-কীভাবে? রাজা বললেন।
—ওরা সবাই আমাদের জাহাজে থাকুক। প্রয়োজনে আপনি ওদের জন্যে প্রহরী রাখুন। ফ্রান্সিস হ্যারি আর আমি তো এখানে আপনার দুর্গেই থাকবো। ওরা আমাদের ফেলে রেখে তো পালিয়ে যেতে পারবেনা।
রাজা ফ্রেডারিক অমাত্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে বললেন—বেশ। তবে প্রহরী থাকবে তোমাদের জাহাজে।
মারিয়া হেসে বলল—মহামান্য রাজার জয় হোক। বিচার শেষ হল।
ফ্রান্সিস হ্যারি মারিয়া বেরিয়ে এলো। পেছনে পেছনে এলো এলাইমো। তারপর আহত বন্ধুটিকে ধরাধরি করে বিস্কো ওরা বেরিয়ে এলো। আহত বন্ধুটি তখনও দাঁত চেপে ব্যথা কষ্ট সহ্য করছে। বন্ধুটি বলল-ফ্রান্সিস কী বলে তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাবো জানি না। তুমি ফাঁসির হাত থেকে আমাদের বাঁচালে। তারপর আমাদের ভাগ্যে যা ঘটে ঘটুক। ফ্রান্সিস বন্ধুটির পিঠে আস্তে আস্তে চাপড় দিয়ে সান্ত্বনা দিল।
পাঁচজন প্রহরীর পাহারায় বিস্কো ওরা জাহাজঘাটার দিকে চলল। ওরা এই ভেবে আশ্বস্ত হল যে কয়েদঘরের বদ্ধ ঘরে ওদের বন্দিজীবন কাটাতে হবে না। বন্ধুদের মধ্যে ওদের নিজেদের জাহাজেই—বন্দি থাকতে হবে। বন্ধুদের মুখ তো দেখতে পাবো। নীল আকাশ সমুদ্র উড়ন্ত সামুদ্রিক পাখি, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত দেখতে পাবো।
হ্যারি বলল—ফ্রান্সিস—এত বড়ো ঝুঁকি নিলে কেন?
—কী করবো। ওদের প্রাণে বাঁচতে এছাড়া অন্য পথ ছিল না। একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি মারিয়া এবার উঠে পড়ে লাগতে হবে। কাউন্ট রজারের গুপ্তধনের হদিশ বের করতেই হবে। একটু থেমে ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকাতে আঁকাতে বলল—শুধু একটা ক্ষীণ সূত্র চাই। কাউন্ট রজার নিশ্চয়ই কোনো সূত্র রেখে গেছেন। সেটা যেখানে যেভাবে থাকুক হদিশ বের করতেই হবে।
পরদিন দুপুরেই ফ্রান্সিসদের জন্যে রাজবাড়ির একটা চার ঘোড়ার গাড়ি আনা হলো। গাড়িটা পুরোনা হলেও দেখতে সুন্দর। ফ্রান্সিসরা উঠল গাড়িটায়। গাড়ি দুর্গ থেকে বেরিয়ে ছুটল কাতানিয়ার দিকে। বিকেলের মধ্যেই ওরা কাতনিয়া পৌঁছল এটাও একটা বন্দর শহর। তবে সিরাকসের মতো অত জমজমাট নয়। সাভোনার নির্দেশে গাড়ি একটা বিরাট গীর্জার সামনে এসে থামল। গীর্জার মাথায় নানা কারুকাজ করা।
গীর্জার বড়ো দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে সাভোনা বলল, এই গীর্জাটাও কাউন্ট রজার ও তৈরি করেছিলেন। তবে এটা সর্ব সাধারণের জন্যে। ভেতরে সেই ভাবগম্ভীর পরিবেশ। ক্রুশবিদ্ধ যীশুখ্রীস্টের বড় মূর্তি। দেওয়ালে যীশুর জীবন বিষয়ক ছবি। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল এই গীর্জার মেঝেতেও মোজেকের নানা রঙদার কাজ। এসব দেখতে দেখতে একটা কথা হঠাৎই ফ্রান্সিসের মনে পড়ল। দুটো গীর্জাই কাউন্ট রজার তৈরি করিয়েছিলেন। ওপরের কাঠামো জীর্ণ হয়েছিল বলে রাজা ফ্রেডরিক ওপরের কাঠামো সংস্কার করিয়েছিলেন। কিন্তু মেঝে ভাঙা হয়নি। সংস্কারও করা হয়নি। কাজেই অক্ষত মেঝেটাই কাউন্ট রজারের নির্দেশে তৈরি। কাজেই মেঝেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবার ফ্রান্সিস খুব খুঁটিয়ে মেঝের রঙিন মোজেকের নকশাগুলো দেখতে লাগল। তবে ওর তো ছবি-আঁকিয়ের চোখ নয়। নকশাগুলোর ফুল পাতা ঘুলিয়ে যাচ্ছে। ও মারিয়াকে বলল, মারিয়া, তুমি তো সেলাই করো, ছবি নকশা বোঝে—এই মেঝের নকশাটা লক্ষ্য করো তো। ম্যামিয়েস দুর্গের গীর্জার মেঝেতেও নকশা দেখেছিলাম। দুটো নকশাই কি এক রকম? মারিয়া কিছুক্ষণ মেঝের নকশার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,মনে হচ্ছে একই রকম নয়, তবে ম্যামিয়েসের গীর্জাটা ছোটো। নকশাগুলো ছোটো। এটা বড়ো কারণ মেঝেটাও বড়।
—হুঁ। তুমি ভালো করে নকশাগুলো দেখো। পরে ম্যামিয়েসের গীর্জার মেঝের সঙ্গে মেলাবো। ফ্রান্সিস বলল।
—ঠিক আছে। মারিয়া বলল। তারপর মেঝেটায় ঘুরে ঘুরে সব নকশা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল।
গীর্জার শান্ত পরিবেশ থেকে সবাই বেরিয়ে এলো। সাভোনা বলল, এরকম অনেক গীর্জা বাড়িঘরে বিচিত্র স্থাপত্যরীতি দেখা যায়। রোমীয় বাইজেন্টাইন আরবীয় আবার সিসিলির নিজস্ব রীতি সব মিলেমিশে একাকার।
হ্যারি বলল, এই অঞ্চলে মিশ্রণটা বেশি হয়েছে। ফ্রান্সিস খুব মন দিয়ে ওদের কথা শুনছিল না। ও ডুবছিল নিজের চিন্তায়।
মারিয়া বলে উঠল, সিসিলি এলাম অথচ এটনা আগ্নেয়গিরি দেখবো না?
সাভোনা হেসে বলল, উত্তরে তাত্তরমিয়ার দিকে কিছুটা গেলেই এটনা আগ্নেয়গিরি ভালোভাবে দেখা যাবে।
তাই চলুন। মারিয়া খুশিতে লাফিয়ে উঠল।
হ্যারি ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। দেখল, ফ্রান্সিস নিজের চিন্তায় মগ্ন। হ্যারি বলল, কী ফ্রান্সিস, এটনা দেখতে যাবে?
ফ্রান্সিস অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাসল। বলল, চলো। মারিয়া যখন দেখতে চাইছে।
গাড়ি চলল উত্তরে তাত্তরমিয়ার দিকে। পথে দেখা গেল সেই একই দৃশ্য। গাধা খচ্চরের পিঠে গমের বস্তা চাপিয়ে চাষিরা চলেছে। গাধা খচ্চরের গলায় বাঁধা ঘণ্টার শব্দে চারদিক ভরে উঠেছে। পথের দুপাশে সিট্টাস গাছ। গমের ক্ষেত, নানা শাকসবজির চাষের জমি। কিছুদূর যাওয়ার পর বাঁ দিকে হাত বাড়িয়ে সাভোনা বলে উঠল,ঐ যে এটনা আগ্নেয়গিরি। গাড়ি থামল। সবাই নেমে একটা ছোট্ট টিলায় উঠল। দেখা গেল এটনা আগ্নেয়গিরি বিকেলের আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়টা ছাই রঙের। সবুজের চিহ্নমাত্র নেই। চারদিকের শান্ত পরিবেশের মধ্যে এটনার ভাবগম্ভীর রূপ দেখে ফ্রান্সিসরা অভিভূত হলো। এখন শান্ত এটনা। অতীতে কতবার আগুন ছাই লাভা ধোঁয়া উদগিরণ করেছে। ভূমিকম্প ঘটিয়েছে। না জানি কত ঘরবাড়ি ভেঙেছে। কত মানুষ গৃহহীন হয়েছে। মারাও গেছে কত।
