ওরা ভেক্তরের দলের পাহারাদার দুজনকে অল্পক্ষণের মধ্যেই দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল। অস্ত্রঘরের একপাশে ওদের ফেলে রাখল। তলোয়ারেব ঘায়ে যারা আহত হয়েছিল তাদের দুজন বন্ধু নিয়ে চলল বৈদ্যির কাছে। এই প্রথম ভাইকিং বন্ধুরা বন্ধুর রক্ত ঝরালো। ওরা স্বপ্নেও ভাবেনি নিজেদের মধ্যে লড়াই হবে কোনোদিন।
ওরা এবার অস্ত্রঘর থেকে তলোয়ার বর্শা দ্রুত হাতে তুলে নিয়ে ছুটল ডেক-এ ওঠার সিঁড়ির দিকে।
ডেক-এ তখন বিস্কো আর শাঙ্কোর দুহাত দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়ে গেছে। ওদের বন্ধুর দল তলোয়ার বর্শা উঁচিয়ে ছুটে এলো ওদের মুক্ত করতে। ভেক্তরের দল তো আগে থেকেই যুদ্ধসাজে তৈরি হয়ে আছে। ওরাও ভেক্তরের নেতৃত্বে তলোয়ার উঁচিয়ে রুখে দাঁড়াল। ভাইকিংরা নিজেদের মধ্যে লড়াই-এর জন্যে প্রস্তুত তখন। লড়াইমৃত্যু রক্তপাত অনিবার্য।
বিস্কো বাঁধা দুহাত তুলে চিৎকার করে বলে উঠল –এ কী করছো? আমরা ভাইকিং এক দেশের মানুষ—ভাই আমরা—বন্ধু—আমরা পরস্পর লড়াই করবো—ভাইয়ের রক্তে হাত রাঙাবো? দুদলই থমকে দাঁড়াল।
শাঙ্কো চিৎকার করে বলল—ভেক্তর—এবার দেখো তুমি আমাদের কোথায় নিয়ে এসেছে। আমরা যারা এতদিন পরস্পরের জন্যে প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিলাম আজ
সেই আমরা পরস্পরের প্রাণ নেবার জন্যে তলোয়ার ধরেছি।
-ভাইসব বিস্কো চিৎকার করে বলল—অস্ত্র নামাও। দুদল ভাইকিংরাই একটু দ্বিার পর বিস্কোর কথা মেনে নিল। আস্তে আস্তে তলোয়ার নামাল। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
শাঙ্কো ভেক্তরের দিকে তাকিয়ে বলল—ভেক্তর এবার বলো তোমরা কী চাও? ভেক্তর বেশ রাগতস্বরে বলল—তোমাদের দুজনকে আমরা নিকেশ করে দিতাম। কিন্তু তা করিনি।
—কেন? বিস্কো বলল।—কারণ তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে গেলেও তোমরা আমাদের বন্ধু। বিস্কো দেখে বলল এখন আর সেকথা ওঠে না। আমরা পরস্পর আর বন্ধু নেই।
—যাক গে—ভেক্তর তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে বাঁ হাত ঘুরিয়ে বলল—তোমাদের দুজনকে কেবিনঘরে বন্দি করে রেখে আমরা জাহাজ চালিয়ে দেশে ফিরে যাবো।
—না—বিস্কো বলল—ফ্রান্সিসদের এইভাবে বিদেশের মাটিতে ফেলে রেখে আমি স্বর্গেও যেতে চাইনা, একটু থেমে বিস্কো বলল বরং সামনের কোনো বন্দরে আমরা নেমে যাবে। তারপর অন্য কোনো জাহাজে চড়ে সিরাকস বন্দরে ফিরে যাবো। ফ্রান্সিসের কাজ শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবো। ফ্রান্সিস কাউন্ট রজারের গুপ্তধন আবিষ্কার করবেই—এটা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
ভেক্তর হেসে বলল—ফ্রান্সিস জীবন থাকতে সেটা পারবে না।
—দেখা যাক—শাঙ্কো বলল—যদি তার জন্যে ফ্রান্সিস সারা জীবন এই সিসিলি দ্বীপেই থাকে তাহলে আমরাও থাকবো।
—ঠিক আছে—ভেক্তর বলল—তোমাদের সামনের বন্দরেই নামিয়ে দেওয়া ও হবে। কিন্তু তার আগে তোমাদের সবাইকে অস্ত্রত্যাগ করতে হবে। সব অস্ত্র অস্ত্রঘরে জমা রাখতে হবে। সেই অস্ত্রঘর একেবারে বন্ধ করে রাখা হবে যাতে তোমরা কেউ অস্ত্র হাতে নিতে না পারো।
বিস্কো শাঙ্কোর বন্ধুরা চেঁচিয়ে বলল—ঠিক আছে। কিন্তু তোমাদেরও অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে।
—না আমরা সশস্ত্রই থাকবো। ভেক্তর দৃঢ়স্বরে বলল। বিস্কো শাঙ্কোর বন্ধুরা চেঁচিয়ে উঠল— না।
বিস্কো বুঝল বিপদ। দুদলই যেভাবে উত্তেজিততে সংঘর্ষ, রক্তক্ষয় মৃত্যু অনিবার্য। বিস্কো বাঁধা দুহাত ওপরে তুলে চিৎকার করে বলে উঠল—থামো। উত্তেজিত দুদলই একটু থমকালো। উদ্যত তলোয়ার বর্শানামালো কেউ কেউ। বিস্কো চিৎকার করে বলতে লাগল –-ভাইসব—ভুলে যেও না আমরা ভাইকিং –এক জাতিআমরা পরস্পরের ভাই। একটু থেমে বিস্কো এবার ভেক্তরের দিকে তাকাল। বলল—ভেক্তর-তুমি আমাদের কোথায় নামিয়ে এনেছো দেখো। ভাই অস্ত্র ধরেছে ভাইয়ের বিরুদ্ধে।
—তার জন্যে আমি দায়ী নই। ভেক্তর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
—না—তুমিই দায়ী—বিস্কো বেশ গলা চড়িয়ে বলল—আমাদের মতো যারা জাহাজে জাহাজে দেশ দেশান্তর ঘুরে বেড়ায় মাটির প্রতি তাদের তীব্র আকর্ষণ থাকে। আবার সেই মাটি যদি হয় স্বদেশের মাটি তাহলে সেই আকর্ষণ হয়ে ওঠে আরো দুর্বার। তুমি আমার বন্ধুদের সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে। আমাদের বন্ধুদের ক্ষেপিয়ে তুলে—বিস্কো কথাটা শেষ করতে পারলো না।
ভেক্তর এক লাফ দিয়ে ছুটে এসে বিস্কোর বুকে তলোয়ারের ডগাটা চেপে ধরল। দাঁত-চাপাস্বরে বলল—আর একটা কথা বললে তোমাকে নিকেশ করবো। বিস্কোর বন্ধুরা বুঝে উঠতে পারলোনা কী করবে। ভেক্তর ওদের দিকে তাকিয়ে বলল—তোমরা হাতের অস্ত্র ফেলে দাও। ওরা তখনও বিস্ময়বিমূঢ়। ভেক্তর চেঁচিয়ে বলল—অস্ত্রত্যাগ কর নইলে বিস্কোর প্রাণ যাবে। বিস্কোও বলে উঠল—অস্ত্র রেখে দাও। ওরা অবস্থার গুরুত্ব বুঝতে পারল। ওরা বুঝল এখন লড়াইয়ে নামলে ভেক্তর প্রথমেই বিস্কোকে হত্যা করবে। ওরা আস্তে আস্তে হাতের তলোয়ার বর্শা ডেক-এর ওপর ফেলে দিল। শব্দ হল ঝনাৎ—ঝন্ ঝনাৎ।
ওদিকে পুব আকাশে সূর্য উঠেছে। ভোরের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্রের নীলাভ জলে জাহাজে। সমুদ্র বেশ শান্ত।
ভেক্তর ওর সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বলল—তোমরা চারজন বিস্কো আর শাঙ্কোকে নিয়ে যাও। একটা ঘরে ওদের দুজনকে বন্দি করে রাখো। দরজায় তালা দিয়ে সবসময় একজন পাহারা দেবে। বাকি এই অস্ত্রগুলো নিয়ে অস্ত্রঘরে রেখে দাও। দরজায় তালা দিয়ে দুজন পাহারায় থাকবে।
