বিস্কো চাপা গলায় বলল—শাঙ্কো—আবার তির ছোঁড়ো নিশানা যেন নিখুঁত হয়। তির নষ্ট করা চলবে না। শাঙ্কোর কেমন জেদ চেপে গেল। এবার একটু সময় নিয়ে লক্ষ্য স্থির করে তির ছুঁড়ল। তিরটা ছুটে গিয়ে জ্বলন্ত মশালের গায়ে বিঁধে গেল। মশালটা খোঁদাল থেকে ছিটকে গিয়ে নীচের জলকাদার মধ্যে পড়ে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল। আবার তির ছুঁড়ল। পরের জ্বলন্ত মশালটাও ছিটকে পড়ল নীচের জলকাদায়, সেটাও সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল। দেয়ালের কাছে অনেকটা জায়গা একবারে অন্ধকার হয়ে গেল। বিস্কো খুশিতে শাঙ্কোর পিঠ চাপড়াল।
দু’জনে অন্ধকারে চুপ করে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর বিস্কো মাথা ঝুঁকিয়ে অন্ধকারে এক ছুটে রাস্তাটা পেরিয়ে দেয়ালের ধারে চলে এলো। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অন্ধকারে ও শাঙ্কোর জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। একটু পরে শাঙ্কোও একইভাবে এক ছুটে দেয়ালের কাছে চলে এলো। অন্ধকারে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দুজনেই অল্প অল্প হাঁপাতে লাগল। বিস্কো ভালো করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল বেশ কিছুটা দূরে দুর্গের সদর দেউড়ির সামনে প্রহরী সৈন্যরা খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছে। অন্ধকারে এত দূরে ওদের দেখতেই পাবে না।
এবার বিস্কো খুব ক্ষীণ জ্যোৎস্নায় দেয়ালের গায়ে কয়েকটা পাথরের খাঁজ দেখল। ছোটো খোঁদাল আছে—বোধহয় মশাল রাখার জন্যে। বিস্কো প্রথম খাঁজটায় পা রাখল। তারপর আস্তে আস্তে খাঁজে খাঁজে পা রেখে দেয়াল বেয়ে উঠতে লাগল। একেবারে দেয়ালের মাথার কাছে মশাল রাখান খোঁদল। খোঁদলটায় পা রেখে শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে দেয়ালের মাথায় উঠে বসল। তারপর দেয়ালের ওপাশে আবার পাথরের খাঁজে খাঁজে পা রেখে রেখে দুর্গের পাথুরে চত্বরে নামল। নেমেই অন্ধকারে বসে পড়ল। শাঙ্কোও বিস্কোর মতো পাথরের খাঁজে খাঁজে পা রেখে উঠতে লাগল। দেয়ালের মাথার কাছে। খোদালটায় পা রেখে ভর দিয়ে উঠতে গিয়ে পা-টা পিছলে গেল। একটা পাথরের বড়ো টুকরো খসে গিয়ে নীচে পড়ে গেল। জলে কাদায় পড়ে শব্দ হল গ্রুপ। দেউড়ির একজন প্রহরী কানে গেল শব্দটা। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে সাবধান হ’ল। দেয়ালে বুক চেপে অনড় দাঁড়িয়ে রইল। প্রহরীটা অন্ধকারে এদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কপালে গোল করে হাত রেখে মশালের আলো আড়াল করেও কিছুক্ষণ দেখল। কিন্তু অন্ধকারে যতটা দেখতে পেল তাতে কোন কিছুর নড়াচড়া দেখতে পেল না। নিশ্চিন্ত মনে খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিতে লাগল। শাঙ্কোও নিশ্চিন্ত হল। ও আবার সেই খোঁদলে পা রেখে শরীর ঝাঁকিয়ে দেয়াল ডিঙোল দেয়ালের ওপাশে নেমেই বিস্কোর গা ঘেঁষে বসে পড়ল।
একটু পরে বিস্কো বলল—শাঙ্কো—দেখ-দুর্গের ঘরগুলোর জায়গায় জায়গায় মশাল জ্বলছে। সেই আলোয় যা দেখছি তাতে বুঝতে পারছি ওগুলো থাকা শোয়ার ঘর। আমাদের আহত বন্ধু দু’জনকে এইসব ঘরে নিশ্চয়ই রাখা হয়নি। ওদের বন্দি করা হয়েছে। কাজেই নিশ্চয়ই রাখা হয়েছে কয়েদঘরে। এবার সেই কয়েদঘরটা খুঁজে বের করতে হবে। চলো রাত শেষ হবার আগেই ওদের মুক্ত করতে হবে। বিস্কো অন্ধকারে মাথা নিচু করে প্রায় হামাগুড়ি দিতে দিতে দুর্গের ঘরগুলোর দিকে চলল। একইভাবে পেছনে পেছনে শাঙ্কোও চলল। দুর্গের প্রথম ঘরটার কাছাকাছি এলো। মশালের আলো যতদূর গেছে তার বাইরে এসে থামাল। না এসব ঘর না। বাঁদিকে ঘুরে আবার চলল। পরপর ঘরগুলো পার হতে লাগল। একটা বড়ো ঘরের সামনের সিঁড়িতে দেখল অনেকগুলো মশাল জ্বলছে। প্রহরীর সংখ্যাও বেশি। তার মানে এখানে রাজা ফ্রেডারিক আছে। বিস্কোরা অন্ধকার পাথুরে চত্বর দিয়ে চলল। অন্দরমহল পার হল। তখনই দেখল পশ্চিম কোণায় দেয়ালের গা ঘেঁষে একটা লম্ফাটে পাথরের ঘর। ঘরটার সামনে দরজার দুপাশে মশাল জ্বলছে। কাছাকাছি আসতে দেখল ঘরটার দরজায় লোহার গরাদে একটা বড়ো তালা লাগানো দরজায়। দুজন প্রহরী খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছে। বিস্কো ফিস ফিস করে বলল শাঙ্কো এটাই কয়েদঘর। আহত বন্ধুদুজনকে নিশ্চয়ই এখানে কয়েদ করা হয়েছে।
—কিন্তু ওদের মুক্ত করবে কী ভাবে? দেখছোনা—দুজন পাহারাদার পাহারা দিচ্ছে। শাঙ্কো বলল। তারপর বলল—তবে যদি বলো তির ছুঁড়ে মশাল দুটো ফেলে দিতে পারি।
—কোনো লাভ নেই। ওখানে জল নেই। মশাল সহজে নিভবে না। উল্টে রাজার ঘরের পাহারাদারদের নজরে পড়বে। অন্য উপায় ভাবো। বিস্কো বলল।
—দুটোকেই তির মেরে জখম করতে পারি। শাঙ্কো বলল।
—কী লাভ তাতে। ওরা আহত হলেই চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু করবে। তিরে আহত হয়েছে দেখলে ওরা বুঝে নেবে ধারে কাছে কোনো শত্রু তিরন্দাজ আছে। সারা দুর্গ এলাকা দল বেঁধে খুঁজে বেড়াবে। আমাদের তখন পালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকবে না। তারপর সৈন্যরা প্রহরীরা আরো সাবধান হয়ে যাবে। বন্ধুদের উদ্ধর করা তখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। বিস্কো বলল।
তারপর বলল-শোনো পাহারাদার দু’জনকে কাবু করতে হবে। ওদের কোমরে ঝোলানো চাবি নিয়ে দরজা খুলে বন্ধুদের মুক্ত করতে হবে। তারপর দেয়াল ডিঙিয়ে পালাতে হবে।
—কিন্তু বন্ধুরা তো বেশি আহত পারবে ওরা? শাঙ্কো বলল।
—পারতেই হবে। নইলে ওদের ফাঁসির হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। ফ্রান্সিস চেষ্টা করলে হয়তো পারতো। কিন্তু ফ্রান্সিস এরকম নৃশংস কাজকে কক্ষণো সমর্থন করবে না। বিস্কো বলল। তারপর মাথা নিচু করে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলল কয়েদঘরের দিকে। কয়েদঘরের বারান্দায় প্রহরী দু’জন পাহারা দিচ্ছিল। অন্ধকার থেকে মাথা নিচু করে ছুটে এসে বারান্দায় উঠে বিস্কো আর শাঙ্কো ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রহরী দুজনের ওপর। দুজন প্রহরী কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজনের মাথায় গুঁতো খেয়ে ওরা ছিটকে বারান্দায় চিৎ হয়ে পড়ে গেল। হাতের তলোয়ারও ছিটকে গেল। বিস্কো চিৎ হয়ে থাকা দু’জন প্রহরীর গলা দুহাত দিয়ে চেপে ধরে দ্রুত বলল–শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি খোল। মুখ বাঁধা। প্রহরী দুজন গোঙাতে লাগল। শাঙ্কো দ্রুত হাতে নিজের কোমরের ফেট্টিটা খুলল। একদল প্রহরীর মুখ চেপে পেঁচিয়ে বাঁধল। প্রহরীটা অস্পষ্ট স্বরে গোঙাতে লাগল। বিস্কোর কোমরের ৭ ফেটি খুলে শাঙ্কো অন্য প্রহরীটার মুখ চেপে পেঁচিয়ে বাঁধল। তারপর দু’জনেই প্রহরীদের তলোয়ার দুটো তুলে নিল।
