কিছুক্ষণ পরেই ঝড়ের প্রচরতা কমল। আকাশে মেঘ কেটে যেতে লাগল। সমুদ্র শান্ত হতে লাগল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। ভাঙা অনুজ্জ্বল চাঁদটা দেখা গেল। বাতাসের বেগ অনেক কমে গেল। সমুদ্র শান্ত হল।
অন্য ভাইকিং বন্ধুদের সঙ্গে বিস্কো আর শাঙ্কো রাতের খাবার খেতে খাবার ঘরে এলো। বিস্কো আর শাঙ্কো ওদের শিরস্ত্রাণ বর্ম পরা দেখে বেশ আশ্চর্য হল।
বিস্কোর সঙ্গী কয়েকজনও অবাক। ওদের কোমরে বাঁধা তলোয়ারও সোজা লম্ফাটে। বাঁকা নয়।
বিস্কো এগিয়ে গিয়ে ভেক্তরকে জিজ্ঞেস করল—কী ব্যাপার? এলাইমোর সৈন্যদের অস্ত্রশস্ত্র তোমরা পেলে কী করে?
—এলাইমোর পাহারাদার সৈন্যরা কেউ বেঁচে নেই। ভেক্তর বলল।
—তার মানে? শাঙ্কো বলে উঠল।
—ওদের নির্দেশ করা হয়েছে। ভেক্তরের পাশে দাঁড়নো সঙ্গীটা বলল। বিস্কো চেঁচিয়ে বলে উঠল—সর্বনাশ। আমাদের দুপাশে এলাইমোর জাহাজ ঘিরে আছে। ওরা এই হত্যার কথা জানতে পারলেই আমাদের আক্রমণ করবে। তখন নিরস্ত্র আমরা কেউ বাঁচবো না। ফ্রান্সিসদেরও মেরে ফেলা হবে।
একটু থেমে বিস্কো বলল তোমাদের কে বলেছে ওদের একেবারে প্রাণে মেরে ফেলতে?
—আমি বলেছি। ভেক্তর গম্ভীর গলায় বলল।
—এরকম একটা সাংঘাতিক কাজ করলে তুমি? শাঙ্কো বলল।
ভেক্তর বেশ ঠাণ্ডা মেজাজে বলল—এখন এলাইমোর দুটো পাহারাদার জাহাজ অনেক দূরে।
—তার মানে? বিস্কো বেশ আশ্চর্য হয়েই বলল।
—আমাদের জাহাজ এখন মাঝ সমুদ্রের দিকে চলেছে। ডেক-এ উঠে দেখগে। ভেক্তরের একজন সঙ্গী বলল।
—বলো কি? বিস্কো শাঙ্কোর মুখের দিকে তাকাল।
তারপরে দুজনেই ছুটল ডেক-এ ওঠার সিঁড়ির দিকে। ডেক-এ উঠে দেখল জাহাজের পাল খাটানো হয়েছে। জোর বাতাসে ভোলা পাল ফুলে উঠেছে। জাহাজ দ্রুত চলেছে ঢেউ ভেঙে। বিস্কো ভেবে পেল না এখন কী করবে। শাঙ্কোও অবাক।
তখনই ভেক্তরওর সশস্ত্র সঙ্গীদের নিয়ে ডেক-এ উঠে বিস্কোদের কাছে এলো। বিস্কো ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল—ভেক্তর—জাহাজ ফেরাও সিরাকস বন্দরের দিকে। ফ্রান্সিসদের ফেলে রেখে আমরা দেশে ফিরতে চাই না। ভেক্তর কুটিল হাসি হাসল—ফ্রান্সিসের কথা ভুলে যাও। এখন এই জাহাজের ক্যাপ্টেন আমি। আমি যা বলবো তাই হবে। আমি হুকুম দিয়েছি জাহাজ দেশের দিকে চালাতে। কিন্তু ফ্রান্সিসের এই বিদেশ বিভূঁইয়ে ফেলে রেখে আমরা চলে যাবো? ফ্রান্সিস হ্যারি মারিয়া—এরা কি আমাদের বন্ধু নয়? শাঙ্কো বলল।
—ফ্রান্সিসের পাগলামিকে আমরা আর প্রশয় দেব না। ভেক্তরের এক কী বলল।
—ভেক্তর—বিস্কো বলল তুমি এই অভিযানে প্রথম এসেছে। তাই জানো না ফ্রান্সিস কতশক্ত শক্ত ধাঁধার সমাধান করেছে। সোনার ঘন্টা, দু সের ডিমের মতো মুক্তো উদ্ধার করেছে। ফ্রান্সিসের চেয়ে হয়তো বেশি বলশালী তুমি। কিন্তু ফ্রান্সিসের বুদ্ধি চিন্তা ধীরশক্তির কাছে তুমি ছেলেমানুষ। সবচেয়ে বড়ো কথা—ফ্রান্সিস বন্ধুদের বাঁচাবার জন্যে নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত সবসময়—যেকোনো মুহূর্তে। একটু থেমে বিস্কো বলল—আজ তুমি ফ্রান্সিসের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছো—কিছু বন্ধুকে ক্ষেপিয়ে—।
বিস্কো কথাটা শেষ করতে পারল না। ভেক্তর একটানে কোমর থেকে তলোয়ার খুলে বিস্কোর ওপর তলোয়ারের ডগাটা চেপে ধরল। কঠিনস্বরে বলল—এই জাহাজে যে আমার হুকুম অমান্য করবে তাকেই বন্দি করে রাখবো।
বিস্কো শাঙ্কোর পেছনে দাঁড়ানো কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু চিৎকার করে বলল—তোমার হুকুম আমরা মানবো না। আমাদের নেতা ফ্রান্সিস ওরা এই কথা বলেই ছুটলো নিচে নামার সিঁড়ির দিকে। লক্ষ্য অস্ত্রঘর।
ওরা অস্ত্রঘরের সামনে এসে দেখল—ভেক্তরের দলের দুজন ভাইকিং উষ্ণীষ বর্ম পরে খোলা তলোয়ার হাতে অস্ত্রঘর পাহারা দিচ্ছে। ওরা বুঝল ভেক্তর দল পাকিয়েছে। ওদের দেশে ফেরার লোভ দেখিয়েছে। অনেকদিন ওরা দেশ ছেড়ে এসেছে। দেশে ফেরার জন্য ওরা আকুল হয়ে উঠেছে। কাজেই সহজেই ভেক্তরের দলে গিয়ে ভিড়েছে। ভুলে গেছে ফ্রান্সিস হ্যারি মারিয়ার কথা। যে দুজল এলাইমোর সৈন্যদের পোশাক পরে অস্ত্রঘর পাহারা দিচ্ছে তারা তো ভাইকিং ওদের সুখদুঃখের বন্ধু। ভাইয়ের মতো। স্বদেশবাসী। ওদের দুজনকে কাবু করা যায়। কিন্তু তাতে রক্তপাত হবেই। ভেক্তরের বিরোধীরা বুঝে উঠতে পারলনা এখন কী করবে। ওদিকে জাহাজ চলেছে। সিরাকসবন্দর থেকে অনেকটা চলে এসেছে। জাহাজ এখনি ফেরাতে হবে।
ফ্রান্সিসের বন্ধুরা অস্ত্রঘরের সামনে থেকে সরে এলো। নিজের মধ্যে নিচুস্বরে কথা বলল। স্থির হল ঐ দুজন ভেক্তরের দলের পাহারাদারকে আক্রমণ করে ত ঘর দখল করতে হবে।
ওরা পরামর্শ সেরে আস্তে আস্তে অস্ত্রঘরের দিকে চলল। তারপর একসঙ্গে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঐ দুজন পাহারাদারের ওপর। আচমকা এই আক্রমণে পাহারাদার দুজন কিছুই বুঝে উঠতে পারলোনা। একজল তো ছিটকে কাঠের মেঝেয় পড়ে গেল। ওর হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। অন্যজন কিন্তু দ্রুত হাতে তলোয়ার চালাতে লাগল। নিরস্ত্র দু’তিনজন কাঁধে বুকে তলোয়ারের ঘা লেগে আহত হল। রক্তে ভিজে গেল ওদের শরীর। কিন্তু পাহারাদারটি ততক্ষণে কাঠের মেঝেয় ওদের ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেছে। একজন ওর তলোয়ার ধরা হাতটা বাঁটসুষ্ঠু পা দিয়ে চেপে ধরল। ও যন্ত্রনায় কঁকিয়ে উঠে তলোয়ার ছেড়ে দিল।
