সবে সকালের খাওয়া শেষ হয়েছে ফ্রান্সিসদের। তখনই সাভোনা ফ্রান্সিসদের গতরাতের ঘটনাটা আস্তে আস্তে বলল—ফ্রান্সিস বেশ চমকে উঠল। বুঝল বিস্কো আর শাঙ্কো গতরাতে ওদের সঙ্গে কথা বলে আর জাহাজে ফিরে যায় নি। আহত বন্ধু দুজনকে মুক্ত করতে প্রহরীদের দৃষ্টি এড়িয়ে দুর্গের মধ্যে কোনো ভাবে ঢুকেছিল। হ্যারি আরমারিয়াও খবরটা শুনল। মোরাবিত ও সাভোনার কাছে সব শুনল। ওরা দুজনেই ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিসরা এখন কী করবে? দেখল—ফ্রান্সিস মাথা ঝুঁকিয়ে চুপ করে বসে আছে। খুব চিন্তায় পড়ল ফ্রান্সিস বিস্কো শাঙ্কো দুজনেই নির্দোষ। বন্ধু দুজনকে বাঁচাতেই ওরা দুর্গের মধ্যে কোনোভাবে ঢুকেছিল। কিন্তু রাজা ফ্রেডারিক কি সেটা মানবেন? হয়তো ওদের ওপর ক্রুদ্ধ হবেন। ওদের বেত মারার অথবা ফাঁসি দেওয়ার হুকুমও দিতে পারেন।
ফ্রান্সিস মুখ তুলে সালভানাকে বলল—আপনি খোঁজ নিয়ে জানুন তো বন্দিদের কখন রাজা ফ্রেডারিকের সম্মুখে হাজির করা হবে। সাভোনা বিছানা ছেড়ে উঠল। বাইরে বেরিয়ে গেল। একটু পরেই ফিরে এসে বলন—ফ্রান্সিস—বন্দিদের আর অল্পক্ষণ পরেই মন্ত্রণাকক্ষে নিয়ে যাওয়া হবে। রাজা আর কয়েকজন ওখানে বসেই বিচার করবেন।
তাহলে চলুন না। ফ্রান্সিস বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হ্যারি, মারিয়া, মোরাবিতও উঠল। সাভোনা আগে আগে চলল? পেছনে ফ্রান্সিসরা।
মন্ত্রণাকক্ষের সিঁড়ির কাছে প্রহরীরা পাহারা দিচ্ছে। সাভোনা এগিয়ে গেল প্রহরীদের দিকে বলল—মন্ত্রণাকক্ষে কয়েকজন বন্দির বিচার হবে। আমরা যাবো।
প্রহরীরা মাথা নাড়ল। কারো যাবার হুকুম নেই। সাভোনা ফিরে এসে ফ্রান্সিসদের বলল সে কথা। ফ্রান্সিসরা হতাশ হল। বন্ধুদের মুক্ত করার জন্য একবার অন্তত চেষ্টা করা যেত। কিন্তু বিচারের সময় উপস্থিত থাকতে না পারলে কিছুই করা যাবে না। আহত বন্ধু দুজনের ফাঁসি তো হবেই বিস্কো শাহ্মেকেও কয়েদঘরে আটকে রাখা হবে। কতদিন কে জানে। বিস্কো শাঙ্কো কোনো অপরাধ করেনি তবু রাজা ফ্রেডারিক বা সেনাপতি এলাইমোর অনুমতি ছাড়া ওরা গোপনে দুর্গের মধ্যে ঢুকেছিল। বন্দি বন্ধুদের মুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। এই অপরাধে কয়েদঘরে বন্দি করে রাখা হবেই। ফ্রান্সিস সাভোনাকে এই আশঙ্কার কথা বলল।
সাভোনা মাথা ওঠানামা করে বলল—এটা হতে পারে। রাজা ফ্রেডারিক সহজে ওদের মুক্তি দেবেনা।
ফ্রান্সিস বুঝে উঠতে পারলো না কী করবে। সাভোনা নিজেই রাজবিদ্রেহী। কাজেই সেও এ ব্যাপারে কোনো সাহায্য করতে পারবে না। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে রইল।
তখনই দেখা গেল। একদল প্রহরী সৈন্য বিস্কো শাঙ্কো আর আহত দুজন ভাইকিংকে নিয়ে আসছে। সকলের সামনে আসছে সেনাপতি এলাইমো।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল—হ্যারি এলাইমোকে বুঝিয়ে বলো। একমাত্র এলাইমোই রাজা ফ্রেডারিককে বলে আমাদের মন্ত্রণাকক্ষে নিয়ে যেতে পারে।
বন্দিদের নিয়ে এলাইমো ততক্ষণে সিঁড়ির কাছে এসেছে হ্যারি এগিয়ে গেল। বলল—মাননীয় সেনাপতি—আমাদের কিছু বলার ছিল। এলাইমো দাঁড়িয়ে পড়ল। সেনাপতি–ঐ বন্দি চারজনই আমাদের বন্ধু স্বজাতি। রাজা ফ্রেডারিক বিচারে ওদের যা শাস্তি দেবেন তাই মাথা পেতে মেনে নেব। কিন্তু বিচারের সময় শুধু ওদের কথা শুনে রাজা সন্তুষ্ট নাও হতে পানে। সেই জন্যে বলছি যদি বিচারের সময় রাজা ফ্রেডারিক মন্ত্রণাকক্ষে আমাদের উপস্থিত থাকতে অনুমতি দেন তাহলে আমরা ওদের স্বপক্ষের বক্তব্য রাজা ফ্রেডারিককে বুঝিয়ে বলতে পারবো।
এলাইমো ফ্রান্সিস মারিয়ার মুখের দিকে তাকাল। তারপর হ্যারিকে বলল ঐ সাভোনা আর মোরাবিতের জন্যে আমি বলবো না। তবে বন্ধু হিসেবে আপনাদের কথা বলবো। যদি মহামান্য রাজা অনুমতি দেন তাহলে আপনাদের নিয়ে যাবো।
এলাইমো সিঁড়ি দিয়ে উঠে মন্ত্রণাকক্ষের দিকে চলে গেল। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে রইল। চার বন্দি বন্ধুই ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে রইল। আহত বন্ধু দুজনের মুখ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। বেশি আহত বন্ধুটি ব্যথা-যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে তখন।
অন্য বন্ধুটি কাঁদকাঁদ স্বরে বলল—ফ্রান্সিস—তুমি বিশ্বাস করো পাহারাদারদের খাবারে বিষ দেওয়া হয়েছিল এটা অন্ততঃ আমরা দুজনে জানতাম না। ভেক্তর আগে আমাদের কিছু বলেনি। তবে রাজার সৈন্যদের সঙ্গে আমরা লড়াই করেছি ভেক্তরের নির্দেশে। তা ছাড়া ভেবেছিলাম লড়াইয়ে জিততে পারলে দেশে ফিরে যেতে পারবো। একটু থেমে বলল ফ্রান্সিস একমাত্র তুমিই আমাদের বাঁচাতে পারো। ফ্রান্সিস কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে বন্ধুর কথাগুলো শুনে গেল। আহত বন্ধুটি মুখে হাতচাপা দিয়ে কেঁদে উঠল।
ফ্রান্সিস এবার মুখ তুলে বিস্কো আর শাঙ্কোর দিকে তাকাল। বলল—তোমরা কেন ওদের মুক্ত করতে গেলে? কেন এভাবে বিপদ ডেকে আনলে?
বিস্কো একটু মনঃক্ষুন্নস্বরে বলল—কী করবো—তুমি ওদের ওপর এত রেগে গেলে যে—
বিস্কো—ওদের কাছে সব জেনে সময়মতো ওদের মুক্ত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করতামই। তার আগেই তোমরা মাথা গরম করে ভবিষ্যতে কী হতে পারে এসব না ভেবেই বোকার মতো জীবনের ঝুঁকি নিলে। ফ্রান্সিস বলল।
-–ফ্রান্সিস তুমি এটাকে বোকামি বলেছো? বিস্কো বেশ বিরক্তির সুরেই বলল।
