–আমি জানি না।
–জাহাজ নিয়ে এসেছ, সোনার ঘন্টা নিয়ে যাবে বলে। এবার জাহান্নামে যাও, সেখানে সোনার ঘন্টার বাজনা শুনতে পাবে।
ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না।
সুলতান চীৎকার করে বলতে লাগলেন–আমাদের দরিয়ায় এসে আমাদেরই চোখের সামনে দিয়ে সোনার ঘন্টা নিয়ে যাবে, তোমাদের দুঃসাহস তো কম নয়? সুলতান এবার ফ্রান্সিসের বন্ধুদের দিকে তাকালো। বললো, আমি জাহাজ নিয়ে যাব, তোমাদের জাহাজও মেরামত করিয়ে দেব। তোমরা যদি জাহাজ চালানোর ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো, তবে তোমাদের আমি মুক্তি দেব।
সবাই চুপ করে রইল। হঠাৎ হ্যারি চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো–আমরা যেতে রাজি, কিন্তু আমাদের ক্যাপটেন হবে কে?
সুলতান হাসলেন এবং বললেন–তোমাদেরই দেশের নৌবাহিনীর সেনাপতি।
-ওকে আমরা নেতা মানি না, আমরা ফ্রান্সিসকে চাই। হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ-হ্যাঁ, আমরা ফ্রান্সিসকে চাই সবাই চীৎকার করে উঠল।
সুলতান মুশকিলে পড়লেন। এই ভাইকিংদের মত দক্ষ জাহাজ-চালকদের ছাড়া তার পক্ষে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু নিজের এই সমস্যার আভাসও তিনি প্রকাশ পেতে দিলেন না। চীৎকার করে বলে উঠলেন–তোমরা যদিনা যাও, তাহলে তোমাদের সকলের ফ্রান্সিসের দশা হবে। তাকিয়ে দেখ, ওকে কি ভাবে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে।
সুলতান রহমানকে কি যেন বললেন। রহমানের ইঙ্গিতে কালো কাপড়ের আলখাল্লা পরা, কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা একজন লোক ফাঁসির মঞ্চে উঠে এল। সে এসে ঘাড়ধাক্কা দিতে দিতে ফ্রান্সিসকে দড়ির ফাঁসের কাছে নিয়ে এল। কালো কাপড়ের ফুটো দিয়ে লোকটার চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করছে।
ফ্রান্সিস সম্মুখের সেই দর্শকদের ভিড়ের দিকে তাকাল। বন্ধুদের দিকে তাকাল। দেখলো, হ্যারি চোখের জল মুছছে। আরও কেউ-কেউ অন্যদিকে তাকিয়ে আছে, পাছে চোখের জল দেখে ফ্রান্সিস দুর্বল হয়ে পড়ে। ফ্রান্সিস আকাশের দিকে তাকাল। ঝকঝকে নীল আকাশ। সাদা সাদা হালকা মেঘ উড়ে যাচ্ছে। পাখি উড়ছে। কি সুন্দর পৃথিবী। ফ্রান্সিসের চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। মা’র কথা, বাবার কথা মনে পড়ল। ছোট ভাইটাও কি ওর মতই আধপাগলা হবে? বাড়ির গেটের সেই লতা গাছটা একদিন সমস্ত দেওয়ালটায় ছড়িয়ে পড়বে। অজস্র নীল ফুল ফুটিয়ে জায়গাটাকে সুন্দর করে তুলবে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, তারাভরা আকাশ, ঢেউয়ের মাথায় সূর্য ওঠা–এসব আর কোনদিন দেখবে না সে।
কিন্তু ফ্রান্সিসের চিন্তায় বাঁধা পড়ল। কালো কাপড়ের মুখ ঢাকা লোকটা ফাঁসের দড়ি টেনে-টেনে পরীক্ষা করতে করতে বিড়বিড় করে বলছে–ফাঁসটা আলগা, হাতের বাঁধনটা সময়মত কেটে নিও। পাটাতনের নীচে গর্তটা বুজিয়ে রেখেছি, নেমেই মাটি পাবে।
ফ্রান্সিসের সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল–ফজল!
ফজল ধমকের সুরে বলল–তোমার মুখে যেমন খুশীর ভাব ফুটে উঠেছে, যেন ফাঁসি হবে না, বিয়ে হবে তোমার। হুঃ।
ফ্রান্সিস সাবধান হলো। ফজল বলতে লাগল–নীচে পড়েই দড়িটা ধরে দু’চারবার জোরে হ্যাঁচকা টান দেবে। তারপর চুপচাপ বসে থাকবে। রাত হলে পেছনের পাটাতনটা খুলে বেরোবে। সামনেই একটা ঘোড়া পাবে।
ফজল থামলো। তারপর দুহাত তুলে সুলতানের দিকে ইঙ্গিত করল–সব ঠিক আছে। এবার সুলতানের হুকুম। সব গোলমাল থেমে গেল।
ফ্রান্সিস হঠাৎ হাত তুলে এগিয়ে এল। সুলতান জিজ্ঞেস করল–কি ব্যাপার।
–মরবার আগে আমার বন্ধুর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
–কে সে?
–হ্যারি।
সুলতানের হুকুমে হ্যারিকে ধরে ধরে মঞ্চে নিয়ে আসা হল। হ্যারি আর নিজেকে সংযত করতে পারুল না। ওর ছেলেবেলার বন্ধু ফ্রান্সিস। কত হাসি কান্না মান-অভিমানের জীবন কাটিয়েছে ওরা। হ্যারি ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরে কাঁঁদতে লাগল। ফ্রান্সিস নীচুস্বরে বলতে লাগল–হ্যারি, ভয় নেই, আমি মরবো না। যা বলছি, শোন। তোমরা কেউ সুলতানের বিরোধিতা বা সেনাপতির হুকুমের অবাধ্য হয়ো না। আমি আমাদের ভাঙা জাহাজটায় থাকবো। পরে দেখা হবে।
হ্যারি কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারল না। চোখ মুছে অবাক হয়ে ফ্রান্সিসের দিতে তাকাতে-তাকাতে মঞ্চ থেকে নেমে এল।
ফজল ফ্রান্সিসের মাথায় কালো কাপড়ের ঢাকনা পরিয়ে দিল। কাপড়টা পরাবার সময় সকলের অলক্ষ্যে ফ্রান্সিসের হাতের বাঁধনটা আলগা করে দিল। তারপর গলায় দড়ির ফাঁসটা পরিয়ে সুলতানের দিকে তাকাল। আবার চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কি হয় দেখবার জন্যে সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে। সুলতান হাত তুলে ইঙ্গিত করল। ফজল ফ্রান্সিসের পায়ের নীচের পাটাতনটা এক টানে সরিয়ে দিল। ফ্রান্সিস ঝুপ করে নিচে পড়ে গেল। সকলেই দেখল দড়িটায় কয়েকটা হ্যাঁচকা টান পড়ল। দুলতে-দুলতে দড়িটা থেমে গেল।
ফ্রান্সিসের ফাঁসি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বধ্যভূমিতে উপস্থিত আমদাদবাসীরা উল্লাসে চীৎকার করে উঠল। ওদের ফাঁসি দেখা হয়ে গেল। সুলতান, রহমান আর ভাইকিং সেনাপতিকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন। দর্শকরাও সব আস্তে-আস্তে চলে গেল। ভাইকিং বন্দীরে নিয়ে সৈন্যরা চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বধ্যভূমি নির্জন হয়ে গেল।
দুপুর গেল। সন্ধ্যে পার হল। রাত্রি বাড়তে লাগল। চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ফ্রান্সিস হাতের দড়ির বাঁধনটা খুলে ফেলল। তারপর আস্তে আস্তে পেছনের পাটতনটা ধরে নাড়া দিল। সত্যিই আলগা। ওটা খুলে এল সামনেই প্রাচীরের ধার ঘেঁষে একটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে, লেজ ঝাঁপটাচ্ছে। ঘোড়াটার পিঠে জিন বাঁধা। ফ্রান্সিস এক লাফে ঘোড়ায় চড়ে বসল। তারপর কোনদিকে না তাকিয়ে দ্রুত বেগে একটা গলিপথে ঢুকে পড়ল। আন্দাজে দিক ঠিক করে দুর্গের দিকে চলল। সমুদ্র ঐ দিকেই। একসময় হু-হুঁ হাওয়া এসে লাগল। সেই সঙ্গে সমুদ্রের মৃদু গর্জন। ঐ তো সমুদ্র। ওপাশে দুর্গের টানা প্রাচীর। সমুদ্রের ধার দিয়ে ফ্রান্সিস বিদ্যুৎবেগে ঘোড়া ছোটাল। অল্প অল্প চাঁদের আলোয় জল ঝিকমিক করছে। হুহু হাওয়া শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। সারাদিনের বন্দীদশা, উপবাস, একফোঁটা জলও খেতে পায়নি। তবু মুক্তির আনন্দ, বেঁচে থাকার আনন্দ। ফ্রান্সিস প্রাণপণে ঘোড়া ছোটাল। একটু পরেই দূর থেকে দেখা গেল, একটা প্রকাণ্ড কালো জন্তুর মত ওদের ভাঙা জাহাজটা কাত হয়ে পড়ে আছে জলের ধারা।
