মারিয়া বলল, ওর নাম ফ্রান্সিস অনেক গুপ্তধনের রহস্য ও ভেদ করেছে। ওকে বলেই দেখুন না।
সাভোনা, বলুন তো কাউন্ট রজারের গুপ্তধনের ব্যাপারটা। ফ্রান্সিস বলল। তখনি হ্যারি ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিস বলে উঠল, হ্যারি ভালো সময়েই এসেছো। শোনো সাড়োনা এক গুপ্তধনের কাহিনী বলছে।
সাভোনা আস্তে আস্তে বলতে লাগল—
প্রায় একশো বছর আগের কথা। দুই নর্মান ভাই রজার ও রবার্ট সমুদ্র পথে সিসিলি এসেছিল। দু ভাই-ই ছিল দুঃসাহসী আর অত্যন্ত বলশালী। দুদলেই ছিল দস্যু। দস্যুবৃভি করে জমানো প্রচুর ধনসম্পদ ছিল ওদের। ক্রমে সিসিলি জয় করে রবার্ট উত্তরের আর রজার দক্ষিণের রাজা হয়ে বসল। রজার উপাধি নিল কাউন্ট। রাজা হিসেবে কাউন্ট রজার কিন্তু যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিল। যা হোক, মৃত্যুর কয়েক বছর আগে কাউন্ট রজারের ধর্মে মতি হলো। খ্রীষ্টধর্মগুরু পেপাপের সঙ্গে ঝগড়া মিটিয়ে ফেলল। পুরোনো জীর্ণ গ্রীক মঠগুলো সংস্কার করল। সিরাকস আর কাতনিয়ায় দুটো গীর্জা তৈরি করল। তারপর কাউন্ট রজার মারা গেল। উত্তরের পোলার্মো থেকে ভাই রবার্ট ছুটে এলো। উদ্দেশ্য কাউন্ট রজারের ধনসম্পতি অধিকার করা। দুজনেই তো অতীতে দস্যু ছিল। রবার্ট সিরাকসের রাজবাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কাউন্ট রজারের ধনসম্পত্তির কোনো হদিসই পেল না। রাজকোষের কিছু স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে রবার্ট ফিরে গেল। তারপর একশ বছর ধরে কাউন্ট রজারের বংশধরেরা, ধনী ভূস্বামীরা অনেকেই খুঁজছে। কিন্তু কেউ কাউন্ট রজারের গুপ্তধনের হদিস করতে পারেনি। সাভোনা থামল।
ফ্রান্সিস এতক্ষণ সব মন দিয়ে শুনছিল। এবার বলল, আচ্ছা, কাউন্ট রজার কি তার গুপ্তধন কোথায় রাখা হয়েছে সেসব ব্যাপারে কোনো সূত্র রেখে যায়নি?
—কিছুই না। সাভোনা বলল।
—কাউন্ট রজারের মৃত্যু হয়েছিল কোথায়? ফ্রান্সিস বলল।
—এই সিরাকসের রাজবাড়িতে। সাভোনা বলল।
—সেই রাজবাড়ি কি সিরাকসে এখনও আছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
—না। বেশ কয়েক বছর আগে এখানকার রাজা ফ্রেডারিক সেসব ভেঙে ফেলেছিল। তৈরি করছিল যে বেশ ভালো একটা দুর্গ তৈরি করবে। করেছেও একটা দুর্গ, ম্যামিয়েস দুর্গ। কিন্তু আসল কারণ ছিল কাউন্ট রজারের গুপ্ত ধনভারের সন্ধান করা। কিন্তু রাজবাড়ি ভেঙে ফেলেও ফ্রেডারিক কিছুই পায়নি। সাভোনা বলল।
—তাহলে কাউন্ট রজারের তৈরি কোনো কিছুই সিরাকসে নেই? ফ্রান্সিস বলল।
—আছে। তার তৈরি গীর্জাটা। ওটা ম্যামিয়েস দুর্গের উত্তর কোণায় আছে। রাজা ফ্রেডারিক ওটার কিছু সংস্কার করেছিল। ভাঙেনি। তবে এখন ঐ গীর্জায় শুধু রাজপরিবারের মানুষদেরই প্রবেশাধিকার আছে, অন্য কারো নয়।
—তাহলে ঐ গীর্জাটা আপনি দেখেননি? ফ্রান্সিস বলল।
একটু চুপ করে থেকে সাভোনা বলল, দেখুন, আমি একসময় রাজা ফ্রেডারিকের একজন অমাত্য ছিলাম। রাজা আমার কাছ থেকে স্পেনীয়, পর্তুগীজ ভাষা শিখেছিল। কয়েকটা ভাষা জানতাম বলে রাজসভায় যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। তারা সারসেনদের ওপর অবিচার হচ্ছিল দেখে আমি সেই পদ ছেড়ে দিয়ে বিদ্রোহীদের দলে চলে এসেছিলাম। ঐ গীর্জায় আমি রবিবারের প্রার্থনা অনুষ্ঠানে অনেকবার গেছি।
—গীর্জাটার কিরকম সংস্কার রাজা ফ্রেডারিক করেছেন? ফ্রান্সিস বলল।
—যা কিছু সংস্কার ওপরেই হয়েছে। ভিত্তিষ্টা সেই কাউন্ট রজার যেমন করিয়েছিলেন তেমনি আছে। বোধহয় ভিতটায় সুন্দর মোজেকের কাজ ছিল বলেই রাজা ফ্রেডারিক ভেঙে ফেলেনি। সাভোনা বলল।
ফ্রান্সিস আর কোনো কথা বলল না। মাথা নিচু করে কাউন্ট রজারের গুপ্তধন সম্পর্কে একেবারে নীরব থাকার কারণ কী তাই ভাবতে লাগল।
হ্যারি বলল, কী ফ্রান্সিস, কাউন্ট রজারের গুপ্তধনের অনুসন্ধান করবে নাকি?
—অবশ্যই। ফ্রান্সিস বেশ জোর দিয়ে বলল।
মারিয়া বলল, রাজা বিদ্রোহীদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি, এজন্যে রাজা ফ্রেডারিক নিশ্চয়ই চটে যাবে। আমাদের না কয়েদঘরে বন্দি করে রাখে।
দেখা যাক। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল।
সেনাপতি এলাইমোর নির্দেশ মতো ফ্রান্সিসদের জাহাজ পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল তাদের দুটো জাহাজ দুপাশ দিয়ে। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই দূরে সিরাকস বন্দর দেখা গেল। আস্তে আস্তে তিনটি জাহাজই ভিড়ল সিরাকস বন্দরের জাহাজঘাটায়।
এলোইমো ফ্রান্সিসদের জাহাজে এলো। তখন ফ্রান্সিস হ্যারি ডেক-এ দাঁড়িয়েছিল। এলাইমো হ্যারিকে বলল, মোরাবিত আর সাভোনাকে নিয়ে আসুন। ওদের বন্দি করে—রাজার কাছে নিয়ে যেতে হবে।
—আমরা কী করবো? হ্যারি বলল।
—রাজার হুকুম না পাওয়া পর্যন্ত আপনাদের এই জাহাজে এখানেই থাকতে হবে। এলাইমো বলল!হ্যারি কথাটা ফ্রান্সিসকে বলল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল, বলল যে বন্দিদের সঙ্গে আমরা তিনজন রাজার কাছে যাবো। হ্যারি বলল সে কথা।
—আপনারা যাবেন কেন? এলাইমো একটু আশ্চর্য হয়েই বলল।
—রাজা ফ্রেডারিকের সঙ্গে আমাদের কথা আছে ফ্রান্সিসের শেখানো মতো হ্যারি বলল, এলাইমো একটু ভাবল। বলল,বেশ বিদ্রোহীদের আপনারা আশ্রয় দিয়েছেন কাজেই রাজা আজ হোক কাল শোক আপনাদের শাস্তি দেবেনই।
এলাইমোর আটজন সৈন্য যে কেবিনঘরে মোরাবিত আর সাভোনা ছিল সেই ঘরে গেল। ওদের দুহাত দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে এলো।
