ওরা ফিরে চলল নিজেদের ঘরে।
বিস্কো মৃদুস্বরে শাঙ্কোকে বলল—ফ্রান্সিস কতগুলোনীতি মেনে চলে। কোনো অবস্থাতেই ফ্রান্সিস ওর নীতিবিরোধী কাজ মেনে নেয় না। তাই বন্ধু হলেও ওকে শ্রদ্ধা করি।
দু’জনে মন্থর পায়ে জাহাজঘাটার দিকে চলল। এতক্ষণে ওরা বুঝতে পারল ওরা কত ক্লান্ত।
জাহাজঘাটের কাছে এসে বিস্কো হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। শাঙ্কো বলল—কী হল বিস্কো?
বিস্কো বেশ চিন্তান্বিতস্বরে বলল—আহত বন্দি দু’জন তো আমাদেরই স্বদেশবাসী ভাই বন্ধু। জানিনা ওদের দু’জনকে কোথায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। ভীষণ আহত ওরা। এলাইমোর সৈন্যরা ওদের দুজনকে নির্মমভাবে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছে। নিশ্চয়ই এই টানা হ্যাঁচড়ায় ওদের শরীরের ক্ষত থেকে আরো রক্ত পড়েছে। দুর্বল হয়ে পড়েছে ওরা। ওদের চিকিৎসার কিছু ব্যবস্থা হয়েছে কিনা তাও জানি না।
—ঠিকই বলেছো বিস্কো –শাঙ্কো বলল—তবু ওরা যেমন নিষ্ঠুরভাবে এলাইমোর পাহারাদার সৈন্যদের বিষ খাইয়ে হত্যা করেছে—এটাকে মোটেই মেনে নেওয়া যায়না। ওদের এই ঘৃণ্য আচরণের জন্য যে শাস্তি ওদের পাওয়া উচিৎ তাই পাক। আমরা কী করবো বলো?
—তবু-শাঙ্কো—ভেবে দেখো আমরা যখন দেশে ফিরবো তখন ওদের বাবা-মা তো জানতে চাইবে ওদের ছেলেদের কী হয়েছে?
—রাজা ফ্রেডারিক কি ওদের মুক্তি দেবে না?শাঙ্কো জানতে চাইল।
মাথা খারাপ—বিস্কো বলল—রাজা ফ্রেডারিক যখন সব জানতে পারবে তখন ওদের প্রাণ দেবেই। ফাঁসি ওদের হবেই। পারবে দেশে ফিরে ওদের পুত্র হারা বাবা মাকে সান্ত্বনা দিতে? কী ব’লে ওদের সান্ত্বনা দেবে?
—কী করবো বলো—যা সত্য তাই বলবো। শাঙ্কো বলল।
বিস্কো জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল—না শাঙ্কো তা হয় না। ওরা যাই করুক তবু ওরা আমাদের ভাইয়ের মতো বন্ধুও। ওদের যেভাবে হোক বাঁচাতে হবে। এ
—কিন্তু কী করে?শাঙ্কো বলল—দেখে এলে তো রাজার সৈন্যরা কীভাবে ম্যামিয়েস দুর্গ পাহারা দিচ্ছে। রাজা ও রাজপরিবারের অনেকে এখন ঐ দুর্গে আছে, তাই এত নিরাপত্তার কড়াকড়ি। পারবে ঐ কড়া পাহারার মধ্যে দিয়ে বন্ধুদের মুক্ত করতে?
—দেখি তো চেষ্টা করে। বিস্কো বলল। তারপর ফিরে দাঁড়াল। বলল—চলল—ম্যামিয়েস দুর্গের মাঝে। শাঙ্কো বুঝল বিস্কোকে ফেরোনো যাবে না। ও যদি সঙ্গে না যায় তাহলে বিস্কো একাই বন্ধুদের মুক্ত করতে যাবে। তাতে একা বিস্কো বিপদে পড়বেই। অথচ এখন বিস্কোকে সেকথা বোঝানো যাবেনা। বিস্কো শাঙ্কোর জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত ম্যামিয়েস দুর্গের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
শাঙ্কো ডাকল—বিস্কো—দাঁড়াও। বিস্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল—তুমি যাবে,না যাবে না!
—যাবো। জাহাজ থেকে আমার তির-ধনুক নিয়ে আসছি। তুমি একটু দাঁড়াও। কথাটা বলে শাঙ্কো দৌড়ে চলল জাহাজের ঘাটের দিকে।
একটু পরেই শাঙ্কো তির-ধনুক নিয়ে এলো দু’জনে চলল ম্যামিয়ে দুর্গের দিকে। দুর্গের প্রধান দেউড়ি দূর থেকে দেখল। দাঁড়িয়ে পড়ল দু’জনে। আর এগোলো না। দেউড়িতে দশ-পনেরোজন পাহারাদার সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছে। দেউড়ির আশেপাশে সাত-আটটা মশাল জ্বলছে। বেশ আলো ছড়িয়ে আছে চারদিকে।
দেউড়ির কাছে যাওয়া যাবেনা। ওরা রাস্তার অন্যপাশে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলল। টানা পাথরের উঁচু দেয়ালের জায়গায় জায়গায় মশাল জ্বলছে। ওরা দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়ে রইল। লক্ষ্য করল কিছুক্ষণ পর পর তিনজন সৈন্য দেয়ালে গুঁজে রাখা মশালের তলা দিয়ে ভোলা লোয়ার হাতে দেয়ালের ধার দিয়ে হেঁটে হেঁটে পাহারা দিচ্ছে। যদি পাথরের উঁচু দেয়াল। ডিঙোতে হয় তাহলে ওরা যখন পাহারা দিতে দূরে চলে যাবে তখনই ডিঙোতে হবে ওরা ফিরে আসার আগেই কাজ সারতে হবে।
বিস্কো বেশ নজর দিয়ে দেয়ালটা দেখতে দেখতে ফিস্ ফিস্ করে বলল–শাঙ্কো লক্ষ্য করো—পাথরের দেয়ালের খোঁদলে খোঁদলে মশালগুলো বসানো আছে। আচ্ছা তির মেরে মশালগুলো ফেলে দেওয়া যায় না?শাঝে বেশ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থেকে বুঝল যে তির ছুঁড়ে ঠিক ঘা দিতে পারলে মশালগুলো খোদাল থেকে ছিটকে পড়ে যাবে। কিন্তু মশালগুলো ছিটকে মাটিতে পড়লেও তো নিভবে না। ধুলোটে পথে পড়ে গিয়েও নিভে যাবে কিনা সেটাই সমস্যা। না নিভে যদি অল্প অল্পও জ্বলতে থাকে তাহলেও তো ওখান দিয়ে দেয়ালের কাছে যাওয়া যাবেনা। দেয়ালও টপকে পার হওয়া যাবে না। শাঙ্কো ওদিকে তাকিয়ে এসব ভাবছে তখনই দেখল সেই তিনজন প্রহরী সৈন্য মশালগুলোর নীচে দিয়ে খোলা তলোয়ার হাতে আসছে। হঠাৎ দুটো মশালের নীচে দিয়ে আসার সময় একজন প্রহরী দাঁড়িয়ে পড়ল। শাঙ্কোর কানে খুব মৃদু শব্দ এলো ছপ। শাঙ্কো চমকে বিস্কোর দিকে তাকাল। ফিসফিস্ করে বলল—বিস্কো ঐ মশাল দুটোর নীচের মাটিতে জল কাদা জমেছে।
বিস্কো কথাটা শুনে প্রায় লাফিয়ে উঠল। বলল তাহলে তো ওখানে মশাল দুটো ফেলতে পারলে মশালের আগুন নিভে যাবে। অনেকটা জায়গা অন্ধকার হয়ে যাবে।
শাঙ্কো অন্ধকারে হেসে বলল—ঠিক তাই। ততক্ষণে পাহারাদাররা দূরে চলে গেছে। শাঙ্কো কাঁধে কোমরে ঝুলিয়ে রাখা ধনুকটা খুলে হাতে নিল। কাঁধের তিরের খাপ থেকে একটা তির তুলে নিয়ে ধনুকে পরাল। ছিলা টেনে ধরে সামনের মশালটার দিকে নিশানা করল। তারপর তির ছুঁড়ল। অন্ধকারে তির ছুটল। কিন্তু মশালটার আগুনে লাগল না। খোদলটায় ঢুকে ছিটকে এসে নীচে পড়ে গেল।
