশবাসী ভাইয়ের মতো। তবু ওদের শাস্তি দিন এটাই আমরা চাই। যদি আপনি আমাদের অনুমতি দেন তাহলে কেমন শাস্তি দেবেন সেটা বলি।
—বলো। রাজা বললেন।
—ওদের চারজনকেই কয়েদঘরে বন্দি করে রাখুন। আহত দুজনের কোনোরকম চিকিৎসা হবে না। যদি বিনা চিকিৎসায় ওরা সুস্থ হয় তো হবে। নইলে ওদের ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। হ্যারি বলল।
—বেশ। কিন্তু তোমরা তো ওদের মুক্তি চাইছো। রাজা বললেন। এবার ফ্রান্সিস বলল—মান্যবর রাজা যখন আমরা—কাউন্ট রজারের গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারবো তখন ওদের মুক্তি দেবেন—আমার এই নিবেদন।
হ্যারি নিচুস্বরে বলল—ফ্রান্সিস—ভীষণ ঝুঁকি নিচ্ছো।
এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। ফ্রান্সিস মাথা নাড়তে নাড়তে বলল।
রাজা ফ্রেডারিক আবার অমাত্যদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তারপর বললেন—বেশ তোমাদের অনুরোধই মেনে নেওয়া হ’ল। যতদিন তোমরা কাউন্ট রজারের গুপ্তধন আবিষ্কার করতে না পারছো ততদিন এই চারজন কয়েদঘরে বন্দি থাকবে।
মারিয়া বলল—মহামান্য রাজা—আমার একটা নিবেদন আছে। রাজা মারিয়ার দিকে তাকালেন। বললেন।
-বেশ বলো।
—এমনিতেই দুজন আহত বন্ধুর চিকিৎসা হবে না। অনেক কষ্ট বেদনা ওদের সহ্য করতে হবে। কাজেই অনুরোধ কয়েদঘরের কষ্ট থেকে ওদের রেহাই দিন। মারিয়া বলল।
