—হ্যাঁ—বোকামিই করেছো—ফ্রান্সিস বলল—দুজন বন্ধুই আহত। একজনের উরু এতটা জখম যে চেয়ে দেখো ও ভালো করে দাঁড়াতেও পারছে না। পারবে এই আহত বন্ধুদের নিয়ে পাহারাদারদের চোখে ধুলো দিয়ে পালাতে?
—চেষ্টা তো করতাম। বিস্কো বলল।
—বেশ। ধরে নিলাম পালাতে পারতে। ওদের সঙ্গে নিয়ে কোথায় আশ্রয় নিতে? ফ্রান্সিস বলল।
-কেন? আমাদের জাহাজে? বিস্কো বলল।
—আর এক বোকামির কাজ ফ্রান্সিস একটু থেমে বলল—তখন এলাইমা আমাদের জাহাজ তল্লাশী করতোই। তোমরা ধরা পড়ে যেতে। তখন ক্রুদ্ধ রাজা ফ্রেডারিক আমাদের সবাইকে কয়েদঘরে বন্দি করে রাখতো আর সবচেয়ে মারাত্মক যে কাজ করতো সেটা হল আমাদের জাহাজের খোলা ভেঙে সমুদ্রে ডুবিয়ে দিতো। ফ্রান্সিস একটু থেমে বলল তখন বন্দিদশা মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকতো না। ধরো যদি কয়েদঘর থেকে পালাতেও পারতাম জাহাজের অভাবে আমরা এই সিসিলির বাইরে যেতে পারতাম না। আবার ধরা পড়তাম। আবার কয়েদঘরে বন্দিদশা ভোগ করতে হতো।
বিস্কো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল ফ্রান্সিস আমি এতসব ভাবি নি। তুমি আমাকে মাফ করো। আজকে বুঝলাম আমাদের মধ্যে তুমি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ কেন। ফ্রান্সিস তোমার ওপর আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল।
ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না। হ্যারি মারিয়াও অবাক চোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিসের প্রত্যেকটি কাজের পেছনে এত চিন্তা-ভাবনা থাকে ওরা বেশ আরাম হল।
এলাইমো তখনই মন্ত্রণাকক্ষ থেকে বেরিয়ে ফ্রান্সিসদের কাছে এলো। হ্যারিকে বলল—রাজা ফ্রেডারিক অনুমতি দিয়েছেন। আপনারা মন্ত্রণাকক্ষে যেতে পারেন। তবে রাজা ফ্রেডারিক অনুমতি না দিলে আপনারা কোনো কথা বলতে পারবেন না।
এলাইমোর কথাটা ফ্রান্সিসকে বলে হ্যারি বলল—তবে আর আমাদের মন্ত্রণাকক্ষে গিয়ে কী হবে।
ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল-এটা একটা সুযোগ হাতছাড়া করা চলবে না। রাজা ফ্রেডারিক যখন বিচারের সময় উপস্থিত থাকার অনুমতি দিয়েছেন তখন কিছু বলারও অনুমতি আমাদের দেবেন। চলো না। দেখা যাক।
এলাইমোর নির্দেশে হরীরা ততক্ষণে বন্দিদের মন্ত্রণাকক্ষে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ফ্রান্সিসরাও তারপরেই ঢুকল।
মন্ত্রণাকক্ষের ভেতরটা একটু অন্ধকারমতো। পাথরের দেয়ালে আটকানো জ্বলন্ত মশালের আলোয় মোটামুটি সবই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। একটা লম্বাটে শ্বেতপাথরের বড়ো টেবিল। তার ওপাশে রাজা ফ্রেডারিক বসে আছেন। দুপাশে তার দুজন অমাত্য। রাজা ফ্রেডারিক মাথায় মীনেকরা মুকুট। গায়ে অবশ্য রাজবেশ নয়। হালকা সবুজ রঙের সাটিনের চাদর জড়ানো। পেশীবহুল হাতকঁধ উন্মুক্ত। অমাত্যদের পরনেও একই পোশাক। শুধু সাটিনের কাপড়ের রং আলাদা।
টেবিলের এপাশে বন্দিদের দাঁড় করানো হল। ফ্রান্সিস হ্যারি মারিয়া ঘরের আর একপাশে পাথরের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল।
এলাইমা রাজাকে সম্মান জানিয়ে বন্দিদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে তার বিবরণ দিতে লাগল। হ্যারি মূদুস্বরে এলাইমোর কথাগুলো ফ্রান্সিসকে বলে দিতে লাগল। এলাইমা বলল মহামান্য রাজা—এরা সবাই জাতিতে ভাইকিং। আপনার আদেশে বন্দরে আমাদের দুটো জাহাজ ওদের জাহাজ পাহারায় ছিল। আমাদের আটজন সৈন্যও ওদের জাহাজে পাহারাদার হিসেবে ছিল। ঝড়ের সুযোগে আমাদের প্রহরীদের লড়াই করে হারিয়ে দিয়ে জাহাজ নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। লিপারি দ্বীপের কাছে ওদের জাহাজ আটকানো হয়। আমাদের সৈন্যদের সঙ্গে ওদের লড়াই হয়। দুপক্ষের অনেকেই মারা যায় নয় তো আহত হয়। এই আহত দুজন ভাইকিং সেই লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিল। অন্য দুজন গতরাতে আহত বন্দি বন্ধুদের মুক্ত করতে ওরা সকলের অলক্ষে দুর্গে ঢুকেছিল। ধরা পড়েছিল। ওদের দুজনকেও এখানে হাজির করা হয়েছে। এই দুজন কি আমাদের সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করেছিল? ফ্রেডারিক বললেন।
-–না–ওরা সেই লড়াইয়ে নামেনি। এলাইমো বলল।
—ঠিক আছে। আহত দুজন এগিয়ে এসো। রাজা ফ্রেডারিক বললেন। ওরা দুজন টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
তখনই ফ্রান্সিস বলল মহামান্য রাজা যদি আমাকে দু-একটা কথা বলতে অনুমতি দেন তবে বাধিত হবো।
রাজা ফ্রেডারিক ফ্রান্সিসের দিকে তাকালেন। বললেন–তোমরাই তো কাউন্ট রজারের গুপ্তধন খুঁজে বের করার চেষ্টা করছো?
—আজ্ঞে হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলল।
—ঠিক আছে। বলো তোমার কী বলার আছে। জা বললেন।
—মহামান্য রাজা সেনাপতি এলাইমো যে লড়াইয়ের কথা বললেন এবং যে লড়াইয়ে
আমাদের এই দুই বন্ধু আহত হয়েছিল সেই লড়াই হয়েছিল অনেক পরে। আপনার প্রহরী সৈন্যদের মৃত্যু হয়েছে লড়াই করতে গিয়ে না। ফ্রান্সিস বলল।
—তবে? রাজা বেশ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
—বিষ প্রয়োগ করে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল।
—বলো কি? রাজা ফ্রেডারিক চমকে উঠে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। মারিয়া ফিসফিস করে বলল—ফ্রান্সিস তুমি একথা বলে দিলে কেন?
ফ্রান্সিস হাতটা একটু তুলে মারিয়াকে চুপ করে থাকতে ইঙ্গিত করল। হ্যারি কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল। বুঝলনা—যে মর্মান্তিক ঘটনাটা রাজা ফ্রেডারিক সেনাপতি এলাইমো বা অন্য কেউ জানে না সেটা ফ্রান্সিস বলতে গেল কেন।
রাজা ফ্রেডারিক অমাত্য দুজনের সঙ্গে মৃদুস্বরে কথা বললেন। তারপর ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বললেন—কে কীভাবে তাদের বিষ খাইয়ে মারল?
