—যদি খাবারের সঙ্গে খেয়ে ফেলে? ভেক্তর জানতে চাইল।
—তবে একটু দেরি হবে মানে বিষের কাজ শুরু হলেই মারা যাবে। বৈদ্যি একটু থেমে হেসে বলল—তবে শখ করে কেউ খাবারের সঙ্গে বা জলের সঙ্গে খেতে যাবে নাকি?
—কিন্তু শত্রু মারতে তো এই ওষুথটা কাজে লাগানো যায়। ভেক্তর বলল।
—হ্যাঁ তা যায় বৈকি? বৈদ্যি বলল। বৈদ্যির শিয়রের কাছেই কাঠের তক্তার ওপর সাজানো ওষুধের কাঁচের বোয়ামগুলোর দিকে ভেক্তর তাকালো তারপর হাত বাড়িয়ে হলুদ বোয়ামটা নিল। তাক থেকে কিছুটা কাগজ ছিঁড়ে নিল। বোয়োমের মুখ খুলল।
বৈদ্যি হাত তুলে চেঁচিয়ে বলল—কী করছো ভেক্তর?
ভেক্তর বলল—এই ওষুধ কিছুটা নিচ্ছি। বলা যায় না যদি হঠাৎ দরকার পড়ে ভেক্তর হাত ঢুকিয়ে বেশ কিছুটা হলুদ রঙা ওষুধ টুকরো কাগজটায় রাখল। তারপর বোয়াম তুলে রাখল। বৈদ্যি কী বললে বুঝে উঠতে পারল না। চুপ করে রইল। ভেক্তর ওষুধটা নিয়ে কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে এলো। কেবিনঘরের তিনজন ভাইকিং দেখল। কিন্তু বুঝল না কিছুই।
ভেক্তর কিছুক্ষণ পরে ডেক-এ উঠে এলো। সঙ্গী ছজনকে ইশারায় ডাকল। ওরা কাছে এলে ভেক্তর ওদের সঙ্গে নিয়ে এলাইমোর পাহারাদার সৈন্যদের কাছে গেল। হেসে বলল—সৈন্যভাইরা একটা কথা বলছিলাম। সৈন্যরা ওর স্পেনীয় ভাষা বুঝল না। এবার ভেক্তর হেসে হেসে হাতের ইঙ্গিতে ওদের একসঙ্গে খেতে আমন্ত্রণ জানাল। সৈন্যরা কিছুটা বলল। কেউ কেউ হাসল।
ভেক্তরের নির্দেশমতো হালের কাছে ডেক-এর ওপর ততক্ষণে দুজন ভাইকিং দুসারিতে পাতা কাঠের থালায় গরম রুটি ভেড়ার মাংসের ঝোল সাজিয়ে দিয়েছে। এবার এলাইমোর সৈন্যরা বুঝল। ভেক্তর হেসে ওদের খেতে আসতে বলল। সৈন্যরা খুব খুশি। খোলা তলোয়ার কোমরের খাপে ঢুকিয়ে রেখে খেতে এলো। ভেক্তর হেসে হেসে ওদের একটা সারিতে বসতে বলল। সৈন্যরা খেতে বসে পড়ল। অন্য সারিটার সামনে বসল ছ জন সঙ্গীসহ ভেক্তর। সবাই খাওয়া শুরু করল।
ভেক্তর খাচ্ছে কিন্তু ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রয়েছে সৈন্যদের দিকে। খেতে খেতে হঠাৎ একজন সৈন্য ওয়াক তুলে বমি করবে বলে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু দুপা এগিয়েই কাঠের ডেক-এ গড়িয়ে পড়ল। অন্য একজন সৈন্য কয়েকবার ওয়াক তুলে শুয়ে পড়ল। একে একে সাতজন সৈন্যই বিষাক্ত খাবার খেয়ে মারা পড়ল। ঠিক তখনই সমুদ্রের স্তব্ধ পরিবেশে একটা শোঁ শোঁ শব্দ উঠল। পর মুহূর্তেই প্রচুর ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়ল জাহাজটার ওপর। কালো দেয়ালের মতো ঢেউ ভেঙে পড়ল জাহাজের ডেক-এ। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল, গম্ভীরধ্বনিতে বাজ পড়ল। শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি সেইসঙ্গে মুহুর্মুহু আকাশ জুড়ে বাজ পড়া।
ভীষণ দুলছে জাহাজটা। ওর মধ্যেই ভেক্তর চেঁচিয়ে বলল—সৈন্যদের উষ্ণীর বর্ম তলোয়ার খুলে নাও।
ওর ছজন সঙ্গী ঝাঁপিয়ে পড়ল সৈন্যদের ওপর।
সৈন্যরা তখন কেউ কেউ মারা গেছে। কেউ কেউ জ্ঞান হারিয়েছে। তীব্র বিষের ক্রিয়া শুরু হয়েছে তখন। উষ্ণীষ বর্ম তলোয়ার খুলে নিয়ে ভেক্তরের সঙ্গীরা মৃত সৈন্যদের হালের দিকের রেলিঙের কাছে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এলো। তারপর গড়িয়ে ফেলে দিল ঝড়বিক্ষুদ্ধ সমুদ্রের জলে। ভেক্তরের সঙ্গীরা সৈন্যদের উষ্ণীষ মাথায় পরল। বৰ্ম বুকে বাঁধল। তলোয়ার খাপে গুঁজে রাখল। এত কা দুপাশের পাহারাদার জাহাজ থেকে এলাইমোর কোনো দেখতে পেল না। কারণ প্রচ ঝড়ে দুটো জাহাজই ঢেউয়ের ধাক্কায় প্রবল বেগে উঠছে পড়ছে।
অন্ধকারে চারপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। এলাইমোর পাহারাদার জাহাজ দুটো বৃষ্টির ঝাঁপটার সাদা ধোঁয়াটে আস্তরণের মধ্যে দিয়ে ঝাপসা দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের ধাক্কায় উঠছে পড়ছে। ভীষণভাবে এপাশে-ওপাশে দুলছে। হঠাৎ কখনো বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানিতে জাহাজ দুটো দেখা যাচ্ছে। পরক্ষণেই বৃষ্টির ঝাঁপটায় ধোঁয়াটে চারপাশ।
ফ্রান্সিসদের জাহাজেও চলছে প্রচুর দুলুনি। কেউ ভালো করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। প্রায় সব ভাইকিংরাই সিঁড়ি দিয়ে নিজে কেবিনঘরে নেমে গেছে। ভেক্তরের দুজন সঙ্গী মাস্তুল আঁকড়ে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে। ভেক্তর এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। ও নিজে তখনও ডেক-এ রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে আছে ওর তখন লক্ষ্য নোঙর তুলে জাহাজ গভীর সমুদ্রে নিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের আলোয় ভেক্তর দুজন সঙ্গীকে দেখল। ও ডেক-এর ওপর হামাগুড়ি দিয়ে কখনও গড়াতে গড়াতে ঐ সঙ্গী দুজনের কাছে এলো। সঙ্গী দুজনের কানের কাছে মুখ এনে চিৎকার করে বলতে লাগল—শিগগির নোঙর তোল। নোঙর তোল জাহাজ ছাড়ো মাঝ সমুদ্রের দিকে। জলদি—। সঙ্গী দুজন মাস্তুল ছেড়ে ডেক-এ বুক দিয়ে শুয়ে পড়ল। অন্ধকারে হিঁচড়ে হিঁচড়ে চলল নোঙর বাঁধা দড়ির দিকে। বেশ কসরৎ করে অনেক কষ্টে নোঙর তুলে ফেলল।
নোঙর তোলা হতেই ঝড়ের প্রচ ধাক্কায় জাহাজটা কাত হয়ে যেন ছুটে চলল।
এতসব কাণ্ড ঘটেছে বিস্কো শাঙ্কো তার কিছুই জানে না। ওরা তখল নিজেদের কেবিনঘরে। বিস্কো বিছানায় শুয়ে আছে। শাঙ্কো ওর বিছানায় বসে বিস্কোর সঙ্গে গল্পগুজব করছে। সেই কেবিনঘরে আরো দুজন ভাইকিং বন্ধু বিছানায় বসে ছক্কা পাঞ্জা খেলছে। র জাহাজ যে সমুদ্রে ভেসে চলেছে এটা জাহাজের দুলুনিতে ঝড়ের মাতমে ওরা বুঝতেও পারে নি।
