—বেশ—চলুন। সাভোনা উঠে দাঁড়াল। হ্যারি মারিয়া মোরাবিতও উঠে দাঁড়াল। সবাই চলল দুর্গের ছোটো গীর্জাটার দিকে। মোরাবিত এখন অনেকটা সুস্থ। ওর হেঁটে যেতে কোনো কষ্ট হচ্ছিল না।
গীর্জায় তখন ধমর্যাজকের বাইবেল পাঠ চলছে। ফ্রান্সিসরা গীর্জাটায় সামনের দিকে কিছুটা দূরে পাথরের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। একটু পরেই শুরু হল প্রার্থনা সংগীত। ল্যাতিন ভাষায় রচিত প্রার্থনা সংগীতের অর্থ ফ্রান্সিস হ্যারি মারিয়া বুঝল না। সাভোনা আর মোরাবিত বুঝল। ফ্রান্সিসরা গানের অর্থ বুঝলোনা কিন্তু গানের সুর বড়ো ভালো লাগল। সকালের উজ্জ্বল রোদে বাতাসে আকাশের নীলে ছড়িয়ে যাওয়া গানের সুর এক সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করল। মারিয়া অস্ফুটস্বরে বলে উঠল—অপূর্ব। ফ্রান্সিস ও বলে উঠল—সুন্দর গান। সাভানো বলল—এই গান কার রচনা জানেন? ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল।
—কাউন্ট রজারের। সাভোনা হেসে বলল।
—বলেন কি? হ্যারি বলে উঠল।
—হ্যাঁ—কাউন্ট রজারের অনেক এরকম খৃষ্টবন্দনা গীতি এই দক্ষিণ সিসিলিতে আজও গাওয়া হয়। সাড়োনা বলল তাহলে তো কাউন্ট রজার শুধু রাজাই দিলেন না—গীতশিল্পীও ছিলেন। মারিয়া বলল।
—সাভোনা একটু মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল।
গীর্জায় বন্দনাগীতি শেষ হল। গীর্জা থেকে স্ত্রী পুরুষরা বেরিয়ে আসতে লাগলেন। তাঁরা রাজাপরিবার অমাত্যদের পরিবারের স্বজন আত্মীয়। স্ত্রীলোকদের পোশাকে কত পারিপাট্য। কত সাজসজ্জা। পুরুষরাও দামি পোশাক পরেছেন। কথাবার্তা বলতে বলতে তাঁরা দুর্গের প্রশস্ত পথ ধরে অন্দরমহলের দিকে চললেন। তারা কথা বলতে বলতেও উৎসুক্যের সঙ্গে ফ্রান্সিসদের এক নজর দেখে গেলেন। বিশেষ করে মারিয়াকে। মারিয়া এতক্ষণে নিজেদের পোশাক সম্পর্কে সচেতন হল। দেখল নিজের পোশাকটা একসময় দামি কাপড়ে তৈরি করা হয়েছিল। এখন কাপড়ের রঙ জ্বলে গিয়ে ব্যবহারে একেবারে ন্যাকড়ার মতো হয়ে গেছে। ফ্রান্সিসের হ্যারির পোশাকেরও এক অবস্থা। মারিয়ার মন খারাপ হয়ে গেল।
ফ্রান্সিসরা ফিরে আসতে লাগল। পথে মারিয়া কতকটা আপন মনে বলল আমাদের পোশাক-আশাকের যা ছিরি হয়েছে। ওঁদের সামনে লজ্জাই করছিল। ফ্রান্সিসদের মাথায় তখন গুপ্তধনের চিন্তা। ও অন্যমনস্ক ছিল। তবু কথাটা ওর কানে গেল।
ও মারিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল। বলল—মারিয়া পোশাক নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কী আছে। আসল তো মানুষটা যে পোশাক পরে। ভালো ভালো পোশাক তো দোকানেই কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু মানুষের প্রতি মমত্ববোধ নীতিবোধ মনের উদারতা এসব তো দোকানে কিনতে পাওয়া যায় না। এসব অনেক কষ্টে অর্জন করতে হয়। বলো ঠিক কিনা।
মারিয়া একটু চুপ করে থেকে বলল তুমি এতসব ভাববা?
—নিশ্চয়ই—ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল—জীবন আমাকে অনেক কিছু খয়েছে। মারিয়া। মারিয়া আর কোনো কথা বলল না।
ওরা পাথুরে পথটার একটা বাঁকে এলো। ডানদিকের পথটা দুর্গে ওদের ঘরের দিকে চলে গেছে। সোজা পথটা গেছে দুর্গের প্রধান দেউড়ির দিকে।
হঠাৎ মোরাবিত দাঁড়িয়ে পড়ল। ক্রুদ্ধস্বরে কী বলতে লাগল। হ্যারি লো ল্যাতিন ভাষায় বলা কথাগুলো বুঝল। হ্যারি বলে উঠল—সর্বনাশ।
ফ্রান্সিস বলল—কী ব্যাপার হ্যারি
মোরাবিত বলছে—ওর সহযোদ্ধারা জলে জঙ্গলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কী কষ্ট সহ্য করছে ওরা আর আমি এখানে নিশ্চিন্তে খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমোচ্ছি। আমি পালাবো।
তখনই দেখা গেল সাভোনা মোরাবিতের দুহাত ধরে কী বোঝাচ্ছে ওকে। মোরাবিত এল মাথা নাড়তে নাড়তে হঠাৎ এক ঝাঁকুনিতে সাভোনার হাত ছাড়িয়ে সদর দেউড়ির দিকে দ্রুত ছুটল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ওর পেছনে ছুটতে শুরু করল। ডাকতে লাগল মোরাবিত—মোরাবিত। ঠিক তখনই দুজন সৈন্য ওদিক থেকে মোড় ঘুরে মোরাবিতের সামনে এসে পড়ল। মোরাবিতকে ওরা চেনে। সঙ্গে সঙ্গে সৈন্য দুজন খাপ থেকে দ্রুতহাতে তলোয়ার খুলে ফেলল। তলোয়ার উঁচিয়ে দাঁড়াল। মোরাবিত দাঁড়িয়ে পড়ল। একজন সৈন্য দুপা এগিয়ে এসে মোরাবিতের কাধ লক্ষ্য করে তলোয়ার চালাল। মোরাবিত এক লাফে সরে এলো। তলোয়ারের কোপ লাগল না। সেই সৈন্যটি তলোয়ার উচিয়ে ধরার আগেই মোরাবিত শুন্যে লাফিয়ে উঠে সৈন্যটির বুকে লাথি চালাল। সৈন্যটি ছিটকে পাথুরে রাস্তায় পড়ে গেল। ওর হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে পড়ে গেল। মোরাবিত দ্রুত হাতে নিচু হয়ে তলোয়ারটা তুলে নিয়েই অন্য সৈন্যটির মুখোমুখি দাঁড়ল। সৈন্যটি তলোয়ার হাতে মোরাবিতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মোরাবিতের বুকে তো বর্ম নেই। তলোয়ারের ফলা ওর বুক ছুঁয়ে গেল। বুক লম্ফালম্ফি কেটে গেল। রক্ত বেরোলো।
মোরাবিত সৈন্যটার ওপর লাফিয়ে পড়ার আগেই ফ্রান্সিস পেছন থেকে মোরাবিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। চেঁচিয়ে বলল—সাভোনা—মোরাবিতকে বলুনা ও যদি সত্যি ওর মাতৃভূমিকে ভালোবাসে ওর বিদ্রোহী বন্ধুদের ভালোবাসে তবে যেন এক্ষুণি অস্ত্রত্যাগ করে। সাভোনা তখনই সেখানে এসে পড়েছে। হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্রান্সিসের কথাগুলোও বলল। মো রাবিত একটু শান্ত হল। তোয়ার নামাল।
ফ্রান্সিস বলল—সাভোনা—বলো যে এখন একা এত সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাওয়া নিরেট বোকামি। ও পালাতে পারবে না বরং মৃত্যু ডেকে আনবে। তাতে না ওর মাতৃভূমির না ওর বিদ্রোহী বন্ধুদের কারো উপকারই হবে না। বরং বেঁচে থাকলে—সময় সুযোগ বুঝে ও পরে লড়াই করবে। সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
