–দেখছো না, পেটের ব্যথায় কাতরাচ্ছে।
–ও কিছু হয়নি।
–বেশ, তুমি নিজেই দেখে যাও।
–হুঁ। পাহারাদারটা ঘুরে দাঁড়ালো।
তখন সবাই মিলে ওকে চটাতে লাগল–ব্যাটা সবজান্তা, তালপাতার সেপাই।
পাহারাদারটা ভীষণ চটে গেল। হেঁকে উঠল–এ্যাই!
কে মুখ ভেংচে ওর হাঁকের নকল মুখে করে বলে উঠল–এ্যাই!
আর যায় কোথায়! পাহারাদারটা তালা খুলে ভেতরে ছুটে এল। কিন্তু খাপ থেকে তরোয়াল খোলবার আগেই পাঁচ-ছয়জন একসঙ্গে ওর ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বেচারা টু শব্দটিও করতে পারল না। মাটিতে ফেলে কয়েকজন চেপে ধরল। বাদবাকিরা পাহারাদারের কোমর বন্ধনীর কাপড়টা খুলে ফেলল তারপর ঐ কাপড় দিয়ে মুখ বেঁধে কোণায় ফেলে রাখলো।
এবার খোলা দরজা দিয়ে একজন বেরিয়ে বাইরের অবস্থাটা দেখতে গেল। দেখলো, ওদের যে আর একজন পাহারা দিচ্ছিল সে দেউড়ির কাছে অন্য পাহারাদারদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। প্রাসাদের সম্মুখে দুজন পাহারাদার শুধু টহল দিচ্ছে। দেউড়ি দিয়ে পালানো যাবে না। ওখানে পাহারাদার সৈন্যদের সংখ্যা বেশি। একমাত্র পথ প্রাচীর ডিঙিয়ে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে যদি অন্য কোন দিক দিয়ে পালানো যায়। শেষ পর্যন্ত তাই স্থির হল। পা টিপে টিপে সবাই বেরিয়ে এল। অসুস্থ হ্যারিকেও ওরা ধরাধরি করে সঙ্গে নিয়ে চলল। আস্তে আস্তে নিঃশব্দে ওরা প্রাচীর টপকাল। প্রাচীরের ওপাশেই দেখা গেল, একটা ছোট্ট বাগান মত। ফোয়ারাও আছে, তাতে। তারপরেই একটা দরজা। দরজাটা ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। কয়েকটা ঘর পেরোতেই দেখা গেল লম্বামত একটা ঘর। টানা টেবিলের মত দেয়ালে কাঠের তক্তা লাগানো। কতরকম খাবার ঢাকা দেওয়া রয়েছে। কোর্মা, কোপ্তা, শিক কাবাবের গন্ধে ঘরটা ম-ম করছে। এতক্ষণে বোঝা গেল, ওরা রসুই ঘরে ঢুকে পড়েছে। পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল ওরা। তারপরেই পাগলের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল। খাবারের ওপর। দুহাত ভরে যে যতটা পারল নিয়ে খেতে আরম্ভ করল। কামড়ে কামড়ে মাংস খেতে লাগল। এক সঙ্গে এত লোক, তার ওপর খাওয়ার আনন্দ। অল্প সল্প শব্দ হতে হতে একেবারে হইচই শুরু হয়ে গেল। ওরা বোধহয় ভুলেই গেল, যে ওদের পালাতে হবে। খাবারের ঘরের দরজা দিয়ে তরোয়াল হাতে সৈন্যদল ঢুকতে লাগল। সৈন্যরা ঘিরে ফেলে ওদের পিঠে তরোয়ালের খোঁচা দিয়ে কুম করল–চলো।
এতক্ষণে এরা সম্বিত ফিরে পেল। কিন্তু এখন আর কিছু করবার নেই। আবার সেই ফিরে আসতে হল কাটার তার ঘেরা বন্দীশালায়।
ফ্রান্সিস ফিরে এসে দেখলো, প্রাসাদের সামনের চত্বরে সৈন্যরা ভোলা তরোয়াল হাতে ছুটোছুটি করছে। কিছু একটা হয়েছে নিশ্চয়ই। একজন সৈন্য রহমানকে এসে কি যেন বললো। রহমান ফ্রান্সিসকে বলল–কাণ্ড শুনেছ?
–কি?
–তোমার বন্ধুরা পালিয়েছে।
ফ্রান্সিস হাসলো, যাক, সমস্যার সমাধান ওরা নিজেরাই বুদ্ধি খাঁটিয়ে বের করেছে তাহলে। রহমান আড়চোখে ফ্রান্সিসকে হাসতে দেখে বলল–কিন্তু ফিরে আসতে হবে। এখান থেকে পালানো অত সহজ নয়।
ফ্রান্সিসকে কাঁটাতারের বন্দীশালায় ঢুকিয়ে দেওয়া হল। ফ্রান্সিস দেখল, পাহারাদারের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পালাবার সব পথই বন্ধ। যাক সান্ত্বনা, বন্ধুরা তো পালাতে পেরেছে। হঠাৎ পাথরে বাঁধানো চত্বরে অনেক মানুষের পায়ের শব্দ শোনা গেল। ফ্রান্সিস চমকে উঠল–তবে কি ওরা ধরা পড়ল?
দরজার তালা খোলার শব্দ হল। দরজা খুলে গেল। দেখা গেল ফ্রান্সিসের বন্ধুরা ঢুকছে। তখনও কারও হাতে পাঁঠার ঠ্যাং, কোর্মার মাংসের টুকরো, শিক-বেঁধা শিক কাবাব। ফ্রান্সিস ছুটে গিয়ে অসুস্থ হ্যারিকে ধরল। তারপর ধরে এনে ওকে শুইয়ে দিল। কেউ কোন কথা বলল না। পরদিন যে তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে, একথা ফ্রান্সিস কাউকে বলল না। শুধু, বাইরের সৈন্যদের টহল দেওয়ার শব্দ শোনা গেল—টক্-টক্।
তখন কাল হয়েছে। দেউড়ির কাছে যেখানে ফাঁসিকাঠ তৈরী হয়েছে, সারা আমদাদ শহরের মানুষ সেখানে এসে ভেঙে পড়ল। দুর্গে তুরী বেজে উঠল। একটু পরেই ফাঁসিকাঠের পাশে ফ্রান্সিসের বন্ধুদের এনে দাঁড় করানো হল। ভীড়ের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। সবাই বন্দীদের দেখতে চায়। ফ্রান্সিসকে দাঁড় করানো হল ফাঁসিকাঠের মঞ্চের ওপর। একটা সাদা ঘোড়ায় চড়ে সুলতান এলেন। পেছনে রহমান। রমহানের পেছনে ও কে? এ কি! এ যে সেনাপতিমশাই।
এদিকে হয়েছে কি, ফ্রান্সিসরা যখন ভোরের দিকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন সেনাপতি একজন পাহারাদারকে ডেকে বলেছিল–আমি রহমানের সঙ্গে দেখা করতে চাই। পাহারাদারটি প্রথমে রাজী হয়নি। সেনাপতি তখন বলেছিল–রহমানকে শুধু বলবে ভাইকিং দেশের নৌবাহিনীর সেনাপতি দেখা করতে চায়। পাহারাদারটি কি ভেবে রাজি হল। একটু পরেই ফিরে এসে সেনাপতিকে নিয়ে গেল।
সবাই তখন অঘোর ঘুমে। শুধু অসুস্থ হ্যারি জেগেছিল। সে সবই দেখলো। বুঝল–সেনাপতি নিজের জীবন বাঁচাবার জন্যে মরীয়া হয়ে উঠেছে। এতে যদি অন্যদের প্রাণও যায়, ও ফিরে তাকাবে না। হ্যারি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে শুয়ে রইল! কাউকে ডাকলও না। ভোর থেকেই সেনাপতিকেও ওরা দেখতে পায়নি। এবার মানে বোঝা গেল। সেনাপতি সুলতানের দলে ভিড়ে গিয়েছে।
সুলতান আসতেই দর্শকদের মধ্যে উল্লাসের বন্যা বইল। চীৎকার করে সবাই সুলতানের জয়ধ্বনি করল। সুলতান ঘোড়া থেকে নেমে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে এলেন। ফ্রান্সিসকে লক্ষ্য করে বললেন, ফ্রান্সিস, গলায় দড়ির ফাঁস পরাবার আগে এখনও সময় আছে বলে–সেই মোহর দুটো কোথায়?
