ফ্রান্সিস থামল। কেউ কোনো কথা বলল না। মাথার ওপরে ঝকঝকে তারাভরা আকাশ। শনশন সমুদ্রের হাওয়ার শব্দ। জাহাজের গায়ে ঢেউ ভেঙে পড়েছে ছলাৎ ছলাৎ।
হঠাৎ বিস্কোর গলা শোনা গেল—ফ্রান্সিস, তোমাকে ছেড়ে আমরা কেউ এখান থেকে এক পাও নড়বো না শেষ। পর্যন্ত তোমাকে যদি রাজা ফ্রেডারিক ফাঁসি দেন আমরা প্রত্যেকে তখন একইসঙ্গে মৃত্যুবরণ করবো। সব ভাইকিং উত্তেজিত ভঙ্গিতে দুহাত ওপরে তুলে চিৎকার করে উঠল, ও-হো-হো।
ফ্রান্সিসের দু চোখ ভিজে উঠল। চোখ মুছে ও ভাঙা গলায় বলল, ভাইসব, আমার বুদ্ধি চিন্তাশক্তির গভীরতার ওপর বিশ্বাস রাখো। জীবনের বাজি আমাকে লড়তে দাও। আমি কাউন্ট রজারের গুপ্তধন উদ্ধার করবোই।
সবাই আবার চিৎকার করে ধ্বনি তুলল, ও-হো-হো। সভা ভেঙে গেল। সবাই পরস্পর কথা বলতে বলতে চলে গেল।
পরদিন সকালেই ফ্রান্সিস মারিয়া আর হ্যারিকে নিয়ে ম্যামিয়েস দুর্গে এলো। দুজন সৈন্য ওদের দুর্গের একটা বড়ো ঘরে নিয়ে এলো। ওরা দেখল, ঘরটায় শুকনো ঘাসের ওপর কাপড় ঢাকা সুন্দর বিছানা পাতা। বলিশও রয়েছে। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর। বিছানায় মোরাবিত শুয়ে আছে। মুখচোখ দেখে ফ্রান্সিসের মনে হল মোরাবিত এখন অনেকটা সুস্থ। সাভোনা আধশোয়া হয়ে কিছু ভাবছিল। ফ্রান্সিসদের দেখে উঠে বসল। বলল,ফ্রান্সিস, তোমাকে যতটুকু দেখেছি তাই থেকে একটা কথা আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি তুমি জীবনে কিছু আদর্শকে বিশ্বাস করো এবং সেই আদর্শকে রক্ষা করতে তুমি সিদ্ধান্ত নাও। তাই আমি তোমার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কোনো কথা বলবো না। একটু থেমে বলল, বলো এবার তুমি কী করতে চাও?
—প্রথমেই কাউন্ট রজারের আমলের রাজবাড়ির যে অংশটা ভাঙা হয়নি সেটা দেখতে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
—বেশ চলো। সাভোনা বলল।
সাভোনার দুর্গ-এলাকা ভালো করেই চেনা। ও ওদের দুর্গের উত্তর কোণায় নিয়ে এলো। দেখা গেল একটা ছোটো গীর্জা। সাভোনা গীর্জাটা দেখিয়ে বলল, এটাই কাউন্ট রজারের তৈরি গীর্জা। এটার কথা তোমাদের বলেছি। ওরা গীর্জার সামনে এলো। গীর্জার চারদিকে সুন্দর বাগান। অনেক ফুলগাছ। গোলাপ টিউলিপ ডালিয়া আরো নাম-না-জানা ফুল ফুটে আছে। কাঠের দরজা খুলে ওরা গীর্জার দরজার সামনে এলো। দেখলো প্রবেশ পথের মেঝেয় নানারঙের সুন্দর মোজেকের কাজ করা। সাভোনা বলল, এই মেঝে কিন্তু কাউন্ট রজারই তৈরি করিয়েছিল। রাজা ফ্রেডারিক এই মেঝেটা ভাঙেনি।
ওরা গীর্জার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ছোটো গীর্জা। ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মূর্তি। দেয়ালে মাতা মেরীর ছবি। বেশ ভাবগম্ভীর শান্ত পরিবেশ। দেখা গেল মেঝেতেও মোজেকের কারুকাজ। ফ্রান্সিস ঘুরে ঘুরে চারদিক দেখল। গীর্জা যেমন হয় তেমনি সব। জানলায় রঙিন কাঁচ। সকালের রোদ কাঁচের রঙ মেখে মেঝেয় পড়েছে। ফ্রান্সিস বেশ ভালো করেই দেখল সব।
সবাই বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিস সাভোনাকে বলল, সাভোনা, কাল আমরা কাতনিয়া যাবো। আপনি ব্যবস্থা করতে পারবেন?
সাভোনা হেসে বলল, রাজা ফ্রেডারিক দুজন সৈন্যকে রেখেছে, দেখেছো তো? পাহারাদারির জন্যে ওদের কিন্তু রাখা হয়নি। আমাদের সব ব্যাপারে সাহায্য করবার জন্য ওদের নিযুক্ত করেছে রাজা। গুপ্তধন বলে কথা! রাজা ফ্রেডারিক এখন রাজধানীতে ফিরে যাবে না। গুপ্তধন খুঁজছো তুমি। খুব উৎসাহ রাজা ফ্রেডারিকের। রাজা এখন এখানেই থাকবে।
দিন দুয়েক কাটল। সেই ঘরেই ফ্রান্সিসদের শুয়ে বসে ঘুমিয়ে দিন কাটে।
সেদিন সকালে দুর্গের পাহারাদার সৈন্যদের মধ্যে বেশ ব্যস্ততা দেখা গেল। ফ্রান্সিস সাভোনাকে জিজ্ঞেস করল—কী ব্যাপার বলুন তো?
—মনে হচ্ছে রাজা ফ্রেডারিক দুর্গ পরিদর্শনে আসছেন। সাভোনা বলল।
—রাজা কি এরকম দুর্গ পরিদর্শন করেন নাকি? হ্যারি বলল।
—হ্যাঁ—সাভোনা বলল—আর রাজাদের এই পরিদর্শনের কাজ করা উচিতও। তা নইলে সৈন্যরা অলস হয়ে পড়ে।
একটু পরেই ফ্রান্সিসদের ঘরের সামনে কয়েকজনের পায়ের শব্দ শোনা গেল। দরজা দিয়ে ঢুকলেন রাজা ফ্রেডারিক। পেছনে দুজন অমাত্য। রাজার মাথায় মুকুট নেই। পরনে হাল্কা সবুজ রঙের ঢোলা পোশাক। পোশাকে সোনার সুতোর লতা ফুল তোলা।
রাজাকে দেখে আধশোয়া ফ্রান্সিস উঠে বসল। রাজা বললেন—গুপ্তধনের কোনো হদিশ করতে পারলেন?
—না—ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল—সবে তো খোঁজা শুরু করলাম। কয়েকটা দিন যাক। সব দেখি শুনি জানি তবে তো।
—দেখুন, চেষ্টা করে তবে এর আগেও তো কম চেষ্টা হয় নি কিন্তু কেউ কোনো হদিশও করতে পারে নি।
—দেখি চেষ্টা করে। ফ্রান্সিস বলল।
এবার রাজা সাভোনা ও মোরাবিতের দিকে তাকালেন। বললেন-তোমরা আপাতত এখানেই থাকবে। কিন্তু খবরদার—পালাবার চেষ্টা করবে না। এখন কাউন্ট রজারের গুপ্তধনের খোঁজ চলছে দেখা যাক। কী হয়। রাজা অমাত্যদের সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন।
তখনই দুর্গের ছোটো গীর্জাটায় প্রার্থনার ঘন্টা বেজে উঠল—ঢং ঢং। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল—সাভোনা চলুন গীর্জায় যাবো।
—কিন্তু রাজপরিবার আর অমাত্যদের পরিবারের লোক ছাড়া ঐ গীর্জায় আর কারো প্রবেশাধিকার নেই। সাভোনা বলল।
—হুঁ।—তবু যেতে ইচ্ছে করছে। গীর্জার ভেতরে যাবো না আমরা। বাইরে থেকে প্রার্থনা অনুষ্ঠান যতটা পারি দেখবো শুনবো। ফ্রান্সিস বলল।
