কেবিন ঘরে ঢুকে নিজের বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল ফ্রান্সিস। সারাদিন যে উত্তেজনা গেছে, শরীর আর চলছে না। কিন্তু খিদেও পেয়েছে ভীষণ। এতক্ষণে ও সেটা বুঝতে পারল। রসুই ঘরটা একবার দেখলে হয়। ফ্রান্সিস উঠে পড়ল। রসুইঘর খুঁজে পেতে দেখলো একজনের পক্ষে যথেষ্ট খাদ্য মজুত রয়েছে। যাক কয়েকদিনের জন্য নিশ্চিন্ত। উনুন ধরিয়ে ময়দা-আটা-চিনি দিয়ে এক অদ্ভুত খাবার তৈরী করলো ফ্রান্সিস। খিদের জ্বালায় তাই খেলো গোগ্রাসে। তারপর একেবারে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুম।
সকাল হয়েছে। রোদ্দুরের তেজ তখনও বাড়েনি। ফ্রান্সিস ডেক-এ পায়চারি করছে আর ভাবছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাহাজটা মেরামত করতে হবে। আবার সমুদ্রে ভেসে পড়তে হবে। সোনার ঘন্টা আনতেই হবে। কিন্তু কি করে হবে?
ফ্রান্সিস ভেবে-ভেবে কোন কুলকিনারা পেল না। পায়চারি করতে করতে হঠাৎ ফ্রান্সিস থমকে দাঁড়াল। একটা জাহাজ আসছে এই দিকে। খুব সুন্দর ঝকঝকে একটা জাহাজ। বাতাসের তোড়ে ফুলে ওঠা সাদা পালগুলো দেখে মনে হচ্ছে যেন উড়ন্ত রাজহাঁস। মাস্তুলে একটা পতাকা উড়ছে পত পত করে। ফ্রান্সিস ভাল করে লক্ষ্য করল–হ্যাঁ, সুলতানের জাহাজ। পতাকায় বাদশাহী চিহ্ন ছুটন্ত ঘোড়া আর সূর্য আঁকা।
ফ্রান্সিস আর ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ মনে করল না। কেবিন ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। রাজ্যের চিন্তা মাথায় ভিড় করে এল। সুলতানের জাহাজ এদিকে আসছে কেন? তবে কি হ্যারি বিশ্বাসঘাতকতা করলো? অত্যাচারের মুখে সব বলে দিল? ফ্রান্সিসের হদিশ জানিয়ে দিলো? কিন্তু ওকে ধরিয়ে দিয়ে হ্যারির কি লাভ? লাভ আছে বৈকি? তাহলে সুলতান ওদের মুক্তি দেবে। সবাই দেশে ফিরে যেতে পারবে।
সুলতানের জাহাজটা বালিয়াড়িতে এসে ভিড়লো। ফ্রান্সিসের সব বন্ধুরা হইহই করতে করতে জাহাজ থেকে নেমে এল। ফ্রান্সিস অনেকটা আশ্বস্ত হল। ওরা যখন এত আনন্দ হই-হুল্লা করছে, তখন নিশ্চয়ই অন্য কারণে জাহাজটা এখানে আনা হয়েছে। গা ঢাকা দিয়ে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ডেক এ উঠে এল। মাস্তুলের আড়ালে লুকিয়ে সব দেখতে লাগল। ফ্রান্সিসের বন্ধুরা নেমে আসতেই সৈন্যের দল নেমে এসে ওদের ঘিরে দাঁড়াল তারপর সবাই দল বেঁধে এই জাহাজটার দিকে আসতে লাগল। আরো কিছু লোক তখন সুলতানের জাহাজ থেকে হাতুড়ী, পেরেক বড়-বড় কাঠের পাটাতন নামাতে লাগল। তাহলে ওদের ভাঙা জাহাজটা মেরামত হবে। ঐ লোকগুলো কাঠের মিস্ত্রী। ফ্রান্সিস স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
মালপত্র নামানো হল। ফ্রান্সিসদের জাহাজটায় মেরামতির কাজ শুরু হল। ভাইকিংরাও হাত লাগাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নির্জন সমুদ্রতীর বহুলোকের হাঁকডাকে ভরে উঠল। ফ্রান্সিস আড়াল থেকে লক্ষ্য করল, হ্যারি কাজ করার ফাঁকে আড়চোখে এই জাহাজটার দিকে তাকাচ্ছে। বোধহয় ফ্রান্সিসের সঙ্গে দেখা করবার সুযোগ খুঁজছে।
দুপুর নাগাদ সুলতানের জাহাজে কার হাঁক শোনা গেল–খানা তৈরি। সবাই চলে এসো। সবাই কাজ রেখে দল বেঁধে জাহাজে খেতে চললো। শুধু হ্যারি থেকে গেল। কেউ কেউ হ্যারিকে ডাকলে। হ্যারি বলল হাতের কাজটা শেষ করেই যাচ্ছি। তোমরা এগোও।
জাহাজে ভাঙা হালের জায়গাটায় হ্যারি কাজ করছিল। সে জাহাজের আড়ালে পড়ে গেল। সুলতানের সৈন্যরাও খেয়াল করল না। সবাই জাহাজে উঠে গেল। হ্যারি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো। যখন দেখলো কেউ ওকে লক্ষ্য করছে না তখন দড়ি বেয়ে ভাঙা জাহাজটায় উঠে এল। সুলতানের জাহাজ থেকে যাতে পাহারাদার সৈন্যরা দেখতে না পায়, তার জন্যে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে চাপাস্বরে ডাকলো ফ্রান্সিস!
ফ্রান্সিস মাস্তুলের আড়াল থেকে সবই দেখছিল। এবার ছুটে এসে হ্যারিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। হ্যারি প্রথমে একটু চমকেই উঠেছিল পরক্ষণে গভীর আবেগে ফ্রান্সিসকে আলিঙ্গন করলো। দুজনেরই চোখ জলে ভরে উঠল। আঃ! ফ্রান্সিস তাহলে সত্যিই বেঁচে আছে! সময় অল্প। বেশি কথা হল না। ফ্রান্সিস বললো–তোমরা কেউ সুলতান বা ক.. সেনাপতির হুকুমের বিরোধিতা করো না।
–সেসব আমরা ভেবে রেখেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাহাজ নিরাপদে নিয়ে যেতে পারবো তো?
–হ্যাঁ, আমি দিনরাত শুধু ঐ ভাবনা নিয়েই আছি।
–তোমার কি মনে হয়? পারবে?
–নিশ্চয়ই পারবো, পারতেই হবে। লবর শোনা গেলো। হ্যারি দ্রুত উঠে দাঁড়াল। বললো–এখন চলি। নিশ্চয়ই ওরা আমাকে খুঁজতে বেরিয়েছে।
–আবার দেখা হবে। ফ্রান্সিস হেসে হাত বাড়াল। হ্যারি আবেগে ওকে চেপে ধরল। এক মুহূর্ত। তারপরেই দ্রুত ডেকের রেলিঙে দাঁড়িয়ে তীরে বন্ধুদের জটলার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। সবাই হইহই করে উঠল। যাক, হ্যারির কোন বিপদ হয়নি। হ্যারি দড়ি বেয়ে নেমে এল। তারপর বন্ধুরা ওর জন্যে যে খাবার নিয়ে এসেছিল, বালির ওপর বসে তাই খেতে লাগলো। সঙ্গে সৈন্য আর মিস্ত্রীরা। সারাদিন মেরামতির কাজ চলে। সন্ধ্যে নাগাদ আবার ওদের নিয়ে জাহাজটা আমদাদ বন্দরে ফিরে যায়। জাহাজ রঙ করা হলো। দেখতে হলো যেন, ঝকঝকে নতুন জাহাজ একটা।
সেদিন হ্যারি লুকিয়ে ফ্রান্সিসের সঙ্গে দেখা করল। বললো–কালকে জাহাজ ছাড়বে।
–কখন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–সকালবেলা।
–সুলতান যাচ্ছে নিশ্চয়ই।
–সে আর বলতে। সুলতানের নাকি ভালো করে ঘুমই হচ্ছে না।
