দলপতি ওর পাঁচজন সৈন্যকে আনতে বলল। সৈন্যরা বসে থাকা ভাইকিংকে এক হ্যাঁচকা টানে বিছানা থেকে মেঝেয় দাঁড় করাল। অন্য তিনজন সৈন্য শুয়ে থাকা ভাইকিংকে জোর করে তুলে দাঁড় করাল। ওরা দুজনেই ব্যথায় গোঙাতে লাগল।
বিস্কো দলপতিকে বার বার বলতে লাগল-ওরা ভয়ানক আহত। দুটো দিন সময় দিন। আমরাই ওদের নিয়ে যাবো।
দলপতি সেকথা বুঝল না। কানও দিল না। সৈন্যদের ইঙ্গিত করল টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে। সৈন্যরাও বিন্দুমাত্র করুণা দেখাল না আহত ভাইকিংদের প্রতি। টেনে হিঁচড়ে দু’জনকে কেবিনঘর থেকে বের করল। নিয়ে চলল সিঁড়ির দিকে। সিঁড়ি দিয়ে টেনে তুলতে গিয়ে একজন ভাইকিং-এর কাটা উরুতে বাঁধা ফেট্টিটা খুলে গেল। ও চিৎকার করে উঠল। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ছুটল। দু’জনের আর্তনাদে অসহ্য যন্ত্রণার জন্য কান্নায় ভরে উঠল জাহাজের ডেক। সৈন্যরা সে সবে কান দিল না। ওদের দুজনকে টেনে হিঁচড়ে জাহাজঘাটায় নামল।
অন্য ভাইকিং বন্ধুরা অসহায়ভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। শাঙ্কো বলল—বিস্কো—এখন কী করবে?
—চলো—ওদের দু’জনকে একটা খুব জরুরি কথা বলতে হবে। কথাটা বলে বিস্কো ওদের আহত বন্ধু ও সৈন্যদের দলের দিকে ছুটল। শাঙ্কোও পেছনে পেছনে ছুটল। আহত দু’জন তখন যন্ত্রণাকাতর চিৎকার করে চলেছে।
বিস্কো ছুটে ওদের কাছে এলো। ওদের দেশীয় ভাষায় চিৎকার করে বলল—সাবধান সৈন্যদের বিষ খাইয়ে মেরেছো রাজার কাছে একথা কখনও বলবে না। বলবে—লড়াই হয়েছে। কথাটা দু’তিনবার বলে বিস্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। দলপতি বা পাহারাদার সৈন্যরা বিস্কোর কথা কিছুই বুঝল না। ওরা বন্দি দু’জনকে টেনে নিয়ে চলল। নিস্তব্ধ রাতে পথে বেশ কিছু দূর পর্যন্ত শোনা গেল বন্দি দু’জনের যন্ত্রণাকাতর চিৎকার আর্তনাদ। বড়ো করুণ সেই পরিবেশ।
শাঙ্কো কাছে আসতে বিস্কো বলল—চলো—এক্ষুণি ফ্রান্সিসকে সব বলতে হবে। একমাত্র ফ্রান্সিস ই রাজা ফ্রেডারিককে বলে ওদের প্রাণে বাঁচাতে পারে।
—কিন্তু এত রাতে ফ্রান্সিসদের সঙ্গে দেখা করতে দেবে? শাঙ্কো বলল।
-–উপায় নেই। দেখা করতেই হবে। চলো—দুর্গে যাবো। বিস্কো হাঁটতে শুরু করল শাঙ্কোও সঙ্গে চলল।
জনশূন্য অন্ধকার পথ দিয়ে ওরা দ্রুত হাঁটতে লাগল দুর্গের দিকে।
ওরা দুজনে দুর্গের প্রধান দেউড়ির সামনে এলো। লোহার বিরাট দরজা বন্ধ। লোহার মোটা গরাদের ফাঁক দিয়ে দেখল খোলা তলোয়ার হাতে সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছে।
বিস্কো সৈন্যদের বলল—বিশেষ দরকারে এসেছি ভাই। আমাদের একটা অনুরোধ রাখো। দু’জন সৈন্য হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বিস্কোর কথা কিছুই বুঝল না। তবু একজন গরাদের কাছে মুখ বাড়াল। বিস্কোর এতক্ষণে খেয়াল হ’ল ওরা তো ওর কোনো কথাই বুঝবে না। বিস্কো এবার বার বার বলতে লাগল—সাভোনা-সাভোনা। সৈন্যটি বুঝল এরা সাড়োনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। সৈন্যটি আঙ্গুল তুলে আকাশ দেখিয়ে বোঝাতে চাইল অনেক রাত হয়ে গেছে। কিন্তু বিস্কো হাল ছাড়ল না। বার বার সাভোনা সাভোনা বলতে লাগল। সৈন্যটি বুঝল বিস্কোকে নিরস্ত করা যাবে না। সৈন্যটি মাথা ওঠানামা করে সন্মতি জানাল। হাতের ইঙ্গিতে ওদের ওখানেই দাঁড়াতে বলল। তারপর পাথরের চত্বর পেরিয়ে চলল দুর্গের ঘরগুলোর দিকে।
অল্পক্ষণ পরেই সাভোনা এলো। দরজার কাছে এসে মশালের আলোয় বিস্কোদের চিনতে পারল। বলল—কী ব্যাপার? এত রাতে এসেছো?
—শিগগির ফ্রান্সিসকে আসতে বলুন। এরমধ্যে অনেক কা ঘটে গেছে। বিস্কো বলল। সাভোনা আর কোনো কথা বলল না। দুর্গের ঘরগুলোর দিকে চলে গেল।
একটু পরেই ফ্রান্সিস হ্যারি আর মারিয়া প্রায় ছুটতে ছুটতে এলো। দরজার কাছে এসে ফ্রান্সিস বলল—বিস্কো কী হয়েছে? এ্যাঁ?
—সে অনেক কথা। সব বলছি—শোনো। একটু থেমে বিস্কো ওদের দেশীয় ভাষায় আস্তে আস্তে সমস্ত ঘটনা বলল।
সব কথা শেষ হতে মারিয়া বলে উঠল—কী সাংঘাতিক! হ্যারি বলল—তোমরা ভেক্তরকে বাধা দিতে পারলে না?
—যখন জানলাম তখন যা ঘটার ঘটে গেছে। বিস্কো বলল। ফ্রান্সিস ঘটনা শুনতে শুনতে জোরে জোরে শ্বাস ফেলছিল। এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল-ভেক্তর আর আমার বন্ধুরা এরকম নির্মম কা ঘটাতে পারে স্বপ্নেও ভাবিনি। মানুষ কতটা নীচে নামলে এরকম নিষ্ঠুর কাজ করতে পারে। বিস্কো বলল—ভীষণ আহত বন্ধু দু’জনকে যেভাবে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছে—
—থামো—ফ্রান্সিস ধমকে উঠল—ঐ নৃশংস মানুষ দুটোকে কি রাজা ফ্রেডারিকের গাড়িতে চড়িয়ে নিয়ে যাবে?
—তবু—ওরা যে আমাদেরই বন্ধু। ওদের প্রাণে বাঁচাবার চেষ্টা করবেনা? বিস্কো বলল।
—না। ফ্রান্সিস ক্রুদ্ধস্বরে চিৎকার করে উঠল। হ্যারি মারিয়া অবাক চোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে থাকল।
—রাজা ফ্রেডারিককে তুমি যদি একবার অনুরোধ করো-বিস্কো বলল।
—বিস্কো—একটা কথা জেনো এভাবে কাপুরুষের মতো যারা মানুষকে হত্যা করে তাদের আমি বন্ধু বলে স্ফীকার করি না। আমি মরে গেলেও ওদের জন্য প্রাণভিক্ষা চাইবো না। ওদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত ওদেরই করতে দাও। ফ্রান্সিস থেমে থেমে কথাগুলো বলল। তারপর বলল-তোমরা যাও। আমি যা বললাম বন্ধুদের তা বুঝিয়ে বলল। কেউ যেন আমাকে ভুল না বোঝে। মারিয়া বা হ্যারি কোন কথা বলল না। ওরা ভালো করেই জানে ফ্রান্সিসকে কোনোভাবেই সঙ্কল্পচ্যুত করা যাবে না।
