সাভোনা দ্রুত ফ্রান্সিসের কথাগুলো বলে গেল। মোরাবিত চুপ করে দাঁড়িয়ে হাঁপতে লাগল। মন দিয়ে শুনল কথাগুলো। পাথুরে পথে ছিটকে পড়া সৈন্যটি আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। অন্য সৈন্যটি তলোয়ার উচিয়ে ছুটে এলো। ফ্রান্সিস মোরবিতকে ছেড়ে দিয়ে দু’হাত তুলে সৈন্যটির দিকে এগিয়ে এলো চেঁচিয়ে বলল—সাভোনা মোরাবিতকে অস্ত্রত্যাগ করতে বলুন। সাভোনাও চিৎকার করে কথাটা বলল। মোরাবিত হাতের তলোয়ার ফেলে দিল। পাথুরে রাস্তায় শব্দহল ঝনাৎ। সৈন্যটি তলোয়ার নামাল। ফ্রান্সিস মোরাবিতকে ধরে নিজেদের ঘরের দিকে চলল। পেছনে পেছনে চলল সাভোনা হ্যারি আর মারিয়া।
যেতে যেতে মোরাবিত ক্রুদ্ধভঙ্গীতে বিড়বিড় করে কী বলতে লাগল। ফ্রান্সিস বুঝল না। ও গলা চড়িয়ে বলল-–সাভোনা—মোরাবিকে বলো—ও যেন আমার ওপর বিশ্বাস রাখো। যদি সত্যিই শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে নামতে হয় তবে আমি আর আমার বীর বন্ধুরা ওর পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করবো। মৃত্যু হলে মৃত্যুকে মেনে নেব। মোরাবিত যেন এখন আমাদের ভুল না বোঝে। সাভোনা ফ্রান্সিসের কথাগুলো মোরাবিতকে বলে গেল। মোরাবিত একবার ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকাল। কোনো কথা বলল না। শান্তভাবে হাঁটতে লাগল।
ওদিকে ফ্রান্সিসদের জাহাজে কয়েকজন ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হল। এদের মধ্যে ভেক্তর বন্ধুদের এই ক্ষোভকে কাজে লাগাল। আগের কোনো অভিযানে ভেক্তর ফ্রান্সিসদের সঙ্গে আসেনি। এবারই প্রথম। ও ক্ষুদ্ধ বন্ধুদের কয়েকজনকে বোঝাতে লাগল—এভাবে বিদেশ বিভুইয়ে দিনের পর দিন পড়ে থাকা অর্থহীন। ফ্রান্সিসরা পড়ে থাকুক। চলো আমরা জাহাজের দখল নিয়ে দেশের দিকে জাহাজ চালাই ফ্রান্সিসরা না হয় পরে অন্য কোনো জাহাজে দেশে ফিরবে।
দু’একদিনের মধ্যে ভেক্তরের এইসব কথাবার্তা শুনে বেশ কয়েকজন বন্ধুর মধ্যে বিক্ষোভ দানা বাঁধল। জাহাজে ফ্রান্সিস আর হ্যারি নেই। বিস্কো আর শাঙ্কো এই বিক্ষোভ আঁচ করতে পারল না। ওদের তখন চিন্তা ফ্রান্সিস গুপ্তধন খুঁজে বের করতে পারল কিনা।
সেদিন দুপুর থেকেই অসহ্য গুমোট আবহাওয়া। সমুদ্রে বাতাস পড়ে গেছে। জলে শান্ত ঢেউ। গরমে ভাইকিংরা দুপুরে কেউ ঘুমুতে পারল না।
বিকেল হতে গরম একটু কমল বটে কিন্তু গুমোট ভাবটা কাটল না।
সন্ধের সময় ভেক্তর বিক্ষুদ্ধ বন্ধুদের জড়ো করল জাহাজের হালের দিকে। মাস্তুলের আর সিঁড়িঘরের আড়ালে পড়া জায়গাটায়। এখানে ডেক-এর ওপর ভেক্তর বিক্ষুদ্ধ বন্ধুদের নিয়ে একটা ছোটোখাটো সভা মতো বসাল। ভেক্তর আগের কথাগুলোই বলল।
এবার একজন ভাইকিং বলল—কিন্তু—আমাদের জাহাজ তত সেনাপতি এলাইমোর দুটো জাহাজ পাহারা দিচ্ছে। আমাদের জাহাজেও রয়েছে আটজন সশস্ত্র পাহারাদার সৈন্য।
এরমধ্যে আমরা জাহাজ নিয়ে পালাবো কী করে?
ভেক্তর বলল—সেসব পরিকল্পনা আমার ছকা হয়ে গেছে। তোমরা জাহাজ নিয়ে পালাতে রাজি কি না সেটা আগে বলো। প্রায় সকলেই বলে উঠল—হ্যাঁ—আমরা রাজি।
—প্রয়োজনে এলাইমার সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামতে হবে। বলল—তোমরা রাজি। ভেক্তর বলল।
সবাই বলে উঠলো-–হ্যাঁ হ্যাঁ রাজি।
একজন ভাইকিং বলে উঠল—আমরা বহুদিন হল দেশ ছেড়ে এসেছি। এখানে-ওখানে বিদেশে বিভূঁইয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আর নয়। এবার দেশে ফিরবো। কোনো বাধা আমরা মানবো না। প্রায় সকলেই তার কথা সমর্থন করল।
ভেক্তর বলল আমার সঙ্গে ছজন থাকো। বাকিরা তৈরি থাকো আমি বলার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ ছাড়ার জন্য। যত দ্রুত সম্ভব জাহাজ চালিয়ে পালাতে হবে। একটু থেমে ভেক্তর বলল এবার সবাই চলে যাও। তারপর বলল—বিস্কো শাঙ্কো যেন ঘুণাক্ষরেও আমাদের এই পরিকল্পনা জানতেনা পারে। ওদের সঙ্গে অন্য যারা ফ্রান্সিসের জন্য এখানেই অপেক্ষা করতে চাইবে বা আমাদের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যাবে প্রয়োজনে তাদের বন্দি করবো। একটু থেমে ভেক্তর বলল এখন সবাই যাও। এমন স্বাভাবিকভাবে থাকবে যেন কেউ তোমাদের সন্দেহ না করতে পারে। সভা ভেঙে গেল। সবাই চলে গেল। এবার ছজন সঙ্গীকে ভেক্তর বলল—তোমরা কাছাকাছি থাকো। প্রয়োজন পড়লেই তোমাদের যেন হাতের কাছে পাই।
ভেক্তর পশ্চিম আকাশের দিকে তাকাল। দেখল আকাশে গভীর লাল রঙ ছড়িয়ে “ আছে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। ভেক্তর সেইদিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে লাগল।
জাহাজের কেবিনঘরে বিস্কো শাঙ্কো আর ভাইকিংরা ভেক্তরের এই পরিকল্পনার কথা কিছুই জানতে পারল না। জানতেও পারল না ওপরে ডেক-এ জড়ো হয়ে ভেক্তর আর ভেক্তরের সঙ্গীরা কী মতলব করছে।
রাত হল। রাত বাড়তে লাগল। ভাইকিংদের রাতের খাওয়ার সময় হয়ে এলো।
ভেক্তর একা ডেক থেকে নেমে এলো। যতটা নিঃশব্দে সম্ভব ও এলো ওদের বৈদ্যির কাছে। কেবিনঘরে যে তিনজন ভাইকিং বন্ধু ছিল তারা ভেক্তরেরই দলের লোক। বৈদ্যি বিছানায় শুয়ে ছিল। ভেক্তর বৈদ্যির পিঠে হাত চেপে বলল এই ওঠো। কথা আছে।
বৈদ্যি উঠে বসল। বলল—কে আবার অসুখে পড়ল?
ভেক্তর গলা নামিয়ে বলল। কেউ না। একটা কথা—তুমি যে ওষুধগুলো দাও তারমধ্যে বিষাক্ত ওষুধও তো আছে।
—হ্যাঁ আছে বৈকি। কাটা ঘায়ে যে হলুদ রঙের ওষুধটা লাগাই ওটা কেউ ভুলে খেয়ে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে মারা যাবে। কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না। বৈদ্যি বলল।
