বিস্কো ভেক্তরের দলের ভাইকিং বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলল—তোমরা যদি দেশে ফিরে যেতে চাও বলো তাহলে লিপারির ঐ ছোটো বন্দরটায় তোমাদের নামিয়ে দেব। কোনো জাহাজে উঠে তোমরা দেশে চলে যেও।
ভেক্তরের অনুগামীদের দুজন গুরুতর আহত হয়েছিল। অনেকেই মারাও গিয়েছিল। বাকিদের মধ্যে কয়েকজন বলল-না—আমরা তোমাদের ফ্রান্সিসদের ফেলে দেশে ফিরবো না। ফিরলে সবাই একসঙ্গে ফিরবো।—এই তো খাঁটি ভাইকিংদের মতো কথা। বিস্কো বলল।
দলপতি আর এলাইমোর সৈন্যরা নিজেদের জাহাজে চলে গেল। বিস্কো জাহাজ চালকের কাছে এল। বলল—বন্দরে ফিরে যাবো। জাহাজের মুখ ঘোরানো হ’ল।
তখন দুপুর। বিস্কোদের সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। রাঁধুনি বন্ধুরা রান্না শুরু করল। ওদের দফায় দফায় খেতে খেতে বিকেল হয়ে গেল। ততক্ষণে সমুদ্রে জোর হওয়া দাপাদাপি শুরু হয়েছে। জাহাজের সব পাল খুলে দেওয়া হ’ল। জাহাজ দ্রুত ঢেউ ভেঙে চলল সিরাকস বন্দরের দিকে। দলপতির জাহাজটাও পেছনে পেছনে আসতে লাগল। জাহাজ যখন সিরাকস বন্দরে পৌঁছল তখন রাত হয়েছে। ফ্রান্সিসদের জাহাজ জাহাজঘাটায় লাগতেই ঘাট থেকে এলাইমোর পাহারাদার কয়েকজন সৈন্যের ক্রুদ্ধ চিৎকার ভেসে এলো। বিস্কো শাঙ্কো রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিল। বিস্কো বুঝল ওদের জাহাজের দশজন পাহারাদার যে নিখোঁজ হয়েছে এটা এলাইমোর সঙ্গী সৈন্যরা জানতে পেরেছে। ভেক্তর ঝড়ের সময় জাহাজ নিয়ে পালিয়েছিল। কাজেই ওরা ধরে নিয়েছে ভাইকিংরা ওদের সঙ্গী পাহারাদারদের হত্যা করেছে।
ঘাটে পাটাতন ফেলতেই এলাইমো সর্ব প্রথমে উঠে এলো। পেছনে খোলা তলোয়ার হাতে আরো পাঁচ ছ’জন সৈন্য। সবারই মুখ থমথমে। বিস্কো বুঝল—ভীষণ সমস্যায় পড়ল ওরা। হ্যারি ছাড়া ওরা কেউই লো ল্যাতিন ভাষা জানেনা। ওরা কী করে এলাইমোকে সমস্ত ব্যাপারটা বলবে। কী করে বোঝাবে ঐ দশজনকে হত্যার জন্যে ওরা দায়ী নয়। স্পেনীয় ভাষায় চেষ্টা করে দেখা যাক। বিস্কো এগিয়ে এলো। স্পেনীয় ভাষায় বলল আপনাদের ভাষা আমি জানি না। আমি স্পেনীয় ভাষায় সব বুঝিয়ে বলছি।
এলাইমো গম্ভীর সুরে ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল—স্পেনীয় বুঝি ভালো বলতে পারি না। বলো সব।
বিস্কো থেমে থেমে আস্তে আস্তে ভেক্তরের দল পাকানো পাহারাদারদের হত্যা করা—পালনো—অন্য জাহাজের আক্রমণ ও ভেক্তর ও তার সঙ্গী অনেকের মৃত্যুসব বলল।
এলাইমো চুপ করে সব শুনল। তারপর বলল—তুমি মিথ্যা-সত্য কী বুঝবো?
বিস্কো দুশ্চিন্তায় পড়ল। ওর ভাগ্য ভালো। তখনই দলপতির সেই জাহাজটা জাহাজঘাটায় এসে লাগল। শাঙ্কো দেখল সেটা। শাঙ্কো চেঁচিয়ে বলল-বিস্কো সেই দলপতির জাহাজ এসেছে। আমি দলপতিকে নিয়ে আসছি। শাঙ্কো দ্রুত পায়ে পাতা পাটাতনের ওপর দিয়ে ছুটল।
বিস্কো এলাইমাকে বলল—আপনার সৈন্য বাহিনীর এক দলপতি সব ঘটনা দেখেছে—জানে সে আসছে সব বলবে আপনাকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দলপতিকে সঙ্গে নিয়ে শাঙ্কো ফিরে এলো। শাঙ্কো তখনও হাঁপাচ্ছে। সেনাপতি এলাইমোকে মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে দলপতি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এবার এলাইমো দলপতির কাছে সব জানতে চাইল। দলপতি আস্তে আস্তে সব ঘটনা বলল। আরো বলল—সে সন্দেহ করছিল ঐ কয়েকজন ভাইকিং তাদেরই সৈন্যদের হত্যা করে অস্ত্র পোশাক নিয়ে সশস্ত্র হয়েছিল। এটা যে সত্য তা সে এখানে এসে জানতে পেরেছে। এখানকার পাহারাদার সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলে।
এলাইমো বলল—সেই ভাইকিংরা কী করে সৈন্যদের হত্যা করেছিল কখন হত্যা করেছিল?
দলপতি মাথা নেড়ে বলল—সেটা কেউ বলতে পারছে না। বিস্কো ওদের সব কথা বুঝল না। কিন্তু এটা বুঝল যে এলাইমো জানতে চাইছে কী করে কখন জাহাজে পাহারাদার ওর সৈন্যরা মারা গেল। আশঙ্কায় বিস্কোর বুক কেঁপে উঠল। ভেক্তররা নির্মমভাবে ঐ পাহারাদারদের হত্যা করছিল। এটা যদি এলাইমো জানতে পারে তাহলে এলাইমো ক্ষিপ্ত হবেই। বিস্কোদের ওপর সে প্রতিশোধ নেবেই। তার অর্থ ওদের সবাইকে আত্মরক্ষার জন্যে লড়াই-এ নামতে হবে। ক’জন বাঁচবে আর ক’জনই বা জাহাজে চড়ে পালাতে পারবে?
ভাগ্য ভালো বলতে হবে। এলাইমো দলপতির দিকে তাকিয়ে বলল—এই বিদেশি ভাইকিংদের মধ্যে কারা তোমাদের সঙ্গে লড়াই করেছিল চিনিয়ে দিতে পারবে।
দলপতি উপস্থিত বিস্কো শাঙ্কে আর ওদের বন্ধুদের দেখে দেখে মাথা নেড়ে বলল——এরা লড়াই করেনি।
—তাহলে কারা লড়াই করেছিল? এলাইমা জানতে চাইল।
—তাদের বেশিরভাগই হয় মারা গেছে নয়তো আহত হয়েছে। দু’চারজন সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে পালিয়েছে। দলপতি বলল।
এলাইমো এবার বিস্কোর দিকে তাকাল। বলল–আহতরা কোথায়?
বিস্কো দ্রুত ভাবল বলবে আহত কেউ নেই। সব মরে গেছে। কিন্তু এলাইমো যদি জাহাজ খানাতল্লাশী করে তবে দু’জন আহত বন্ধু ধরা পড়ে যাবে। তখন মিথ্যে বলার জন্য ওদের সবাইকে বিপদে পড়তে হবে। কাজেই সত্যি কথাই বলতে হ’ল। বিস্কো বলল-আসুন।
বিস্কো নীচে নামার সিঁড়ির দিকে চলল। পেছলে এলাইমো। তার পেছনে দলপতিসহ চার-পাঁচজন সৈন্য। যে কেবিনঘরে আহত দুই ভাইকিং বন্ধু ছিল। বিস্কো সেই ঘরে ঢুকল। এলাইমো দলপতিও ঢুকল। আহত দু’জনের পরনে তখনও এলাইমোর সৈন্যদের সেই পোশাক। শুধু শিরস্ত্রাণ আর তলোয়ার নেই। একজন শুয়েই ছিল। তবে উরুতে কল মতো কাপড়ের মোটা ফেট্টি বাঁধা। অন্যজনের বাঁ কাঁধে ঐরকম মোটা ফেট্টি। দু’জনেই এলাইমোকে দেখে ভীষণভাবে চমকে উঠল। এলাইমো ওদের পোশাক দেখে থমকে দাঁড়াল। রাগে ওর দু’চোখ জ্বলে উঠল। এক ঝটকায় কোমর থেকে রুপালি বাঁটের তলোয়ার খুলে ফেলল। বিস্কো একলাফে এলাইমোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দু’হাত জোড়া করে বারবার বলতে লাগল—দোহাই ওদের হত্য করবেন না। রাজা ফ্রেডারিকের দরবারে নিয়ে চলুন। বিচার হোক ওদের। রাজা ফ্রেডারিক যা শাস্তি দেবেন মেনে নেবো। দুই আহত ভাইকিং-এর মুখ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। এলাইমো কী ভেবে তলোয়ার কোষবদ্ধ করল। দলপতিকে কী আদেশ দিয়ে কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
