একজন প্রহরী উঠে দাঁড়াতে গেল। শাঙ্কো তার বুকে তলোয়ারের ধারালো ডগাটা চেপে ধরে বলল—উঠতে গেলেই মরবে। মুখের বাঁধনেও হাত দেবে না। দুদল প্রহরীই ওদের দিকে চিত হয়ে শুয়ে থেকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল। বিস্কো প্রহরীদের কোমরে গোঁজা চাবির থোকা খুঁজতে লাগল। সর্বনাশ। দুজনের কারো কোমরেই তো চারি গোছা নেই। বিস্কো আর শাঙ্কো পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। যে প্রহরীর কোমরে চাবির গোছা থাকে সে গিয়েছিল অন্য প্রহরীদের সঙ্গে একটু গল্পগুজব করে সময় কাটাতে। সেই প্রহরী ঠিক তখনই বারান্দার কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সে তো অবাক। বিস্কো শাঙ্কো তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। দুজন প্রহরী বারান্দায় পড়ে আছে। গোঙাচ্ছে। বিস্কো শাঙ্কো লাফিয়ে প্রহরীটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল। তার আগেই প্রহরীটি তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে ছুটল রাজার ঘরের সামনের প্রহরীদের দিকে। চিৎকার করে বলতে লাগল শিগগির আয় কয়েদঘরে ডাকাত পড়েছে।
—পালাও—বলেই বিস্কো বারান্দা থেকে লাফিয়ে পাথুরে চত্বরে নামল। শাঙ্কোও লাফিয়ে নামল। দুজনে প্রাণপণে ছুটল পাথরের প্রাচীরের দিকে।
কিন্তু ততক্ষণে দুর্গের প্রহরীরা চিৎকার করতে করতে মশাল হাতে ছুটে আসতে শুরু করেছে। তখন প্রাচীরের পাথুরে দেয়াল মাত্র হাত পাঁচেক দূরে। বিস্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। শাঙ্কোও দাঁড়িয়ে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে শাঙ্কো বলল কী হল?
—অসম্ভব। দেয়ালের সবটা উঠতে পারবোনা। সেই চেষ্টা করলে প্রহরীরা এলোপাথারি তলোয়ার চালাবে। আমরা ভীষণভাবে আহত হবো। বলা যায়না। আমাদের মেরেও ফেলতে পারে। তার চেয়ে লড়াই না করে ধরা দাও? প্রাণে তো বাঁচবো। পরে দেখা যাবে। বিস্কোর কথা শেষহবার আগেই প্রহরীরা বিস্কোদের কাছে এসে দাঁড়াল। ওরা হাঁপাচ্ছে তখন। মশালের আলো পড়েছে বিস্কো আর শাঙ্কোর মুখে গায়ে। বিস্কো হাতের তলোয়ারটা পায়ের কাছে ফেলে দিল। পাথরের চত্ত্বরে শাঙ্কো ও তলোয়ার ফেলে দিল। শব্দ হল ঝনাৎ ঝনাৎ। দুনি জন প্রহরী এগিয়ে এলো। একজন জিজ্ঞাসা করল—তোমরা কারা? কোত্থেকে এসেছে? বিস্কোরা লো ল্যাতিন ভাষা বুঝল না। ওরা দুজনেই মাথা নাড়ল।
বিস্কো ও শাঙ্কোকে ঘিরে ধরা প্রহরীরা বুঝে উঠতে পারল না এরা কারা। দুজন প্রহরী ফ্রান্সিস হ্যারিকে গতকাল দেখেছিল। শুনেছিল ওরা ভাইকিং বিদেশি। বিস্কোদের পরনেও ফ্রান্সিসদের মতো পোশাক। বুঝল এরাও ভাইকিং। ও বলল এরা ভাইকিং। বিদেশি। ভাইকিং কথাটা শুনে বিস্কো আর শাঙ্কো দুজনেই মাথা ওঠানামা করে সমর্থন জানালো।
দুতিনজন প্রহরী তলোয়ারের ইঙ্গিতে কয়েদঘর দেখাল। তারপর ওদের সঙ্গে যেতে ইঙ্গিতে জানাল। আগে আগে চলল বিস্কো আর শাঙ্কো। পেছনে প্রহরীর দল।
কয়েদঘরের বারান্দায় প্রহরী দুজন তখন উঠে বসেছে। কয়েদঘরের লোহার গরাদের দরজা খোলা হল। বিস্কো আর শাঙ্কোকে ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। তখন পূব আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। সূর্য উঠতে বেশি দেরি নেই।
কয়েদঘরে ঢুকে মশালের আলোয় বিস্কো আহত বন্ধু দু’জনকে খুঁজতে লাগলো। ঘরটি শুকনো ঘাস ছড়ানো বিছানামতো। তাতে সাত-আটজন বন্দি হয়ে বসে আছে। বাইরের চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে ওদের ঘুম ভেঙে গেছে। বিস্কো দেখাল একেবারে বা কোণায় দু’জন বন্ধুই শুয়ে আছে। বিস্কো ছুটে ওদের কাছে গেল। পেছনে শাঙ্কোও ছুটে এলো। আহত এক বন্ধু আস্তে আস্তে উঠে বসল। ডান হাত ধরল। অন্যজন উঠে বসতে পারল না। বিস্কোদের দিকে তাকিয়ে রইল। বিস্কো শাঙ্কো দু’জনে ওদের পাশে বসল। বন্ধুটি একটু আশ্চর্য হয়েই বলল তোমাদের বন্দি করা হল কেন? রাজার সৈন্যদের মেরে ফেলার জন্যে তোমরা তো দায়ী নাও।
তখন বিস্কো কীভাবে ওদের মুক্ত করার জন্যে চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়েছে সব বলল। বন্ধুটিরদু’চোখ জলে ভরে উঠল। মাথা নামিয়ে বলল তোমরা তাহলে সত্যিই আমাদের বন্ধুর মতোই এখনও ভালোবাসো।
ভালোবাসি বই কি। সেই নৃশংস ঘটনার জন্যে দায়ী ভেক্তর। সেই তোমাদের ভুল বুঝিয়ে দলে টেনেছে। তোমরাও দেশে ফেরার আকুলতায় সব ভুলে গিয়ে ভেক্তর যা বলেছে তাই করেছো। তোমাদের কোনো দোষ নেই। বিস্কো বলল। শুয়ে থাকা আহত বন্ধুটির দু’চোখও জলে ভিজে উঠল। ও চোখে হাত চাপা দিল।
বিস্কো আর শাঙ্কো বন্ধুদের পাশে ঘাসের বিছানায় বসল। শাঙ্কো কাঁধ থেকে ধনুক আর তৃণীর খুলে পাশে রাখল। বিস্কো নিজেকে এত ক্লান্ত বোধ করছিল যে বসে থাকতে পারল না। চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। ওর মাথায় তখন নানা চিন্তা বন্ধুদের উদ্ধার করতে এসে এভাবে নিজেরাও বন্দি হয়েছে এই খবরটা ফ্রান্সিস পাবে নিশ্চয়ই! ফ্রান্সিস এতে ওদের রাগ করবে কিনা কে জানে। আবার হয়তো ফ্রান্সিসরা এ খবর নাও পেতে পারে। এসব ভাবতে ভাবতে বিস্কোর একটু তন্দ্রা এলো।
সকাল হ’ল। লোহার দরজা খুলে প্রহরীরা কয়েদঘরের বন্ধিদের জন্যে খাবার নিয়ে এলো। গোল আধপোড়া রুটি আর নানা শাকসজির ঝোল। বিস্কোরা হাতমুখ ধুয়ে সকালের খাবার খেতে লাগল।
ওদিকে দুর্গরক্ষীরা সাভোনাকে সকালেই জানাল যে গত রাতে দুজন ভাইকিং দুর্গের মধ্যে ধরা পড়েছে একটু বেলায় রাজা ফ্রেডারিকের কাছে তাদের নিয়ে যাওয়া হবে। বিচার হবে। সাভোনা বেশ চিন্তায় পড়ল। বুঝে উঠতে পারল না ফ্রান্সিসকে এই খবরটা দেবে কি না। কিন্তু ফ্রান্সিসকে কথাটা না জানালে পরে যদি ফ্রান্সিস জানতে পারে তবে সাভোনার ওপর বেশ মনঃক্ষুণ্ণ হবে। কাজেই ফ্রান্সিসকে সব জানানো উচিত। বলা যায় না রাজা ফ্রেডারিকের বিচারে ঐ দুজনকেও হয়তো ফাঁসি কাঠে চড়ানো হবে।
